Select Page

চারটি বীণার এক সুর ‘প্রেশার কুকার’

চারটি বীণার এক সুর ‘প্রেশার কুকার’

রায়হান রাফি তাঁর ফিল্মোগ্রাফি এমনভাবে সাজাচ্ছেন যেখানে তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে বৈচিত্র্যই প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রথম ছবি ‘পোড়ামন ২’ থেকে শুরু করে বর্তমান ছবি ‘প্রেশার কুকার’ পর্যন্ত নির্মাণের বৈচিত্র্যই প্রধান। পুরোদস্তুর কমার্শিয়াল ছবির পাশাপাশি কমার্শিয়াল অ্যাঙ্গেলেই গল্পপ্রধান ছবির আইডিয়া থেকে নির্মিত হয়েছে তার নতুন ছবি ‘প্রেশার কুকার’। অবশ্যই তার সেরা নির্মাণের ছবি।

নামের দিক থেকে ‘প্রেশার কুকার’ অ্যালেগরিক্যাল। নির্মাতার ভাষ্য অনুযায়ী ঢাকা শহরটা প্রেশার কুকারের মতো এখানে জীবন প্রতিনিয়ত পুড়ছে। সেই পুড়তে থাকা জীবনের মধ্যেই চারজন নারীর জীবনের ক্রমাগত সংগ্রামের বিরতিহীন গল্পের ছবি। চারটি জীবন এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে তাদের জীবন যেন চারটি বীণায় রূপ নিয়ে একটি সুরে এসে মিলিত হয়েছে। বীণাগুলো যদি হয় ভিন্ন ভিন্ন আঘাতের তবে সুরটা হয়েছে না পাওয়ার এবং এটাই ছবির শীর্ষবিন্দু।

এই চারবীণার সুরের যে যাত্রা তাকে চলচ্চিত্রের ক্লাসিফিকেশনেও রায়হান রাফি এক্সপেরিমেন্ট করেছেন হাইপারলিঙ্ক সিনেমা হিসেবে। এ ধরনের সিনেমায় জটিল চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটে তাদের জীবনের জটিলতা অনুযায়ী, রাফি এ এক্সপেরিমেন্ট সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন। প্রেশার কুকার যেমন উত্তাপ ছড়াতে থাকে রান্না পরিপূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এ ছবিতে তেমনই রিয়েলিস্টিক উপাদান আছে। রাফি তার নিজের পরিচালিত ছবির নামকরণে এ ছবির চ্যাপ্টারের নামকরণ করেছেন যেগুলো গল্পকে কানেক্ট করতে সুযোগ করে দেয় দর্শককে। ছবির গল্প লিখেছেন যৌথভাবে রায়হান রাফি, মেহেদি হাসান মুন ও সিয়াম শামস তুষ্ট।

নাজিফা তুষির জীবনের গল্প ছবির গল্পের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। অন্যান্য চরিত্রগুলোও তার লক্ষ্য কিন্তু সেসব চরিত্রেও আলো ফেলা হয়েছে এই চরিত্রের আলোয়। মাসাজ পার্লারের গার্ল হিসেবে তার জীবন সংগ্রাম এক জায়গা থেকে অনেক জায়গায় রূপান্তর হয়েছে। রূপান্তরের জায়গাগুলোতে তার অভিনয়ের যে ডেপথ সেটা উচ্চমাত্রায় প্রশংসনীয়। তুষির অভিনয়ের মধ্যে বাইবর্ন অ্যাকট্রেসের গুণ আছে। তার অস্তিত্বের সংকট যেমন দেখানো হয়েছে পাশাপাশি অস্তিত্বকে সূক্ষ্মভাবে অনুভবও করানো হয়েছে। যেন নিজের আঘাতের ভেতর দিয়েই আবার নিজের কাঙ্ক্ষিত সুখ খুঁজে নেয়ার একটা অবিরাম চেষ্টা। তুষির কর্মক্ষেত্র ও আবেগের ক্ষেত্র একদম আলাদা ছিল এবং দুই ক্ষেত্রে তার অভিনয়ের শক্তিটা পুরোপুরি দেখা গেছে। গেটাপে যেমন পার্থক্য ছিল তেমনি অবস্থান অনুযায়ী অভিনয়েরও যে পার্থক্য থাকতে হয় সেটাও ছিল। একদম ম্যাচিউর অভিনয় যাকে বলে।
শবনম বুবলীর অভিনয়দক্ষতা ‘দেয়ালের দেশ’-এর মতো ছবিতে পরীক্ষিত। তার জন্য এ ছবির চরিত্রটি নতুন ছিল। নতুন চরিত্রে নতুনত্ব দেখানোর অভিনয়ে বুবলী ছিল ন্যাচারাল পারফর্মার। চরিত্রের শেডস অনুযায়ী উত্থান ও পরিণতির একটা শক্ত অবস্থান ছিল।


