Select Page

‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩’ নিয়ে স্বস্তি ও অস্বস্তি

‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩’ নিয়ে স্বস্তি ও অস্বস্তি

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩ প্রদানের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জুরিবোর্ড গঠন করা হয়, যা পূর্ণরূপ পায় নভেম্বরে। এরপর বিচারকেরা ছবি দেখা শুরু করেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ছবি দেখার কাজ শেষ হয়। পরে বিচারকরা পুরস্কারের জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করেন। ৪ মার্চ সেই সুপারিশ সংবলিত ফাইল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠায় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে গেজেট আকারে তা প্রকাশের কথা একাধিকবার শোনা গেলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। অবশেষে দীর্ঘ ৯ মাস বিলম্বের পর প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩-এর বিজয়ীদের তালিকা। আর এরপর থেকেই শুরু হয়েছে একের পর এক বিতর্ক। আপাতত এসব তর্ক-বিতর্ক নিয়েই বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করছি।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারকে সিনেমা অঙ্গনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই পুরস্কার তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে বহু আগেই। কেননা এতোবছর যাবত সব অযোগ্য এবং অযাচিত লোকেদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে প্রতিবছরই সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মৃত ব্যক্তিদের দেয়া হয়েছে আজীবন সম্মাননা। ২০২৩ সালের এ পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা যৌথভাবে পাচ্ছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ (প্রয়াত) এবং বরেণ্য চিত্রগ্রাহক ও নির্মাতা আব্দুল লতিফ বাচ্চু (প্রয়াত)। যদিও এ সম্মান মৃত ব্যক্তিদের দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। এই অসংগতি ধরা পড়ার পর ২-১ দিনের মধ্যে তা সংশোধন করা হবে বলেও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন জুরিবোর্ডের এক সদস্য।

পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার ক্যাটাগরি নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ‘রক্তজবা’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে পরিচালক নিয়ামুল মুক্তাকে, যেখানে সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছেন মোহাম্মাদ তাসনীমুল হাসান তাজ। অবশ্য, ‘রক্তজবা’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য কীভাবে বিবেচিত হয়েছে—সেটাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা, সিনেমাহলে মুক্তি ছাড়াই সরাসরি ওটিটিতে মুক্তি পাওয়া একটি সিনেমা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য যেখানে জমা পড়ারই অনুমতি নেই, সেখানে এমন একটা সিনেমার চিত্রনাট্যকার পাচ্ছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার! ব্যাপারটা আসলেই হাস্যকর এবং বিতর্কিত বটে।

অফিসিয়ালি বিতর্ক এখানে শেষ হলেও বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। কেন্দ্রীয় চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ক্যাটাগরিতে ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন অভিনেতা আফরান নিশো। এদিকে এক অংশের দাবি এই পুরস্কার শাকিব খান ডিজার্ভ করেন ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার জন্য। ‘প্রিয়তমা’য় শাকিব খান শেষ আধাঘণ্টায় যা দেখিছেন, তা নাকি ‘সুড়ঙ্গ’র নিশোকে ছাড়িয়ে গেছে! এক্ষেত্রে আমার মনে হয়, শেষ আধাঘন্টায় বেটার পারফর্ম করা অভিনয়শিল্পীদের জন্য আলাদা একটা ক্যাটাগরি বানানো উচিত। নাম দেওয়া যেতে পারে “শেষ আধাঘন্টার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা” ক্যাটাগরি। অবশ্য, শাকিব খান ২০১৫ সালে ‘আরো ভালোবাসাবো তোমায়’ সিনেমার শেষ ১০ মিনিটে যা অভিনয় দেখিয়েছেন, তা নিয়ে আজও মানুষ কথা বলে। সেই সিনেমার জন্য শাকিব খান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলে ‘প্রিয়তমা’ কেন নয়!

