Select Page

অন্ধকার ঘরে কালো বিড়াল খুঁজেছে ‘চক্কর ৩০২’

অন্ধকার ঘরে কালো বিড়াল খুঁজেছে ‘চক্কর ৩০২’

চক্কর ৩০২
গল্প ও পরিচালনাঃ শরাফ আহমেদ জীবন
চিত্রানাট্যঃ সৈয়দ গাওসুল আলম শাওন, নাহিদ হাসনাত
সংলাপঃ নাহিদ হাসনাত
অভিনয়ঃ মোশাররফ করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, শাশ্বত দত্ত, সুমন আনোয়ার, তারিন জাহান, মৌসুমী নাগ, ইন্তেখাব দিনার, রওনক হাসান, সারাহ আলম, জান্নাতুন নূর মুন সহ অনেকে।
ডিওপিঃ কামরুল হাসান খসরু
সম্পাদনাঃ সংলাপ ভৌমিক
প্রযোজনাঃ সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত, কারখানা প্রডাকশন
পরিবেশনাঃ একশন কাট এন্টারটেইনমেন্ট
মুক্তিঃ ৩১শে মার্চ (ঈদুল ফিতর), ২০২৫

প্রথমেই এ সিনেমাসংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানাই, আমার মতো ক্ষুদ্র একজন মানুষকে ‘চক্কর ৩০২’ এর প্রিমিয়ার শো তে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। তাও আবার সম্পূর্ণ নতুন একটি মাল্টিপ্লেক্সে। এই ঈদেই যাত্রা শুরু করছে স্টার সিনেপ্লেক্সের সেন্টারপয়েন্ট ব্রাঞ্চটি। সব মিলিয়ে নতুন চলচ্চিত্র দেখার পাশাপাশি, নতুন হল দেখারও সৌভাগ্য হলো।

কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ

‘চক্কর ৩০২’ একটি মিস্ট্রি-থ্রিলার মুভি, যেখানে আমরা শুরুতেই সাদমান নামে একটি ছেলেকে খুন হতে দেখতে পাই। খুনটির ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পড়ে ইন্সপেক্টর মঈনুল (মোশাররফ করিম) এর কাঁধে। তার সহযোগী হলেন শাশ্বত দত্ত। প্রাথমিক প্রমাণাদির ভিক্তিতে, মঈনুল সাদমানের বন্ধু রাইয়ানকে গ্রেফতার করে। রাইয়ান হলো খুব জনপ্রিয় অভিনেতা হাসান চৌধুরী (রওনক হাসান) ও এডভোকেট নীলা চৌধুরীর (তারিন) ছেলে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন খুন হওয়া সাদমানের মা (মৌসুমী নাগ)। শুরুতে ইন্সপেক্টর মঈনুল কেসটিকে খুব সহজবোধ্য মনে করে, খুব সহজেই কেসটি সমাধান করার জন্য জোড়েসোরে অগ্রসর হয়। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, এই খুনের পিছনে আরো অনেক গভীর যোগসাজশ রয়েছে, রয়েছে একাধিক অজানা শত্রু। মঈনুল তখন ফেঁসে যায় এক গভীর চক্করে।

চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের বিখ্যাত ব্ল্যাক ক্যাট এনালজি, “The hardest thing of all is to find a black cat in a dark room, especially if there is no cat.”। যার অর্থ দাঁড়ায় অন্ধকার রুমে একটি অনুপস্থিত কালো বিড়াল খোঁজা সবথেকে কঠিন। এই এক লাইন হলো পুরো ‘চক্কর ৩০২’ এর গল্প। এর বাইরেও খুব সুন্দর সুন্দর সংলাপ পাওয়া গিয়েছে নাহিদ হাসনাতের কাছ থেকে। সিনেমার চিত্রনাট্য বৃহৎ আকারে বললে বেশ গোছানো, উত্তেজনার পারদ শেষ অংশ পর্যন্ত বজায় ছিল।

অভিনয়

এই সিনেমাকে বলা যায় মোশাররফ করিম’স ফিল্ম। ‘চক্কর ৩০২’ এ অনেক গুণী অভিনেতারা একসঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু এরপরেও এই চলচ্চিত্রে প্রধান আকর্ষণ হলেন মোশাররফ করিম। তিনি তার সহজাত অসাধারণ কমিক টাইমিং এর মাধ্যমে যেকোনো দুর্বল সিকোয়েন্সে জান ফুঁকে দিতে পারেন। তার পারফরম্যান্সকে এখানের কেউ টেক্কা দিতে পারেনি। কোনো অভিনেতা তাকে লাইমলাইটের আড়ালে রাখতে পারেনি।

তবে তাই বলে অন্যান্য অভিনেতারা খারাপ পারফরম্যান্স দিয়েছেন বা তেমন একটা জায়গা পাননি, বিষয়টি মোটেও এমন না। তারিন, মৌসুমী নাগ, ইন্তেখাব দিনার, সুমন আনোয়ার, সারাহ আলম…প্রত্যেকে একটি ঠিকঠাক পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন। এদের মধ্যে থেকেও শাশ্বত দত্ত আলাদাভাবে নিজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ টানতে সক্ষম হয়েছেন। তার সাথে মোশাররফ করিমের অংশগুলো বেশ ভালো জমেছিল।

