জংলি’ দিয়ে আনা দর্শক সিয়াম হারালো ‘রাক্ষস’ করে!
হুমায়ূন ফরীদি একবার বলেছিলেন, ‘ভিলেন রোল করা সহজ। কারণ সে যা খুশি তাই করতে পারে।’ ভিলেন যাই খারাপ করুক, সেটা ভ্যালিড হয়ে যায় তার প্লেসমেন্টের জন্য। ইদানিংকালে নায়করাই এন্টাগনিস্ট হচ্ছে, এটা নিয়ে আপত্তির কিছু নাই। নায়ক মানেই সুশীল, ভদ্র, ন্যায়ের পক্ষে, কোন বদভ্যাস ছাড়া থাকবে সেটা এইসময়ে বাধ্যতামূলক মনে করে না দর্শক। তবে তারা যাকে নায়ক ভাবছে বা যে নায়ক নিজেকে দর্শকের সেই ভাবনার জায়গায় থাকতে চাচ্ছেন, তাকে ১০ পারসেন্ট হলেও দায়িত্বশীল হতে হবে, স্ক্রিনে যা খুশি তাই করা বা বলা তার কাছে হয়তো কাম্য না। ‘ইনসাফ’র পর শরীফুল রাজের ক্ষেত্রে এইকথা যেমন খাটে, ‘রাক্ষস’র পর সিয়ামের ক্ষেত্রেও তাই।

ক্ষ্যাপাটে চরিত্রের রুশো ভার্সিটির টিচার, খুব সম্ভব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ান। এক ছাত্রীর নোংরা ছবি দেয়ালে আঁকায় আরেক ছাত্রকে মেরে আহত করে রুশো ছয় বছরের জন্য জেলে যায়। ছয় মাসের মধ্যে জামিনে ফিরে আসে৷ তার ক্লাস করতে এসে এটিচ্যুডে প্রেমে পড়ে যায় দিয়া৷ রুশো সেটা টের পেয়ে প্রেমে সায় দেয়। বিপত্তি নামে যখন দিয়াকে শয্যাসঙ্গী(!) হিসেবে চায় শহরের সাইকো বিজনেসম্যান শায়ান। দিয়াকে কেন্দ্র করে রুশো আর শায়ানের দ্বন্দ্বে এগিয়ে যায় গল্প।
একটা সিনেমা প্রপার হতে কমপক্ষে যতটুকু বিল্ড আপ, ক্যারেক্টার এস্টাবলিশমেন্ট বা ব্যাকড্রপের দরকার হয়, ‘রাক্ষস’ এ সেটুকুও নাই। ভুল না করলে যদি বলি, এই সিনেমার কোন আলাদা রাইটারও নাই। রাইটার সিন বাই সিন একটা গল্পকে দাঁড় করান। সেখানে ভায়োলেন্স, যৌনতার ইঙ্গিত, গালিগালাজ একেকটা দৃশ্যের প্রয়োজনীয় টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যখন এই টুলগুলো ব্যবহার করার জন্যই দৃশ্য লেখা হয়, তখন আর গল্পটা দাঁড়ায় না, কয়েকটা দৃশ্যের কালেকশন হয়ে পড়ে থাকে বিচ্ছিন্নভাবে। ‘রাক্ষস’ নির্মাতা মেহেদী হাসান হৃদয়কে আমার খুব সৌভাগ্যবান মনে হয়। উনি আত্মীয় হিসেবে বেশ ভালো প্রযোজক পেয়েছেন, বাংলাদেশের মত বিনোদনের অভাবী দর্শক পেয়েছেন যাদের অনেকে যা দেবে তাই খাবে এবং তিনি দুইটি সিনেমাতেই এমন এক্টরদের পেয়েছেন যারা তার এই গল্পকে বিরাট কিছু ভেবে নিজেদের সপে দিয়েছে। অথচ, ভালো প্রযোজক ও টাকার অভাবে একের পর এক পরীক্ষা দিয়েও অনেক ভালো পরিচালক এখনও সিনেমায় হাল ধরতে পারেন নাই। ‘রাক্ষস’, ‘বরবাদ’র পর হৃদয়ের আরেকটা ডিরেক্টরিয়াল ডিজাস্টার যেখানে ‘বরবাদ’কে এগিয়ে রাখতে হবে।