যাইহোক, সিরিয়াল আলোচনায় আসি। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ক্যাটাগরিতে নিশোর পুরস্কার পাওয়াটা আমার ফেয়ার মনে হয়েছে। এমনকি নিশো কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করা এই দশকের অন্যতম একজন অভিনেতা, যার পুরস্কার পাওয়াটা যথাযথ লেগেছে। ২০২০ সালে সিয়াম আহমেদ যখন ‘বিশ্বসুন্দরী’ সিনেমার জন্য পুরস্কার পেলো, তখন যে সমালোচনার বন্যা বয়ে যাচ্ছিলো, সেটা এটলিস্ট নিশো ডিজার্ভ করেন না। নিশো তার পাওয়ারফুল পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন বলা যায়। অন্যদিকে, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে ‘সাঁতাও’ সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন আইনুন পুতুল। দেশের সিজনাল সিনেপ্রেমীরা ওনাকে চেনেন না জানি। তবে পুতুল ‘সাঁতাও’ সিনেমায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন। তবুও আমার মনে হয়-এই ক্যাটাগরিতে ‘প্রহেলিকা’ সিনেমার জন্য শবনম বুবলীকে যৌথভাবে রাখা যেতো। যাইহোক, ২০২৪ সালেও ‘দেয়ালের দেশ’ সিনেমার জন্য বুবলী যে যথেষ্ট এগিয়ে আছে—সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পার্শ্ব চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে ‘ওরা সাত জন’ সিনেমার জন্য পুরস্কার পেয়েছেন নাজিয়া হক অর্ষা। অর্ষা ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দের অভিনেত্রী। তবে পছন্দের অভিনেত্রী এমন আনইমপেক্টফুল চরিত্র এবং অভিনয়ের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন—এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা। তাছাড়া সিনেমায় অর্ষার চরিত্রটির ব্যাপ্তি ২-৩ মিনিট। এটাকে পার্শ্ব চরিত্র না বলে ক্যামিও বললেও ভুল হবে না। একই কথা বলবো ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’ সিনেমার জন্য খলচরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পাওয়া আশিষ খন্দকারের ক্ষেত্রে। অর্ষার তুলনায় আশিষ খন্দকার স্ক্রিনটাইম বেশি পেলেও সিনেমায় উনি যা ভাঁড়ামো করেছেন, তাতে ওনাকে শ্রেষ্ঠ খলনায়ক বলার ভুল কেউ করবে বলে মনে হয় না—তবে জুরিবোর্ড মেম্বাররা করেছেন। এই ক্যাটাগরিতে ‘প্রহেলিকা’ সিনেমার জন্য নাসির উদ্দীন খান যোগ্য দাবিদার ছিলেন বলে মনে করি।

এবারের আসরে জুরিবোর্ড মেম্বাররা বোধহয় এক্সপেরিয়েন্স এবং জনপ্রিয়তাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। না হলে ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’ সিনেমায় মনে না রাখার মতো মিউজিকের কাজ করে ইমন চৌধুরী কীভাবে পুরস্কার পায়—সেটা আমার জানা নেই। মান্ধাতার আমলের নাচ কোরিওগ্রাফি করে ‘লাল শাড়ি’ সিনেমার জন্য হাবিবুর রহমানকে দেয়া পুরস্কারও বোধহয় অভিজ্ঞতাকে সম্মান জানিয়েই দেয়া। তবে সবচেয়ে অবাক হয়েছি ‘ও প্রিয়তমা’ গানের জন্য শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে বালামের নাম দেখে। বালামের জনপ্রিয়তা যে এখানে মূখ্য ভূমিকা রেখেছে—সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমি সত্যি বলতে এই ক্যাটাগরিতে ‘ঈশ্বর’ গানের জন্য রিয়াদ ছাড়া আর কারো নাম ভাবতেই পারিনি। তবে জুরিবোর্ড মেম্বারদের কান অব্দি কেন রিয়াদের মায়া জড়ানো কণ্ঠ পৌঁছাতে পারেনি—সেটা একপ্রকার রহস্যই বটে। যদিও ‘ঈশ্বর’ গানের জন্যই শ্রেষ্ঠ সুরকার এবং শ্রেষ্ঠ গীতিকার ক্যাটাগরিতে পুরস্কার উঠেছে প্রিন্স মাহমুদ এবং সোমেশ্বর অলীর হাতে, যা এবারের আসরের অন্যতম ফেয়ার পুরস্কারগুলোর মধ্যেই পড়ে।

