
ঈদে হেভিওয়েট ছয় সিনেমা, আগ্রহ-আকর্ষণ-বিরক্তি
ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমা নিয়ে ছোটবেলা থেকেই আমার আগ্রহ সীমাহীন। এবার যেমন অনেক আগে থেকেই ওৎ পেতে বসেছিলাম, শেষ পর্যন্ত কয়টা সিনেমা হলে আসবে, এলেও শেষ পর্যন্ত কয়টা হল পাবে। কয়টা হল পাবে না। আদৌ সব সিনেমা আসবে কিনা। নানামুখী জল্পনা কল্পনা চলছিল খোদ আমার মনের ভেতরই। গত বছর ১১টি সিনেমা মুক্তি পেয়ে ভরাডুবি হবার কারণে এবার ৬টি সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। তবে ৬টি সিনেমাই নানাদিক দিয়ে হেভি ওয়েট। তাই সব সিনেমাই আমার সপরিবারে হলে গিয়ে দেখতে হবে। দেখতেই হবে। এই প্রথম একই ঈদে সিনেমা হলে আসছেন শাকিব খান-আফরান নিশো-সিয়াম-মোশাররফ করিম-সজল! ৬টি সিনেমা নিয়েই আমার বেশ কিছু আগ্রহের জায়গা রয়েছে। আবার কিছু প্রশ্ন/ বিরক্তি বা অভিযোগও রয়েছে। এক এক করে সব বলি:

- প্রচারণার দিক দিয়ে কোনো সিনেমার প্রচারণাই ব্যক্তিগতভাবে আমার মন:পুত হয়নি। কিছু সিনেমা প্রচারণার পুরনো টেকনিকই কপি-পেস্ট করেছে। কিছু সিনেমা অনেক আগে থেকে প্রচারণা করতে গিয়ে সবকিছুই ‘বাসি’ করে ফেলেছে। আবার কোনো সিনেমা শেষ মুহূর্তে হাজির হয়ে নিরবেই মুক্তি পাচ্ছে।
- গানের দিকে দিয়ে প্রায় সব ক’টি সিনেমার গানই আমাকে মুগ্ধ করেছে। ‘জ্বিন থ্রি’র ‘কন্যা’ গানের অ্যাগ্রেসিভ প্রমোশন শুরুতে একটু আরোপিত মনে হলেও ধীরে ধীরে এই গানটি আমার মনেও জায়গা করে নিয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্যবার গানটি শুনছি। একই সিনেমার ‘ব্যবধান’ গানটিও আমার স্ত্রী মিতুর পছন্দ। ‘জংলি’ সিনেমার জনম জনম ও বন্ধুগো শোনো: দুটি গানই আমার পছন্দের তালিকায় রয়েছে। বিশেষ করে ‘বন্ধুগো শোনো’ এই ঈদে আমার সবচাইতে প্রিয় গানের একটি। ‘বরবাদ’ সিনেমার ‘দ্বিধা’ গানটি নিয়ে আমি এখনো দ্বিধার মধ্যে রয়েছি: এখনো মন ছুঁয়ে যেতে পারেনি। ‘চাঁদ মামা’ শুরুতে শুনে বিরক্ত হয়েছিলাম। গানের কথা হজম হচ্ছিলো না। ‘লাগে উরা ধুরা’র সাথে স্বাভাবিকভাবেই তুলনা চলে আসে। সেই তুলনায় ‘হেডফোনে গান শোনা নানী’ ভালো লাগছিল না। তবে আজ লাউড ভলিউমে কয়েকবার শোনার পর এই গানটিও আমার ঈদ ভাইভ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সিনেমা হলে এই গানটি যে মহা উত্তাপ ছড়াবে, কোনো সন্দেহ নেই। ‘দাগি’ সিনেমার ‘একটুখানি মন’ গানটিও এই ঈদে আমাদের অন্যতম ভালো লাগার মত গান। মিতুর সবচাইতে প্রিয়। ‘অন্তরাত্মা’র শিরোনাম গান মন ছুঁয়ে গেছে। বলিউডের জুবিনের কণ্ঠ, বরাবরই মুগ্ধ করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবারের ঈদে ওয়েবফিল্ম/ সিনেমার গানগুলো শুনবার সময় আমার কেন জানি মনের অজান্তেই পুরনো অনেক গানের সুর মাথায় বেজে চলেছে। বলছি না, হুবুহু কপি গান। তবে ওসব গানের অনুপ্রেরণায় যে তৈরি হয়েছে নতুন গানগুলো, সেটা বিলক্ষণ বোঝা যায়। ‘লাভইয়াত্রী’ সিনেমার ‘ঢোলিদা’ হোক বা ‘জুনুনিয়াত’ সিনেমার ‘ইশক দি লাত’ অথবা ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের ‘শো মি দ্য মিনিং’ কিংবা তাহসান-পূজার গাওয়া ‘একটাই তুমি’। শাহরুখ খানের ‘রাইস’ সিনেমার ‘জালিমা’ গানের মত চিত্রায়ণও দেখছি এবার। প্রিয় গানের অনুপ্রেরণায় নতুন কিছু তৈরি হতেই পারে, তবে নতুন গান শুনতে গিয়ে অতি পরিচিত গানের সুর মাথায় ভনভন করলে একটু তো অস্বস্তি হয়-ই।