তবে আমার কাছে রওনক হাসানের চরিত্রটি একটু মিসকাস্টিং মনে হয়েছে। এই চরিত্রে একটু নায়কীয় ঢং এর কাউকে প্রয়োজন ছিল। তবে আমি ট্রেলার থেকে ভাবছিলাম এই সিনেমায় থাকা ৩ তরুণ-তরুণী হয়তো এতোসব অভিনেতাদের ভীড়ে অতো ভালো অভিনয় করতে পারবে না। আমার চিন্তাভাবনাকে তারা ভুল প্রমাণ করে তারা তিনজনই বেশ ন্যাচারাল পারফর্ম করেছেন।

কারিগরি দিক

ভালো ছিল কামরুল হাসান খসরুর ক্যামেরার কাজ। প্রায় সব ফ্রেমে বেশ ছিমছাম ভিজ্যুয়ালাইজেশন পাওয়া গিয়েছে। অভিযোগ করার সুযোগ খুব একটা নেই। এছাড়া সাউন্ড এরেঞ্জমেন্টের কাজ বেশ ভালো ছিল। ভালো হয়েছে ডাবিং কোয়ালিটি ও মেকআপের কাজ। সম্পাদনা ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিয়ে আমার কিছু আপত্তি হয়েছে, এসব ব্যাতিকেরে বাকি টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্টগুলো নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ করার সুযোগ নেই।

তবে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের অতিরিক্ত ব্যবহার আমার জন্য একটু পীড়াদায়ক মনে হয়েছে। থ্রিলার সিনেমাতে কিছু হাই মোমেন্ট যাওয়ার পর একটু ব্রিথিং স্পেস (breathing space) দিতে হয়। অনেক কিছু আছে যা মিউজিক ছাড়াও বুঝানো যায়। এতে করে সিনেমায় গভীরতা তৈরি হয়, দর্শককে ইমোশনালী কানেক্ট করে ফেলা যায়। মিউজিক ব্যবহার করে হয়তো তিনি পুরো সিনেমার ট্রিটমেন্টটি হালকা রাখতে চেয়েছিলেন, তবে এতে করে আমরা কোনো নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রের সাথে নিজেকে কম জুড়তে পেরেছি।

পরিচালনা

‘চক্কর ৩০২’ হলো পরিচালক শরাফ আহমেদ জীবনের প্রথম চলচ্চিত্র। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নবীন হলেও দীর্ঘদিন তিনি ছোটপর্দায় পরিচালনা করেছেন। সেই বিচারে তার কিছু সিদ্ধান্ত আমার কাছে সঠিক আবার কিছু সিদ্ধান্ত আমার কাছে একটু দুর্বল মনে হয়েছে।

তিনি একটি ভালো গল্প বাছাই করেছেন, এ গল্প অবশ্যই চলচ্চিত্র বানানোর মতোই গল্প। মূল গল্প নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তিনি এমন এক পুলিশ অফিসারের গল্প দেখিয়েছেন যে ৮-১০টি সাধারণ ইন্সপেক্টরের মতো মাস্কুলার নন। এই পুলিশ অফিসার ডেডিকেশন ও মনের সাহস দিয়ে সবকিছু সামলান। কখনো তিনি সাফল্য পান, আবার কখনো তিনি ব্যর্থ হন।

কিন্তু কিছু সাবপ্লটকে একটু বেশিই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যার তেমন একটা প্রয়োজন ছিল না। তারিন-মৌসুমী নাগ-রওনক হাসান-ইন্তেখাব দিনারদের কিছু কিছু এ্যাকটিভিটি একাধিকবার রিপিট হয়েছে। সব অভিনেতাকে জায়গা দিতে গিয়ে গল্পের গতি সেসব জায়গায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়া তিনি সিনেমার একটি অংশে স্টোরিটেলিং এ স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে হালকা গন্ডোগোল পাকিয়েছেন। উদাহরণ হিসেব আমি ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে একই টাইমে মোশাররফ করিমের ইন্টারভিউ নেয়াকে মেনশন করতে পারি। তিনি হয়তো একাধিক সিকোয়েন্সকে একত্র করে দ্রুত মজাদার কিছু দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দূর্বল সংলাপ সিঙ্কোনাইজেশনের কারণে তিনি সেই সিনগুলো যথাযথভাবে সামঞ্জস্য করতে পারেননি। হয়তো তিনি কাগজে কলমে যেটা চেয়েছেন সেটা খুব মজার কিছু হতো, কিন্তু আমার মনে হলো তিনি যা ভেবেছেন তা এক্সিকিউট করতে পারেননি।

সবমিলিয়ে বলবো

‘চক্কর ৩০২’ আমাদের কাছে ভালো-খারাপ মিলিয়ে উপভোগ্য মনে হয়েছে। সরকারি অনুদানের সিনেমা বলতে আমাদের সামনে যে প্রতিবিম্ব ভেসে ওঠে, ‘চক্কর ৩০২’ সে ধরনের সিনেমা না। ভালো সিনেমা। নবীন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে শরাফ আহমেদ জীবন পাশমার্ক পেয়েছেন। আরেকটু উন্নতির সুযোগ আছে, আশাকরি সামনে আরো ভালো উপস্থাপনা তার কাছ থেকে আমরা পাবো!

রেটিং ৭.৫/১০


About The Author

চলচ্চিত্র বিষয়ক ব্লগার ও ইউটিউবার

Leave a reply