অভিযোগ নেই ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার জন্য কৌতুক চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিমের পুরস্কার পাওয়া নিয়ে। পার্শ্ব চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ‘প্রহেলিকা’র এ কে আজাদ সেতু যোগ্য দাবিদার হলেও ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার জন্য মনির আহাম্মেদ শাকিলের পুরস্কার পাওয়াটাও মেনে নেয়া যায়। একই সিনেমার ‘গা ছুঁয়ে বলো’ গানের জন্য অবন্তি সিঁথির সুইট ভয়েস পুরস্কৃত হয়েছে ভেবে ভালো লাগছে। ভালো লাগছে শিল্প নির্দেশক হিসেবে শহীদুল ইসলামের পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারটাও। ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার জন্য ওনার শিল্প নির্দেশনা সত্যিই প্রশংসা করার মতো। আর এই চমৎকার শিল্প নির্দেশনাকে চোখ জুড়ানো সিনেমাটোগ্রাফিতে ফুটিয়ে তোলার জন্য সুমন সরকারের পুরস্কার পাওয়াটাও ভালো কিছুই বটে।

শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা ক্যাটাগরিতে ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার জন্য পুরস্কার পেয়েছেন যৌথভাবে রায়হান রাফী এবং সৈয়দ নাজিম-উদ-দৌলা। শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসেবে ‘প্রিয়তমা’র জন্য পুরস্কৃত হচ্ছেন ফারুক হোসেন। তবে ফারুক হোসেন তার এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি ভেবে খারাপ লাগছে। শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক সুজন মাহমুদ (সাঁতাও) এবং শ্রেষ্ঠ পোশাক ও সাজসজ্জা ক্যাটাগরিতে বীথি আফরীন (সুড়ঙ্গ)-এর পুরস্কার পাওয়া নিয়েও নেই অভিযোগের জায়গা। তবে শ্রেষ্ঠ মেক-আপ ম্যান হিসেবে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার জন্য সবুজ খান ঠিক কোন বিবেচনায় পুরস্কার পেয়েছেন—আমার জানা নেই। ‘প্রিয়তমা’র শেষ দৃশ্যের প্রস্থেটিকের কাজ যেখানে ভারত থেকে আর্টিস্ট এনে ৫ লাখ টাকা খরচ করে করানো হলো, সেখানে সবুজ খানকে বোধহয় সেই ভারতীয় আর্টিস্টদের সম্মানার্থেই পুরস্কার দেয়া হয়েছে।

এতকিছুর মাঝেও স্বস্তির জায়গা—শ্রেষ্ঠ সিনেমা ‘সাঁতাও’ এবং একই সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক খন্দকার সুমন। গণ-অর্থায়নে নির্মিত একটি সিনেমা কতোটা মিনিংফুল এবং সুন্দর হতে পারে—তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘সাঁতাও’। এছাড়া শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ক্যাটাগরিতে মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার পাওয়া লিমন ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী ক্যাটাগরিতে পাচ্ছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, যা সত্যিই ভালো লাগার মতো ব্যাপার। পাশাপাশি একই সিনেমার জন্য শিশুশিল্পী ক্যাটাগরিতে বিশেষ পুরস্কার পাচ্ছেন আরিফ হাসান।

সবশেষে বলতে হয়— জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়ে তর্ক বির্তক চলতেই থাকবে। তবে এটা থেকে অধীনস্থ কর্মকর্তারা শিক্ষা না নিলে এই বিতর্ক আগামীতে আরও বাড়তে থাকবে। আমি আশা করবো-আগামীতে যেন যোগ্যরাই পুরস্কার পায়, তবেই সমালোচনা কমবে, আলোচনা বাড়বে, ভালো কাজের প্রতিযোগিতা বাড়বে।


Leave a reply