Select Page

চলচ্চিত্রে সাহিত্য, আলোচিত ১৫

চলচ্চিত্রে সাহিত্য, আলোচিত ১৫

বাংলা সিনেমা তিতাস একটি নদীর নাম, বসুন্ধরা, সারেং বউ

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘সাহিত্য’ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ ছিল সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন। এই ৬০ বছরে অসংখ্যক সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। শুধু গল্প বা উপন্যাস নয়— কবিতা অবলম্বনেও সিনেমা নির্মিত হয়েছে। হয়েছে দর্শকনন্দিত, পেয়েছে পুরস্কৃত। সেই সুবাদে চলচ্চিত্রাঙ্গনে বাংলা সাহিত্যিকরা পেয়েছেন বিশেষ মর্যাদা। এমনকি শুরুর দিকে অনেক ঢাকাই সিনেমার সঙ্গে সাহিত্যিকরা যুক্ত ছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা ১৫ সাহিত্যিকের সৃষ্টির চলচ্চিত্ররূপ নিয়ে এই আয়োজন—

তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩) : প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মনের কালজয়ী উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম অবলম্বনে দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনায় সিনেমাটি নির্মান করেন ঋত্বিক ঘটক। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র। দর্শকপ্রিয় ও সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত ছবিটি ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের জরিপে বাংলাদেশি ছবির তালিকায় শীর্ষস্থান অর্জন করেছিল। ওস্তাদ বাহাদুর খানের সঙ্গীত ও বেবী ইসলামের অসামান্য চিত্রগ্রহণ ছবিটিকে অন্যরকম পূর্ণতা দিয়েছে। তিতাস নদীর পাড়ে ববসবাসরত জেলেপাড়ার মানুষদের জীবনযাত্রা নিয়ে নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেছেন রোজি আফসারী, গোলাম মুস্তাফা, প্রবীর মিত্র, রানী সরকার, রওশন জামিল, কবরী প্রমুখ।

বসুন্ধরা (১৯৭৭) :  আলাউদ্দিন আল আজাদের বিখ্যাত উপন্যাস তেইশ নম্বর তৈলচিত্র অবলম্বনে সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেন সিনেমাটি। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট নিবেদিত ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র-সহ ছয়টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। আলাউদ্দিন আল আজাদ পান সেরা কাহিনীকারের পুরস্কার। সত্য সাহার সঙ্গীতে এক তরুণ চিত্রকরের প্রদর্শনীতে এক অপূর্ব চিত্র নিয়ে আলোচিত হওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন ববিতা, ইলিয়াস কাঞ্চন, নূতন, সৈয়দ হাসান ইমাম-সহ অনেকে। এ সিনেমার মাধ্যমে ইলিয়াস কাঞ্চনের পর্দা অভিষেক হয়।

এই লেখাটি বিএমডিবি ঈদ সংখ্যা ই-বুক ২০১৭ এর অংশ। পুরো ই-বুক টি ডাউনলোড করুন এখানে

ডাউনলোড করুন

সারেং বউ (১৯৭৮) : শহীদ বুদ্ধিজীবী ও ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সারের বিখ্যাত উপন্যাস সারেং বউ অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। সেরা অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ছবিটি দর্শক ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে বাংলা চলচ্চিত্রের কালজয়ী নির্মাণ হিসেবে স্থান পেয়েছে। আলম খানের সঙ্গীতে বাংলার কোন এক গ্রামে সারেং বউ নবিতনের জীবন সংগ্রাম ফুটে উঠেছে দারুণভাবে। অভিনয় করেছেন কবরী, ফারুক, আরিফুল হক প্রমুখ।

বাংলা সিনেমা দেবদাস, শঙ্খনীল কারাগার, সূর্যদীঘল বাড়ি

সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৭৯) : আবু ইসহাকের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে  সিনেমাটি যৌথভাবে নির্মাণ করেন মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। যা বাংলাদেশের প্রথম সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। একাধিক আর্ন্তজাতিক পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি সেরা চলচ্চিত্র-সহ ৭টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে ছবি। আবু ইসহাক পান সেরা কাহিনীকারের পুরস্কার। জয়গুন নামের এক গ্রাম্য মায়ের সন্তানসহ জীবন সংগ্রাম সাথে কিছু কুসংস্কার ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, ইলোরা গওহর ও এটিএম শামসুজ্জামান।

দেবদাস (১৯৮২) : অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। জমিদার পুত্র ও সাধারণ কন্যার বিয়োগাত্মক প্রেম, পাশাপাশি এক বাঈজীর ভালোবাসা— সার্থকভাবে ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, কবরী, আনোয়ারা, রহমান-সহ অনেকে।

শঙ্খনীল কারাগার (১৯৯২) : হুমায়ূন আহমেদের শঙ্খনীল কারাগার‘ অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেন মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রযোজিত ছবিটি দর্শক ও সমালোচক প্রিয়। আন্তর্জাতিক পুরস্কারের পাশাপাশি সেরা চলচ্চিত্র-সহ চারটি জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। হুমায়ূন আহমেদ ও অর্জন করেন সেরা কাহিনীকারের স্বীকৃতি। এক মধ্যবিত্ত সাধারণ পরিবারের সুখ-দুঃখ, জীবনযাত্রা অসাধারণভাবে ফুটে ওঠেছে এই ছবিতে। প্রধান কয়েকটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডলি জহুর, আসাদুজ্জামান নূর, চম্পা, সুবর্ণা মুস্তাফা, নাজমা আনোয়ার ও মমতাজউদ্দিন আহমেদ।

