
দাগি: হৃদয়ে রক্তক্ষরণ
অবশেষে জেনেছি মানুষ একা / মানুষ তার চিবুকের কাছেও অনেক অচেনা ও একা / দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এ পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।- আবুল হাসান

মানুষ শেষ পর্যন্ত একা। অনেকের মধ্যে থেকেও একা। নিশান একা সবকিছু থাকার পরেও একা।
নিশান জেল থেকে বের হয় বাইরের পৃথিবীতে নতুন করে বাঁচতে কিন্তু বাইরের পৃথিবী তাকে কতটুকু বরণ করার জন্য প্রস্তুত!
আমরা নিশানের চোখে পৃথিবীর নিষ্ঠুর রূপ দেখি। আমরা প্রত্যেকে নিশান হয়ে যাই। আমাদের হৃদয়ে দাগ থাকে যার যার মতো যেখানে না পাওয়ার বেদনা আছে। যার যার বেদনা তার তার মতো এবং এক একটা দাগ থেকে যায় হৃদয়ে। সেই হৃদয়ের গল্প ‘দাগী’।
বিজয় দিবসে নিশান জেল থেকে ছাড়া পায় কিন্তু তার জীবনের বিজয় এসেছিল কি? তার বিজয়ের গল্প বাস্তবতার বিষবাষ্পে জর্জরিত। নিশান স্বপ্ন দেখে, চলতে পথে হাঁসের বাচ্চার চলাচল দেখতে দেখতে তার মনে হয় জীবন আবার নতুন করে শুরু করা যায় কিন্তু কতদূর সে যেতে পারবে?
মা নিশানকে জড়িয়ে কাঁদে, বাবা বুকে পাথর বেঁধে দূরত্ব রাখে, সমাজ দূর দূর করে তাড়াতে চায়। ‘জেলের দাগ একবার যার লেগেছে সেই দাগী’ এই প্রবাদে বিশ্বাসী সমাজ নিশানকে মানে না। নিশান তাহলে কি করবে?
নিশান ভালোবেসেছে, তার ভালোবাসায় স্নিগ্ধতা ছিল, আদর ছিল। ছিল না তবে কি?
জেরিন নামের প্রিয়তমা আমাদের অনেকের জীবনের গল্পে আছে। জেরিনদের আমরা ভালোবাসি, জেরিনরাও বাসে কিন্তু নিয়তি কাকে ভালোবাসে? লিখনরাও ভালোবাসতে চায়, শব্দে-নিঃশব্দে, নীরবে-নিভৃতে কিন্তু নিয়তি কি লিখনদের ভালোবাসে? কি অপেক্ষা করে জেরিন বা লিখনদের জন্য?
নিশানের জীবনের বাঁক আমাদের অনেকের জীবনেরই বাঁক নয় কি? সেখানে অনিশ্চয়তা, কিছুটা আশার আলো দেখা, ফের অন্ধকার দেখা এভাবে ছুটে চলা। সম্পর্কের ফাঁদে পড়ে নিশানের মতো আমরাও হোঁচট খেতে থাকি। নিশানের জীবনে এত এত হোঁচট যে তার শেষ কোথায় দর্শক অপেক্ষা না করে পারে না।
‘লাইফ সাইকেল চালানোর মতো, পড়ে যেতে না চাইলে সামনে আগাতে হয়’ এই যখন দর্শন জীবনের ছুটে চলাই এর একমাত্র রূপ। ভালোর সাথে, মন্দের সাথে মিলে জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই দেখার পালা।
নিশান আমাদের ভালোবাসায় ‘আমায় দিও একটুখানি ছুঁয়ে আমায় দিও একটুখানি মন’ বলে। বারবার সমাজের চাপে পিষ্ট হওয়া নিশান আবার বলে ওঠে-‘যতবার খুশি মারো তবু বারবার জাগি।’ নিশান মির্জা গালিবের শেরের মধ্য দিয়ে রোমান্টিক, স্যাড সবকিছু তুলে ধরে যেন গালিবীয় ব্যক্তিত্ব।
নিশানরূপী নিশোর বাস্তবসম্মত অভিনয়ে ডুব দিয়ে আমরা নিশান হয়ে উঠি যাদের হৃদয়ে দাগের ক্ষত কখনো শুকায় না, জেরিনরূপী তমা মির্জার অভিনয়ে আমরা জেরিনদের অন্তঃস্থলকে দেখতে পাই, লিখনরূপী সুনেরাহর অভিনয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতে চেষ্টা করি উপলব্ধি করি জীবনের নতুন রঙকে, বাকিদের মধ্য দিয়ে আমরা সমাজের নিত্যনৈমিত্তিক রূপ দেখি যা শুধু সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই।
আমরা যখনই হাঁপিয়ে উঠি আমাদের উদ্দীপনা দিতে কানে কানে এ চলচ্চিত্র বলে যায়-‘আল্লাহর দুনিয়ায় সব সুন্দর। বৃক্ষ সুন্দর পাতা সুন্দর মেঘ সুন্দর আলো সুন্দর।’
আর শিহাব শাহীনরূপী নির্মাতা আমাদের চোখে চোখ রেখে বলে যান, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে আমরা কত শত কাল ধরে এক একজন নিশান হয়ে উঠি যাদের সবার গল্প আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। ধন্য সেই নিশানরা।
রেটিং – ৮/১০