- এবারের ঈদেও অনেক সিনেমার ট্রেলার মুক্তি নিয়ে গড়িমসি দেখেছি। যা হতাশাজনক। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের নির্মাতারা নানা অজুহাতে ট্রেলার আনেন না। তবে যারা এনেছেন, তাদের মধ্যে ‘দাগি’র ট্রেলার তুলনামূলক বেশি ভালো লেগেছে। ‘চক্কর ৩০২’-এর গল্পও যে আকর্ষণীয় হতে পারে, ট্রেলারে কিছুটা ইঙ্গিত পেয়েছি। ট্রেলার দেখার পরই ‘চক্কর ৩০২’ নিয়ে বেশি আগ্রহী হয়েছি।
- যদিও ‘অন্তরাত্মা’ এবং ‘চক্কর ৩০২’-এর প্রচারণার ধরণ যারপরণাই হতাশ করেছে। সিনেমা মুক্তির পর ‘ওয়ার্ড অফ মাউথ’-এর আশায় বসে থাকেন আমাদের নির্মাতারা। কেন? জানিনা। ঈদের ২ দিন আগে প্রিমিয়ার শো’র আয়োজন করেন। কেন? জানিনা। এভাবে অন্তত দর্শককে আকৃষ্ট করা যায় না। অতীত সে কথাই বলে। শাকিব খানের সিনেমার সঙ্গে টক্কর দেয়ার জন্য সেই ধরনের ঢাল-তলোয়াড় নিয়েই মাঠে নামতে হয়।
- এর আগে আমি ‘জ্বীন’ সিরিজের ২টি সিনেমাই দেখেছি। প্রথম কিস্তি দেখে ভয়ের পরিবর্তে সিনেমা হলে দর্শকদের হাসি তামশা হয়েছিল বেশি। তবে ‘জ্বীন ২’ অপ্রত্যাশিতভাবে ভালোই ছিল। আশা করা যায়, এবারও ‘জ্বীন ৩’ তাদের লয়্যাল অডিয়েন্সদের মুগ্ধ করতে পারবে। অন্তত সিনেমা মুক্তির আগে প্রমোশনালে সজলকে দারুণ লাগছে। নিয়মিত চিত্রনায়ক হবার সব গুণ থাকা সত্ত্বেও সজল কেন সিনেমায় নিয়মিত হলেন না বা হবার সুযোগ পেলেন না এতদিন, এটা বিস্ময়কর। নূসরাত ফারিয়াকে খুব সম্ভবত এই প্রথম কোনো সিনেমায় এত বেশি সুন্দরী লেগেছে। ফারিয়া সুন্দরী, জানা কথা। তবে ‘জ্বীন ৩’-এ নতুন করে যেন তার রূপের আগুন জ্বলছে। দেখা যাক সিনেমা হলে তিনি কতটা আগুন লাগাতে পারেন।
- ‘বরবাদ’-এর ক্যাপ্টেন শাকিব খান। আর তাকে চালিয়েছেন ছোট পর্দার নির্মাতা মেহেদী হাসান হৃদয়। নতুন নির্মাতাদের সঙ্গে অতীতে শাকিব খান অনেক ইতিহাস গড়েছেন। এবারও হয়তো সে পথেই যাচ্ছেন। যীশু সেনগুপ্ত প্রিয় অভিনেতা। আশা করি তিনি খল চরিত্রে নিজের মেধা দেখানোর সুযোগ পেয়েছেন। ইধিকা পাল ‘প্রিয়তমা’য় মুগ্ধ করেছিলেন। তার সহজ সাবলীল অভিনয় চুম্বকের মত আকর্ষণ ছড়ায়। এই সাবলীলতা ওপার বাংলার খুব কম নায়িকার মধ্যেই আছে। ‘বরবাদ’-এর আইটেম গানে নূসরাত জাহান আছেন, শুনবার পর বিরক্ত হয়েছিলাম। বার বার মনে হচ্ছিলো, নূসরাত কেন? আমাদের দেশে কি ওরকম আকর্ষণীয় কেউ নেই? ‘নাকাব’ সিনেমায় তো শাকিব খান-নূসরাতের কেমিস্ট্রি অত জমেনি। তবে ‘চাঁদ মামা’ দেখার পর মনে হয়েছে, নূসরাতই এই গানের জন্য ঠিক আছেন। আমার আর কোনো অভিযোগ নেই।