মারিয়া শান্তর চরিত্রটি চেনা পরিচিত মেয়েদের মতোই কিন্তু সেখানেও সমাজের ঘুণেধরা বাস্তবের ছোঁয়া আছে। তার অভিনয়ও ন্যাচারাল ছিল। স্নিগ্ধা চৌধুরীর চরিত্র নাগরিক জীবনের পরিচিত চরিত্র এবং ভিকটিম হিসেবে আমাদের চেনা।

চারটি চরিত্রকে দাঁড় করানোর জন্য অন্যান্য যে চরিত্রগুলোর অবদান সেটাও রায়হান রাফি অত্যন্ত যত্নের সাথে তুলে ধরেছেন। নায়মা আলম মাহার চরিত্রের কথাই ধরা যাক যে ছিল গল্পের প্রধান একটি চরিত্রকে দাঁড় করানোর অন্যতম কারিগর। রিজভী রিজু যার অভিনয়ের মধ্যে একটা আর্টিস্টিক ব্যাপার আছে সেও ছিল এ ছবিকে প্রাণ দেয়ার অন্যতম কারিগর।

রাফির আরো কিছু দারুণ এক্সপেরিমেন্ট ছিল শক্তিমান অভিনেতা, অভিনেত্রীদের নিয়ে খেলা করা। শহীদুজ্জামান সেলিমের রুগ্ন, বদরাগী ও গল্পের প্রয়োজনে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার অভিনয় ছিল দেখার মতো। মিশা সওদাগরের মতো জাঁদরেল ভিলেনকে ঠাণ্ডা মাথার অভিনেতা বানিয়েছেন। ফজলুর রহমান বাবুকে গেম চেঞ্জারের ভূমিকায় দুর্দান্তভাবে দেখিয়েছেন। ফরহাদ লিমনের দুই রূপের চরিত্রও বাস্তবসম্মত।

ছবির কারিগরি দিক নিখুঁতভাবেই স্ট্রং। বিজিএম তো শক্তিশালী ছিলই সাথে ড্রামাটিক সিচুয়েশনে ব্যবহৃত র‍্যাপিংগুলো ছিল পাওয়ারফুল। প্রথম শটটাই ছিল আর্টিস্টিক। আউটডোর লোকেশনের মধ্যে গ্রামীণ লোকেশনগুলো মনোরম আর ঢাকার ঘনবসতি, যানবাহনের ভিড়, প্রতিযোগিতাপূর্ণ জীবনের দৃশ্যায়ন অর্থবহ।

মধুর ভান্ডারকরের ‘ফ্যাশন’ নামে একটি হিন্দি সিনেমা আছে সেখানে কয়েকজন নারীর ফ্যাশন জগতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। রায়হান রাফি নাগরিক উত্তাপের বাস্তব চিত্র নারীকেন্দ্রিক আবহে ‘প্রেশার কুকার’-এর মাধ্যমে যেভাবে তুলে ধরেছেন এটিও বাস্তবসম্মত একটি চলচ্চিত্র হয়ে থাকল। এ ধরনের চলচ্চিত্র ভবিষ্যতে যারা নির্মাণ করতে চাইবেন এ ছবিটি তাদের জন্য স্ট্রং রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।উৎসবকেন্দ্রিক ছবির ক্ষেত্রে যাদের আজও ধারণা কাজ করে যে ধুমধাড়াক্কা নাচগানের কমার্শিয়াল ছবি ছাড়া চলে না ‘প্রেশার কুকার’ সেইসব ট্যাবু ভাঙারও পদক্ষেপ হয়ে থাকবে।

রেটিং – ৮.৫/১০


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply