
অভিনেত্রীর ৬০ লাখ টাকা ফেরত না দেয়ায় আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়না
যার বিরুদ্ধে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রযোজক আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত তাকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেন।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, প্রযোজনা সংস্থা জাজ মাল্টিমিডিয়ার পরিচালক আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে প্রতারণার দায়ে মামলা করেছেন ‘পাপ’ ছবির অভিনেত্রী জাকিয়া কামাল মুন। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ‘পাপ’ সিনেমাটি নির্মাণে সহযোগিতার জন্য আজিজকে এককালীন ৬০ লাখ টাকা দেন মুন। ওই বছরের মার্চের মধ্যেই সিনেমার কাজটি শেষ করার কথা ছিল। অঙ্গীকারনামার শর্ত মোতাবেক আজিজ বিনিয়োগকৃত টাকা ফেরত দেননি। বারবার আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠানোর পরও তিনি উপেক্ষা করেছেন। উল্টো গত বছরের মে মাসে ‘পাপ’ ছবিটি একটি ওটিটির কাছে ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন।
এ বিষয়ে মামলার বাদী অভিনেত্রী জাকিয়া কামাল মুন বলেন, ‘আমার টাকা ফেরত দেননি, উল্টো বিভিন্ন প্রযোজককে তিনি বলে দিয়েছেন আমাকে যেন কোনো সিনেমায় না নেওয়া হয়।’
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আবদুল আজিজের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু সাঈদ শিমুল জানান, আসামির বিরুদ্ধে ৪০৬, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় মামলা করা হয়েছে।
এদিকে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন অনুসারে, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের অন্যতম ক্রিসেন্ট গ্রুপের আব্দুল আজিজ। তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে জনতা ব্যাংক, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলায় ব্যাংকের কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও আব্দুল আজিজ থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আদালতের পক্ষ থেকে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলে কার্যকর হয়নি সেটিও।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল আজিজ ও তার বড় ভাই এমএ কাদেরের মালিকানাধীন ক্রিসেন্ট গ্রুপের পাঁচটি কোম্পানির নামে জনতা ব্যাংকের ঋণ রয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা রয়েছে রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের নামে। এ কোম্পানির কর্ণধার হলেন আব্দুল আজিজ। আর গ্রুপটির অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্ট লিমিটেডের নামে ১ হাজার ২৯৬ কোটি, রূপালী কম্পোজিট লিমিটেডের নামে ১ হাজার ২৩৯ কোটি, লেক্সকো লিমিটেডের নামে ৫১৪ কোটি ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ লিমিটেডের নামে ২৩১ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এসব ঋণের প্রায় সবই ২০২০ সালের আগে খেলাপি হয়েছে। মন্দ মানের খেলাপি হওয়ায় এ ঋণের ওপর সুদ আরোপ বন্ধ রয়েছে। সে হিসেবে সুদসহ বর্তমানে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ ঋণের বিপরীতে জনতা ব্যাংকের কাছে জামানত রয়েছে মাত্র ৫৭৭ কোটি টাকার জমি ও স্থাপনা। ভুয়া রফতানির নথিসহ নানা প্রতারণার মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে এ অর্থ বের করে নেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে।
আব্দুল আজিজ ও আব্দুল কাদেরের মালিকানাধীন সবক’টি কোম্পানিই চামড়া শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ দুই সহোদর ব্যবসায় এসেছিলেন পৈত্রিক সূত্রে। রাজধানীর হাজারীবাগে তার পিতার ট্যানারি ব্যবসা ছিল। তবে পিতার অবর্তমানে তাদের এ ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে ২০১২ সালের পর। ২০১৩ সালে জনতা ব্যাংক থেকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের নামে বড় অংকের ঋণ মঞ্জুর হয়। এরপর ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ব্যাংকটি থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা বের করে নেয় গ্রুপটি। আবার ভুয়া রফতানি দেখিয়ে প্রণোদনা হিসেবে সরকারের কোষাগার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে গ্রুপটির বিরুদ্ধে।
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের নামে যখন হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বের হচ্ছিল, ঠিক একই সময় দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে বড় নাম হয়ে উঠছিল জাজ মাল্টিমিডিয়া। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হিসেবে আব্দুল আজিজ ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে।
আব্দুল আজিজসহ তার পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ে ২০১৯ সালের শুরুতে পাঁচটি মামলা করে জনতা ব্যাংক। এর মধ্যে চারটি মামলায় ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদেরকে প্রধান বিবাদী করা হয়। অন্য মামলার প্রধান বিবাদী করা হয় রিমেক্স ফুটওয়্যার ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আজিজকে। তার স্ত্রী লিটুল জাহান মীরাও মামলার আসামি হিসেবে রয়েছেন।
একই বছর আবদুল আজিজসহ তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৯১৯ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এর মধ্যে ৪৮১ কোটি টাকাই আব্দুল আজিজের রিমেক্স ফুটওয়্যারের মাধ্যমে পাচার হয়েছে বলে প্রমাণ তুলে ধরা হয়। আর ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরো পাঁচটি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় তার মা, ভাই, ভাবি, স্ত্রী, ভাতিজিকেও আসামি করা হয়। এসব মামলায় কেবল আব্দুল কাদের গ্রেফতার হয়ে এক বছর কারাভোগ করেন।