- ‘দাগি’ নির্মাতা শিহাব শাহীনের ২য় সিনেমা। আফরান নিশো অভিনীত ২য় সিনেমা। নিশো-তমা মির্জা জুটির ২য় সিনেমা। শুরু থেকেই ‘দাগি’ নিয়ে আমরা সবাই আগ্রহী, কারণ আফরান নিশো দুই বছর অপেক্ষার পর এই স্ক্রিপ্টটি যেহেতু নির্বাচন করেছেন, আমরা ভরসা করতেই পারি, এই স্ক্রিপ্টে দম আছে। ১০ বছর সিনেমা থেকে দূরে থাকার পর এই গল্পের ভেতরই নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে, যা শিহাব শাহীনকে কামব্যাক করতে বাধ্য করেছিল। নিশো-তমা জুটি ‘সুড়ঙ্গ’ তে দারুণ ছিল। এবার যদি ‘দাগি’ সফল হয়, এই জুটিকে নিয়ে অন্তত আরো ৫টা সিনেমা হবে, আমি নিশ্চিত। সুনেরাহ বিনতে কামাল আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন ‘ন ডরাই’ সিনেমায়। এবারো তার সাবলীল অভিনয় দেখার অপেক্ষায় আছি।
- ‘চক্কর ৩০২’-এর অনেকগুলো প্লাস। অভিনেতা হিসেবে শরাফ আহমেদ জীবন সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত নাম। তবে নির্মাতা হিসেবেই তার শুরু, তার খ্যাতি-সবকিছু। বেশ কিছু ভালো ফিকশন, টিভিসি নির্মাণ করেছেন তিনি। ১ম সিনেমা হিসেবে নিশ্চয়ই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। মোশাররফ করিমের মত দুর্দান্ত, শক্তিশালী একজনকে প্রধান চরিত্রে পাওয়াটা ‘চক্কর’ কে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সেই সাথে সিনেমা জুড়ে রয়েছে গুণী অভিনয়শিল্পীদের সমাহার (তারিন জাহান, রওনক হাসান, মৌসুমী নাগ, ইন্তেখাব দিনার, সুমন আনোয়ার প্রমুখ)। এই জাদরেল অভিনয়শিল্পীদের অভিনয় দেখার জন্য হলেও ‘চক্কর ৩০২’ দেখবো।
- ‘জংলি’ গত বছর ঈদে মুক্তির কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত যত্নের ছোঁয়া বাড়িয়ে এই ঈদ পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছে সিয়াম আহমেদ অভিনীত ‘জংলি’কে। এম রাহিম তরুণদের মধ্যে বেশ গুণী একজন নির্মাতা। সিয়ামের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ভালো। এবার বড় পর্দায় সিয়ামের সঙ্গে প্রথমবার বুবলী, দীঘিকে দেখবো। এটা একটা আগ্রহের বিষয়। যদিও সিয়াম-বুবলী জুটির রসায়ণ আমরা রায়হান রাফীর ‘টান’ ওয়েবফিল্মে দেখেছিলাম। মুগ্ধ হয়েছিলাম। বুবলী এ মুহূর্তে নির্ভরযোগ্য অভিনেত্রীদের মধ্যে একজন। আশা করি এই সিনেমাতেও সবাই নিজেদের ছাড়িয়ে গেছেন। মাল্টিস্টারার এই সিনেমায় রয়েছেন অনেক গুণী অভিনয়শিল্পী।
- এবারের ঈদে শক্তিমান অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিমকে তিন সিনেমায় দেখবো। মিশা সওদাগরের মত অভিনেতাকে ভিন্ন রূপে পাবো বরবাদ-এ। শাহেদ শরীফ খান ‘অন্তরাত্মা’র মাধ্যমে সিনেমায় ফিরে আসছেন।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদে যেহেতু ছুটি বেশি, সিনেমাতেও অন্তত ২টি সুপারহিট তো থাকা উচিত। গত বছর মাত্র ১টি সিনেমা ব্যবসাসফল হয়েছিল। সেই সিনেমা (তুফান) মুক্তির প্রায় ১০ মাস পূর্ণ হয়েছে। এবার তো ইন্ডাস্ট্রির নতুন কিছু হিট সিনেমা পেতেই পারে। পাওয়া উচিত।