Select Page

শহীদুল ইসলাম খোকনের সমাজ সচেতন সিনেমা ও আজকালের ‘রাক্ষস’

শহীদুল ইসলাম খোকনের সমাজ সচেতন সিনেমা ও আজকালের ‘রাক্ষস’

আজ থেকে ৩০ বছর পেছনে যাওয়া যাক। ১৯৯৬ সালের ঈদুল আজহা। মুক্তি পায় ছয়টি ছবি। তার মধ্যে একটি ‘রাক্ষস’। শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালক।

এই নির্মাতার আগের ছবিগুলোর নাম খেয়াল করুন—’শত্রু ভয়ংকর’, ‘সতর্ক শয়তান’, ‘ঘাতক’, ‘লম্পট’, ‘নরপিশাচ’। প্রত্যেকটা ছবির নাম ভিলেনকে বিশেষায়িত করছে। ছবিগুলোর এন্টাগনিস্ট অত্যন্ত শক্তিশালী।

শহীদুল ইসলাম খোকনের যে ছবিগুলোর নাম ভিলেনের বিশেষণ দিয়ে নয়—’বিশ্বপ্রেমিক’, ‘কমান্ডার’, ‘অপহরণ’—সেগুলোর প্রধান খলচরিত্রটিও প্রচণ্ড শক্তিমান। এই নির্মাতা নেতিবাচক চরিত্র সৃষ্টিতে দারুণ দক্ষ ছিলেন।

তিনি তার ছবিগুলোতে সমাজবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী, ফতোয়াবাজ, চাঁদাবাজ, চোরাকারবারি, ধর্মান্ধ, প্রতারক, লুম্পেন, ব্যভিচারী, ভ্রষ্টাচারীদের মুখোশ উন্মোচন করতেন। সমাজের ক্ষতিকর ভাইরাসগুলোকে তিনি চিহ্নিত করতেন। এই সব বহুরূপী, মানুষরূপী অমানুষদের প্রতি দর্শকদের ঘৃণাকে জাগ্রত করতেন তিনি।

শহীদুল ইসলাম খোকনের এজাতীয় প্রত্যেকটা ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় থাকতেন হুমায়ুন ফরীদি, নায়কের ভূমিকায় থাকতেন রুবেল। তার নায়করা হতেন গতানুগতিক—সৎ, দয়ালু, মানবিক; কখনো বখে গেলেও একটা সময় ফিরতেন ন্যায়ের পথে…।

কিন্তু শহীদুল ইসলাম খোকনের ভিলেন কিংবা অ্যান্টিহিরোর চরিত্রগুলো হত বৈচিত্র্যে ভরপুর। আগে থেকে কখনো এই চরিগুলোর মতি-গতি বোঝা যেত না। প্রতিটি ছবিতেই দর্শকের অভিজ্ঞতা হত অভাবনীয়।

আর যদি চরিত্রসৃজনে কোনো ঘাটতি থাকতও, সেটা ষোল আনা পূরণ করে দিতেন হুমায়ুন ফরীদি। বাণিজ্যিক ছবিতে তার যত ছলাকলা, তার প্রায় আট আনা তিনি দেখিয়েছেন শহীদুল ইসলাম খোকনের ছবিতে। এই নির্মাতার ‘সন্ত্রাস’, ‘উত্থান-পতন’, ‘টপ রংবাজ’, ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘চারিদিকে শত্রু’, ‘পালাবি কোথায়’ ছবিতে হুমায়ুন ফরীদি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।

‘সংশপ্তক’ নাটকের ‘কানকাটা রমজান’ থেকে মন্দ চরিত্র রূপায়নে তার যে সহজাত সাবলীলতা, তারই বিনোদনধর্মী প্রকাশ ঘটেছে শহীদুল ইসলাম খোকনের ছবিতে। হুমায়ুন ফরীদি সেলুলয়েডে যেমন হিংস্রতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনই হাসিয়েছেন। ছবির চরিত্রগুলোতে তার ভীরুতা, কপটতা, স্ববিরোধিতা ইত্যাদি নানা নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলতে তার স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য- বক্স অফিসে হুল্লোড় তুলেছে পুরো নব্বই দশক।

আর তাই ‘রাক্ষস’-কে শহীদুল ইসলাম খোকন ও হুমায়ুন ফরীদির সামগ্রিক চলচ্চিত্রচিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার উপায় নেই। ‘রাক্ষস’ও যথারীতি হিট হয়েছে, দর্শক পছন্দ করেছে খোকন-ফরীদি জুটিকে। এই ছবিতেও সমসাময়িক সমাজের জন্য ক্ষতিকর একজন মানুষ তথা অমানুষকে তারা চিত্রিত করেছেন, তার বিশেষণ দিয়েছেন ‘রাক্ষস’।

৩০ বছর পর, আবারও এক ঈদে, রূপালি পর্দায় আসছে ‘রাক্ষস’। এবারের নির্মাতা মেহেদি হাসান হৃদয়। এটা তার দ্বিতীয় ছবি। এই নির্মাতার প্রথম ছবি ‘বরবাদ’ দেখার অভিজ্ঞতা এখনও টাটকা। ‘রাক্ষস’ ছবির যাবতীয় প্রচারসামগ্রী দেখার পর মনে হচ্ছে, ছবির নায়ক সিয়াম আহমেদই নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন।

‘রাক্ষস’ তো হওয়ার কথা ভিলেনের। দেশের একটার পর একটা ছবিতে কেন নায়ককেই ভিলেনের ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে? ‘তুফান’, ‘বরবাদ’, ‘তাণ্ডব’, সর্বশেষ ‘রাক্ষস’ও কেন মন্দ মানুষের জয়ধ্বনিতে মুখর? নায়ক যখন কু.পিয়ে, কা.মড়ে মানুষ মা.রছে তখন কেন দর্শকসারিতে উল্লাস? কেন উল্টো পথে হাঁটছে সিনেমা?

আর সব কারণ বাদ দেই। প্রধান কারণটার কথা বলি। আসলে ভারতের ‘কেজিএফ’ আর ‘অ্যানিমেল’-এর হ্যাংওভার থেকে বেরুতে পারছে না ঢালিউড। এরমধ্যে বক্স অফিসের হাতছানি যেমন আছে, তেমন আছে ইন্ডাস্ট্রির সামগ্রিক অক্ষমতা।

গল্পলেখক নেই।
অভিনয়শিল্পী নেই।
মিউজিশয়ান নেই।
বড় ব্যানার নেই।
বিশ্বস্ত দর্শকশ্রেণি নেই।

আগের ‘রাক্ষস’-এর নায়ক, ভিলেন, শিল্পী, সুরকার, সিনেমাটোগ্রাফার, প্রযোজক, পরিচালক—সবাই বাংলাদেশি। খাঁটি বাংলা ছবি ১৯৯৬ সালের ‘রাক্ষস’। ২০২৬ সালের ‘রাক্ষস’-এর জন্য নায়িকা, ভিলেন, টেকনিশিয়ান—আর কী কী জানি না—আমদানি করতে হয়েছে ভারত থেকে। এই ৩০ বছরে আমাদের অধঃপতন আর অধঃগতিটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ‘রাক্ষস’। আমাদের মৌলিকত্ব নেই। আমাদের নিজস্বতা নেই। আমাদের স্বকীয়তা নেই। আমাদের আছে শুধু-
ভায়োলেন্স।
ভায়োলেন্স।
ভায়োলেন্স।


About The Author

মাহফুজুর রহমান

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক

Leave a reply