‘মুখ ও মুখোশ’-এর কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই
ঢাকার প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ৯২ বছর বয়সী এ সংগীতশিল্পী অনেক দিন ধরে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। একাধিকবার ভর্তিও হয়েছিলেন হাসপাতালে।
সংগীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক পেয়েছিলেন মাহবুবা রহমান।
আজ সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মাহবুবা রহমানের মৃত্যুর খবর পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করেছেন সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান।

‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রে ‘মনের বনে দোলা লাগে’ গানে কণ্ঠ দেন মাহবুবা রহমান। গানটির সংগীত পরিচালনা করেছেন সমর দাস। পরে ফতেহ লোহানীর ‘আসিয়া’ সিনেমায় ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে’ গানে কণ্ঠ দিয়ে খ্যাতি পান তিনি। ‘আমার যদি থাকত পাখির ডানা’, ‘আমার না বলা কথা’, ‘সোনালী এই ধানের ক্ষেতে’, ‘আগে জানি নারে দয়াল’, ‘তুমি দাও দেখা দরদী’, ‘আমার বন্ধু বিনোদিয়া’, ‘আজকে আমার মালঞ্চে ফুল ফোটে নাই’, ‘আমার মন ভালো নাগো প্রাণ ভালো নাগো’সহ অসংখ্য গানে কণ্ঠের মায়াজাল ছড়িয়েছেন এ শিল্পী।
কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে মাহবুবা রহমান বলেন, ‘১৯৫৬ সালে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র আব্দুল জব্বার খানের মুখ ও মুখোশ ছবিতে প্লেব্যাক করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। শান্তিনগরের যে বাড়িতে গানটির রেকর্ড হবে, সেই বাড়িটি ছিল মূল সড়কের পাশেই। তখন গান করাটা এত সহজ ছিল না। বাইরে থেকে যেন কোনো শব্দ না শোনা যায়, তাই নেওয়া হলো অভিনব বন্দোবস্ত। যে ঘরটায় আমরা বসেছি, সেটা মুড়িয়ে দেওয়া হলো কাপড় দিয়ে। সেতার, বাঁশি, বেহালা, তবলা আর ঢোলের শিল্পীরা গানটিতে সংগত করেন। তখন গান রেকর্ডিং খুবই কঠিন ছিল। একটু ভুল হলে আবার রেকর্ড করতে হতো। বেশ কবার কাট হওয়ার পর আমার গাওয়া “মনের বনে দোলা লাগে” গানটি ওকে হয়। গানটির সংগীত পরিচালক ছিলেন সমর দাস। মনে আছে, জামান সাহেব আকাই রেকর্ডারে গানটি ধারণ করেন।’
এরপর বলেন, ‘আরেকটি গানের কথা খুব মনে পড়ে। আমাদের বিখ্যাত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার গান করার। তাঁর সুরে ফতেহ লোহানীর আসিয়া ছবির “আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে” গানটি গেয়েছিলাম। তিনি নিজেই আমাকে গানটি শিখিয়েছিলেন। ঢাকায় তখন কোনো রেকর্ডিং স্টুডিও না থাকায় গানটির রেকর্ড হয় বিজি প্রেসে। যেটি আসলে একটি ছাপাখানা।’
‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘আসিয়া’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘যে নদী মরুপথে’, ‘কখনো আসেনি’, ‘সূর্যস্নান’, ‘সোনার কাজল’, ‘রাজা সন্ত্রাসী’; ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘সাত ভাই চম্পা’র মতো সিনেমায় প্লেব্যাক করেছেন তিনি।
স্বামী খান আতাউর রহমানের সঙ্গে প্রথম রেডিওতে তিনি গেয়েছেন ‘আমার থাকত যদি পাখির মতো ডানা’ গানটি। ১৯৬১ সালে জহির রায়হানের কখনো আসেনি ছবিতে খান আতাউর রহমানের সুরে দুটি গান করেন, ‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’ ও ‘তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম’। ১৯৬৮ সালে করাচির হিজ মাস্টার ভয়েস থেকে খান আতাউর রহমানের সুরে এই শিল্পীর কিছু গান রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ‘আমার যদি থাকত পাখির ডানা’, ‘আমার না বলা কথা’, ‘সোনালী এই ধানের ক্ষেতে’, ‘আগে জানি নারে দয়াল’, ‘তুমি দাও দেখা দরদী’, ‘আমার বন্ধু বিনোদিয়া’, ‘আজকে আমার মালঞ্চে ফুল ফোটে নাই’, ‘আমার মন ভালো নাগো প্রাণ ভালো নাগো’ গানগুলো উল্লেখযোগ্য।
কয়েক দশক ধরেই সংগীতের বাইরে ছিলেন মাহবুবা রহমান। অনেকটা নিভৃতে জীবন যাপন করছিলেন।
মাহবুবা রহমানের প্রকৃত নাম নিভা রানী রায়। বাবার নাম সুবরন্দ্র মোহন রায়। তার জন্ম চট্টগ্রামে, ১৯৩৫ সালে। শৈশবেই ঢাকায় চলে আসেন। এসেই সুধীরলাল চক্রবর্তী, ওস্তাদ পিসি গোমেজ এবং মোমতাজ আলী খানের কাছে কিছুদিন গান শেখেন। গীত, গজল শিখেছিলেন ওস্তাদ কাদের জামেরী ও ওস্তাদ ইউসুফ কোরেশীর কাছে। মমতাজ আলীর কাছে শিখেছিলেন লোকসঙ্গীত।
মাহবুবা রহমান ১৯৪৮ সালে ঢাকার কামরুননেসা গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর আর পড়াশোনা করেননি। এর আগের বছর অল ইন্ডিয়া রেডিও ঢাকা কেন্দ্র থেকে তার গান প্রথম প্রচার হয়।
তার প্রথম বিয়ে হয়েছিল ১৯৫০ সালে আবুল হাসনাতের সাথে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ১৯৫৮ সালে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খান আতাউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এই সংসারে তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে আছে। সংগীতশিল্পী রুমানা ইসলাম তার কন্যা। রাজধানীর বড় মগবাজারে মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে বাস করতেন তিনি।





