কিছুক্ষণ ‘বনলতা’র অনেকক্ষণ বিনোদন
তানিম নূর ফ্যামিলি অডিয়েন্সের পালস খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন। তাঁর প্রথমদিকের ‘ফিরে এসো বেহুলা’ ছিল হাই থটের টার্গেট অডিয়েন্সের ছবি কিন্তু ‘উৎসব’-এ তিনি পুরোপুরি ফ্যামিলি অডিয়েন্সে ফিরেছেন এবং ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর মাধ্যমে সেটি আরো পূর্ণতা পেয়েছে। নিজের মেকিং স্টাইলের পরিবর্তনের ফলে তাঁর যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলো তা হচ্ছে ফ্যামিলি অডিয়েন্সের ছবির মধ্যে তিনি খুব শীঘ্রই শক্ত অবস্থানে পৌঁছাবেন যদি এ ধারা অব্যাহত রাখেন।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস থেকে নির্মিত একটি ছবি। শতভাগ খাঁটি ‘বাংলাদেশী ছায়াছবি’ হিসেবে এর প্রচারণা করা হয়েছে এবং ছবির মধ্যে সে ছাপ সুস্পষ্ট। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র হওয়াতে এটি সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্রও হয়ে উঠেছে।
ছবির নামকরণের দিকটি ক্রিয়েটিভ ছিল। এক্সপ্রেস’ শব্দটি পরিবহণে বিশেষ করে ট্রেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। লোকাল ট্রেনের থেকে এটি দ্রুতগতির হয় এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্য বেশি থাকে। এজন্য ফ্যামিলি অরিয়েন্টেড যাত্রীই এসব ট্রেনে বেশি ওঠে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর নামকরণের ক্ষেত্রেও ফ্যামিলি অরিয়েন্টেড এই চিন্তাটি ভালোভাবে খাপ খেয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসের নাম সরাসরি না দিয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নাম দেয়াটা ক্রিয়েটিভ হয়েছে।
বিনোদনের ক্ষেত্রে আমরা সচরাচর যা ভাবি নাচগান, ফাইট, রোমান্স ইতাদি যোগ করে নির্মিত একটি ছবি কিন্তু ভালো গল্প, হাসিকান্নামিশ্রিত আড়াই ঘণ্টার কোনো ছবিও বিনোদনমূলক ছবি হবে। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ যেমন বিরতির আগ পর্যন্ত হাসির উপাদান দুর্দান্ত আবার বিরতির পর গল্পের টার্নের মাধ্যমে দর্শকের নীরব হয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশও তৈরি করা হয়েছে। এই যে ভারসাম্যপূর্ণ নির্মাণ এটা দর্শকের বিনোদিত হবার সেরা পদ্ধতি।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছবিতে উপন্যাস অনুযায়ী অনেক চরিত্রের সমাগম ঘটেছে। চরিত্রগুলোর কার কতটুকু অংশ বা কার কম কার বেশি সেটা এ ছবিতে ফ্যাক্টর হয়নি, হয়েছে সবার অংশগুলোর পরিমিত উপস্থাপনা। মা, ছেলে, দম্পতি, ছোট্ট মেয়ে, বন্ধু-বান্ধব, ট্রেনের কর্মচারী সবারই অংশগ্রহণ দারুণভাবে ছবিতে একটা বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে যেখানে সবার উদ্দেশ্যই ভালো কিছুর প্রত্যাশা করা কিন্তু গল্পে তো সবসময় ভালো ঘটবে না, মন খারাপের ঘটনাও থাকবে কিন্তু সব মিলিয়েই সবার অংশগ্রহণ ছবিটিকে আদর্শ একটা জায়গায় নিয়ে গেছে। নির্মাতা নিখুঁতভাবে সব অভিনয়শিল্পীর নির্দিষ্ট স্ক্রিনটাইম অনুযায়ী সবাইকে সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন। এটি তাঁর নির্মাণের বিশেষত্ব বলা যায়।