অারো পড়ুন:   ইশতিয়াক জিকোর সিনেমা ও বাইক্কা আলাপ

বাংলা সিনেমা দীপু নাম্বার টু, হাঙর নদী গ্রেনেড, পদ্মা নদীর মাঝি

পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৯৩) :  মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনায় সিনেমাটি নির্মাণ করেন গৌতম ঘোষ। ছবিটি দুই দেশের দর্শক-সমালোচকদের প্রিয়। ভারতের জাতীয় পুরস্কারে সেরা বাংলা ছবির পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে সেরা চলচ্চিত্র-সহ ৫টি শাখায় পুরস্কার লাভ করে। পদ্মা পাড়ের জেলেদের জীবনযাত্রা ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, চম্পা, রূপা গাঙ্গুলি, উৎপল দত্ত-সহ অনেকে।

দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬) :  মুহম্মদ জাফর ইকবালের জনপ্রিয় কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে সরকারি অনুদানে সিনেমাটি নির্মাণ করেন মোরশেদুল ইসলাম। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশুতোষ চলচ্চিত্র। দর্শক-সমালোচক প্রিয় ছবিটি দুটি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। কিশোর বয়সের সম্পর্কের টানাপোড়েন, বন্ধুত্ব, কৌতুহল সবকিছুই অসাধারণভাবে ফুটে ওঠা ছবিটিতে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, ববিতা, অরুন সাহা- সহ অনেকে।

হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭) :  কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের  মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস অবলম্বনে সরকারি অনুদানে সিনেমাটি নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। একই উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন আলমগীর কবির। চাষীর ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। সেরা অভিনেত্রী-সহ ৩টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। সেলিনা হোসেন অর্জন করেন সেরা কাহিনীকারের পুরস্কার। একজন সাধারণ গ্রাম্য মায়ের চোখে সন্তান, দেশ, স্বাধীনতা অসাধারণভাবে ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন সুচরিতা, সোহেল রানা, অরুনা বিশ্বাস, রাজিব-সহ অনেকে।

বাংলা সিনেমা লালসালু, জয়যাত্রা, হাজার বছর ধরে

লালসালু (২০০১) :  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যস অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেন তানভীর মোকাম্মেল। ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র-সহ ৯টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। ওয়ালীউল্লাহ অর্জন করেন সেরা কাহিনীকারের জাতীয় পুরস্কার। গ্রাম্য সমাজে ধর্মীয় কুসংস্কারকে উপজীব্য করে গল্প এসেছে এ সিনেমায়। অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, মুনিরা ইউসুফ মেমী, চাঁদনী, তৌকীর আহমেদ প্রমুখ।

জয়যাত্রা (২০০৪) : চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক আমজাদ হোসেনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস অবেলায় অসময় অবলম্বনে তৌকীর আহমেদ নির্মাণ করেন জয়যাত্রা। ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র-সহ ৭ বিভাগে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌকায় করে মুক্ত আবাসস্থলের খোঁজে যাওয়া একদল মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা সর্বোপরি স্বাধীনতার স্বপ্ন ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন বিপাশা হায়াত, মাহফুজ আহমেদ, আজিজুল হাকিম, চাঁদনী, নাসিম, হুমায়ূন ফরীদি, আবুল হায়াত-সহ অনেকে।

হাজার বছর ধরে (২০০৫) :  ঔপন্যাসিক ও নির্মাতা জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে সরকারি অনুদানে সিনেমাটি নির্মাণ করেন কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র-সহ ৭টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। সেরা কাহিনীকারের পুরস্কার অর্জন করেন জহির রায়হান। গ্রাম বাংলার আবহমান জীবনধারা, মূল্যবোধ, সম্পর্ক অসাধারণভাবে ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন রিয়াজ, শশী, এটিএম শামসুজ্জামান, শাহনূর, নাজমা আনোয়ার প্রমুখ।

শাস্তি (২০০৫) :  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প শাস্তি অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। এটি ছিল বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে প্রথম রবীন্দ্র সাহিত্যের চলচ্চিত্ররূপ। ছবিটি একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কারও লাভ করে। জমিদার শাসিত সমাজে এক নিম্নবিত্ত পরিবারের ভ্রাতৃত্ববোধ ও নারীর আত্মসম্মানের গল্পে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিয়াজ, পূর্ণিমা, চম্পা ও ইলিয়াস কাঞ্চন।

বাঙলা (২০০৬) : বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফার উপন্যাস ওঙ্কার অবলম্বনে জনপ্রিয় নির্মাতা শহিদুল ইসলাম খোকন নির্মাণ করেন ছবিটি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এক বোবা মেয়ের আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতার স্বপ্ন ফুটেছে এই ছবিতে। অভিনয় করেছেন শাবনূর, মাহফুজ আহমেদ, হুমায়ূন ফরীদি-সহ অনেকে।


Leave a reply

ই-বুক ডাউনলোড করুন

সাপ্তাহিক জরিপ

ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত কোন ছবিটি সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে?

রাজনীতি
নবাব
বস টু

surveymaker

Shares