Select Page

কপিরাইট তথা রিমেক ছবি নির্মাণ ও তারকা তৈরিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আনন্দমেলা সিনেমা

কপিরাইট তথা রিমেক ছবি নির্মাণ ও তারকা তৈরিতে  অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আনন্দমেলা সিনেমা

২০২৫ সালের শেষ দিকে মারা যান ঢালিউডের তিন বড় প্রযোজক। প্রথমে গেলেন কামাল পারভেজ। তারপর গেলেন রুহুল আমিন বাবুল। সর্বশেষ মারা যান সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। বাংলা চলচ্চিত্রে তাদের অবদানের নিরিখে ২০২৫ সাল চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে প্রযোজক হারানোর বছর হিসেবে থেকে যাবে।

সুকুমার রঞ্জন দর্শকদের কাছে তেমন পরিচিত নাম নন। কিন্তু তিনি যে প্রযোজনা সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাকে দেশবাসী এক নামেই চেনে। প্রডাকশন হাউজ হিসেবে আনন্দমেলা সিনেমার উচ্চতা নতুন করে আর বর্ণনার কিছু নেই। এই দেশে হাতেগোনা যে কয়েকটি ব্যানার ব্যবসায়িকভাবে তুুমুল সফলতা পেয়েছে তাদের মধ্যে একটি আনন্দমেলা।

তবে সিনেমাপ্রেমীদের একটা বড় অংশ আনন্দমেলা সিনেমাকে চেনে সালমান শাহ’র আবিষ্কারক হিসেবে। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবি দিয়েই সিনেমাার রাজপুত্রের রূপালি পর্দায় আত্মপ্রকাশ। একই ছবিতে মৌসুমীরও আবির্ভাব। এই দুজনের আগমনে ঢালিউড কীভাবে বদলে গিয়েছিল, তার আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।

আনন্দমেলা ছিল নতুনদের পৃষ্ঠপোষকতায় সিদ্ধহস্ত প্রতিষ্ঠান। নতুন শিল্পীদের জন্য এই প্রডাকশন হাউজের দরজা ছিল উদারভাবে খোলা। এখান থেকে ডেব্যু হয়েছে শাকিল খানের। শাকিল-পপি জুটির আত্মপ্রকাশও আনন্দমেলা সিনেমা থেকেই। তাদের প্রথম ছবি ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’ ইন্ডাস্ট্রিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

একমাত্র শাহেদ শরিফ খানের আত্মপ্রকাশটাই ছিল গোলমেলে। এ ছাড়া যারাই আনন্দমেলা থেকে বেরিয়েছেন, সাফল্য পেয়ে আনন্দমেলার মুখ রক্ষা করেছেন। শাহেদের ব্যর্থতার পেছনে কারণ ছিল সেন্সর বোর্ড। ‘প্রিয় সাথী’ ছবিটি নির্মিত হয়েছিল কলকাতার ‘সাথী’ ছবির কপিরাইট এনে। কিন্তু ছবিটির ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ায় শাহেদ-রত্না অভিনীত ছবিটি আবেদন হারিয়ে ফেলে।

যদিও আনন্দমেলা সিনেমাকে নিয়ে ঢের বিতর্ক হয়েছে ছবিপাড়ায়। ভারত থেকে কপিরাইট এনে ছবি নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু দর্শকের বাঁধভাঙা সমর্থনের কারণে সুকুমার রঞ্জন ঘোষ ও তার অংশীদার প্রযোজককে কখনোই পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

আনন্দমেলা সিনেমার ছবি দর্শককে সেলুলয়েডের আশ্চর্য দুনিয়ায় নিয়ে যেত প্রতি ঈদে। সেই সময় বড় ব্যানারগুলো তাদের সেরা ছবিটি নিয়ে আসত দুই উৎসবে। ১৯৯৬ সালে ‘স্বজন’, ১৯৯৭ সালে ‘জনতার বাদশা’, ১৯৯৮ সালে ‘অগ্নিসাক্ষী’, ১৯৯৯ সালে ‘বিয়ের ফুল’, ২০০০ সালের প্রথম ঈদুল ফিতরে ‘নারীর মন’, ২০০০ সালের দ্বিতীয় ঈদুল ফিতরে ‘এই মন চায় যে…’; প্রতি ঈদেই সবচেয়ে আলোচিত ছবিটি হতো আনন্দমেলার ছবি।

ফজলে হককে দিয়ে প্রথমে আনন্দেমেলা দুটি ছবি পরিচালনা করায়- ‘লড়াই’ ও ‘সম্পর্ক’। কিন্তু তাদের রমরমা শুরু হয় সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ থেকে। এরপর এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে টেক্কা দেয়ার মতো আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশেষত কপিরাইট তথা রিমেক ছবির ক্ষেত্রে তারা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সুকুমার রঞ্জন ঘোষ রাজনীতি করতেন। সংসদ সদস্যও ছিলেন। তবে তিনি প্রযোজনা যখন প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন, তখনই সংসদে গিয়েছিলেন। তার আগে সব দিক থেকেই তিনি একজন প্রভাবশালী প্রযোজক ছিলেন। নতুন শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকত, বড় আয়োজনে ছবি নির্মাণে সাহসিকতা এবং একটি শক্তিশালী প্রযোজনা সংস্থা প্রতিষ্ঠার কারণে ঢালিউডে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার মতো প্রযোজক সিনেমার এই দুঃসময়ে সত্যি খুব দরকার!


About The Author

মাহফুজুর রহমান

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক

Leave a reply