হুমায়ূন আহমেদের রচনাশৈলীর যে দিকটাতে আমরা পরিচিত তিনি এক উপন্যাসে রাজনীতি, অর্থনীতি, গণিত, পদার্থ, চিকিৎসাবিদ্যা সবকিছু নিয়ে আসেন চরিত্রগুলোর কথোপকথনে এ উপন্যাসে সেটাই ছিল। অনেকের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নানা বিষয়ের সূত্রপাত ঘটেছে। তার সাথে যেমন ছিল হিউমারসমৃদ্ধ ডায়লগ তেমনি ছিল জীবন সম্পর্কে গভীর দর্শন। ডায়লগের ভেরিয়েশন যথেষ্ট :
হিউমারসমৃদ্ধ ডায়লগ যেমন-”উত্তরবঙ্গের ট্রেন হলো আমাদের দেশের পলেটিক্যাল ম্যাচিউরিটির মতো দুটোই দেরিতে আসে।”
প্রতীকী যেমন-“ইটের ভাটা বন্ধ হয়ে গেছে” (সিগারেট অর্থে)
না এখন বরফকল চালু হইছে (মদ অর্থে)
জীবন দর্শন নিয়ে-“
১. আমাদের দেশের মানুষ কেন জানি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে তাদের প্রাইভেট দিক বের করে আনতে বেশি পছন্দ করে।
২. বাবা-মা ছাড়া বড় হওয়ার একটা বিষয় হচ্ছে সবার কাছে বুঝদার প্রমাণ করা কিন্তু ভেতরে ভেতরে বাচ্চাই রয়ে যাওয়া।
৩. ট্রেনে পার্সোনাল বলে কিছু নাই, এখানে সবাই একসাথে ঝাঁকি খায় একসাথে দোল খায়।
রোমান্টিক ডায়লগ-“আমার জীবনের সেরা কবিতাটা আমি তোমার ছন্দে লিখতে চাই, তুমি কি আমাকে একটু অন্তঃমিল ধার দিবা।”
অন্যরকম-“আইয়ুব বাচ্চু যখন গীটার বাজায় তখন গানের জন্য কেউ অপেক্ষা করে না।”

মাল্টিকাস্টিং ছবির যে প্রয়োজনীয়তা আমরা এখন বেশি বোধ করি এ ছবিতে সেটা ছিল। এক ছবিতে মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, বাঁধন, মম, সাবিলা নূর, শরিফুল রাজ, শ্যামল মওলা, ইন্তেখাব দিনার, শামীমা নাজনীন, লাবণ্য চৌধুরী, একে আজাদ সেতু, ফারুক আহমেদ, ডা. এজাজুল ইসলাম, শিশুশিল্পী তৃধা কত তারকা। সবার জন্য যা নির্ধারিত ছিল ছবিতে সবগুলো চরিত্র একটা জায়গায় এসে ছবিটিকে অসাধারণ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
গানের ক্ষেত্রেও ভেরিয়েশন ছবিতে। রবীন্দ্র সঙ্গীত, আইয়ুব বাচ্চুর কালজয়ী গান ‘উড়াল দেবো আকাশে’-র রিক্রিয়েশন, মৌলিক গানসহ দারুণ সংযোজন হয়েছে। ট্রেনের ভেতরের দৃশ্যগুলো যেমন রিয়েলিস্টিক ছিল জোছনা রাতের দৃশ্যে বাইরের প্রকৃতিও মনোরম ছিল। ছবির বিজিএম ছিল টপনচ। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে দেখতেন ও গর্ববোধ করতেন যে তাঁর সাহিত্য থেকে শিল্পসম্মত ছবি নির্মিত হয়েছে দেখে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ মোটাদাগে আমাদের সবার ছবি। রিপিট দর্শক বা ওয়ার্ড অব মাউথ তৈরির ছবি। ভবিষ্যতে গল্পকেন্দ্রিক ছবির ইন্ডাস্ট্রির যে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে সে দৌড়ে এ ছবি অন্যতম প্রধান ভূমিকা হিসেবে থাকবে। যেতে যেতে এ ছবির সবচেয়ে গভীর ডায়লগটি শুনতে শুনতে যাওয়া যাক-“জন্মের সময় আমাদের কানে আযান দেয়া হয়, মৃত্যুর পর দেয়া হয় না মৃত্যুর পর হয় নামাজ। এই আযান আর নামাজের মধ্যবর্তী সময়টাই আমাদের জীবন।”
রেটিং – ৯/১০