সিয়ামকে দর্শক শাকিবের জায়গায় দেখার জন্য হলে যায় না হয়তো। কারণ শাকিবের জায়গাটা আরেক লেভেলে চলে গেছে। সেই সময় সুযোগ বা ইন্ডাস্ট্রির অবস্থাও বাস্তবতার নিরিখে নাই। তবে শাকিবের পরে সিয়ামের ভালো সম্ভাবনা আছে। একটু একটু করে এগিয়ে ‘জংলি’র মতো সিনেমা যখন সিয়ামের আলাদা ফ্যানবেজ তৈরি করে, তখন তারা ‘রাক্ষস’ এ গিয়ে চিট ফিল করে। কেননা, সিয়াম এখানে ডিরেক্টরের চিন্তাকে সম্মান জানাতে গিয়ে একটা ফাঁপা, অসংলগ্ন স্ক্রিপ্ট বেছে নিয়েছেন যেখানে তার এই রুশো চরিত্রের লংটাইম স্টাবিলিটি নাই। তাছাড়া, অনেক জায়গায় সিয়াম আপ্রাণ চেষ্টা করলেও দর্শককে পিক হিরোইজম দেখাতে পারেন নাই। চিৎকার, প্রচন্ড ক্রেজিনেস, অত্যাধিক গালাগালি ও ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান সবই একসাথে থাকা বিরল ক্যারেক্টার ছিল সিয়ামের ক্যারেক্টর।
ভালো অভিনেতা সে, যে নিজের দূর্বলতা জানে। দর্শক সাময়িক চায় বলেই, একটা এভারেজ গল্প, অবাস্তব চরিত্র ধারণ করাটা ভালো অভিনেতার কাজ না। যে নিজে নারীকে সম্মান দিতে চায়, সে কখনও বলবে না – ‘আমি খাওয়া মাল খাই না!’ এরকম আরো কন্ট্রাডিক্টরি জায়গা আছে পুরো সিনেমায়। যেমন, একজন মাকে তার সন্তানের সামনে আপত্তিকর ভাষায় চাচা কথা বলছে, সেখানে সন্তানের বাবা নিরব। আর সন্তান অতিরিক্ত ক্রেইজি, সেটা আবার মায়ের পছন্দ না!

ওপারের সুস্মিতা ঠিক কোন যুক্তিতে ‘রাক্ষস’ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছেন, জানি না। ‘বরবাদ’ এর ইধিকা থেকেও তার চরিত্র দুর্বল, কান্না ছাড়া খুব বেশি কিছু করার চ্যালেঞ্জ ছিল না। আলীরাজ, সুজাতাদের মতো লেজেন্ডরাও গা ভাসিয়েছেন হাস্যকরভাবে অসুস্থ মানসিকতার চরিত্রে। গুণি অভিনেত্রী চুমকি নিজের চরিত্রে বারবার নিজেই কন্ট্রাডিক্ট করেছেন, যেটা আগেই বলেছি। যেজন্য মা-ছেলের সম্পর্ক কানেক্টই করতে পারে নাই। সবচেয়ে লাভবান বলবো, সোহেল মণ্ডলকে। ভিন্নধর্মী ক্যারেক্টারে ভালো করেছেন, দর্শককে চমকাতে পেরেছেন। একই পয়েন্টে ব্যর্থ হয়েছেন পার্টটাইমার আবরার আতহার। শাতাফ ফিগার নিজের ইমেজই তৈরি করতে পারেন নাই তিন সিনে এক্টিং করে।
একজন মানুষ আলফা মেইল জন্ম দিতে পারে না। আলফা মেইল পরিবেশ পরিস্থিতিতে হয়ে যেতে পারে। তার কারণ বা ব্যাকড্রপ কোথাও নাই রুশোর। এখানে সবাই অতিরিক্ত উত্তেজিত, অনেকেই মানসিকভাবে অসুস্থ, সবারই গ্যাং আছে। এরা বিচ্ছিন্ন ইউনিভার্সে বাস করে যেখানে আইন আদালত না দেখালেও চলে। গালিগালাজ না করলে ডায়লগ পরিপূর্ণ হয় না। ২০২৬ এ এসে এতো দুর্বল একশন, দুর্বল রাইভালটি দেখবো ভাবি নাই। নায়ক করতে চাচ্ছে, সেটা হচ্ছে না-এরকম একবারও মনে হয় না। বিরতির পর যেন এলাকা এলাকা মারামারির পর রেগুলার বেসিসে শুধু একশন আর রিভেঞ্জ দেখানো হলো।
গানগুলো মোটামুটি। আইটেম গানটা বেমানান তবে এই ঈদে সেরা। ইমরানের রোমান্টিক গান এবার রেস্টে যাওয়া দরকার, বেচারাকে লিমিটের বেশি কাজ দেয়া হয়ে গেছে। একশন খুব স্টাইলিশ থাকলেও ভায়োলেন্স ছিল আলগা ও একপেশে, অন্য সিনেমার জোন পর্যন্ত ইন্সপায়ারড। সবমিলিয়ে বলা যায়, ‘জংলি’ দিয়ে আনা দর্শক সিয়াম হারালো ‘রাক্ষস’ করে!
রেটিং: ৩/১০






