
ক্লাসিক ‘শ্যামাকাব্য’
গল্পই নায়ক আর মেকিং স্টাইলে ক্ল্যাসিক্যাল অ্যাপ্রোচের ছবি ‘শ্যামাকাব্য‘। সাহিত্যের স্পর্শ ছবির পুরো সময় জুড়েই বিদ্যমান।

দুই ধরনের ছবি হয় সাধারণত। একটাতে থাকে নাচেগানে, ফাইটে ভরপুর কমার্শিয়াল অ্যাপ্রোচের ছবি সেখানে অভিনয়ও দারুণ থাকতে পারে তবে তা কমার্শিয়াল দিক থেকে। আরেকটাতে ভালো একটা গল্পের আধিক্য থাকে যেখানে দর্শক ঐ গল্পটাকেই ছবির নায়ক মনে করে, সেখানেও গান থাকে অভিনয় থাকে কিন্তু গল্পটাই থাকে ছবির পাটাতন। ‘শ্যামাকাব্য’ এ ধরনের ছবি।
আমাদের বাংলা সাহিত্যে দেখা যায় ‘কাব্য’ শব্দটাই সবচেয়ে এখানে প্রাচীন। চর্যাপদ গানের মাধ্যমে বলে যাওয়া কাব্যই। কারো জীবনকাহিনি মধ্যযুগে যে সাহিত্যিকরা বলে গেছেন সেখানেও আছে ‘কাব্য’ নামটির প্রাধান্য। কাহিনিকাব্যের মাধ্যমে তাদের জীবনের গল্প তখনকার কবিরা বলে গেছেন। ‘কাব্য’ কথাটা এখানে বিরাট কিছুর প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়। ‘শ্যামাকাব্য’ নামটিতেও তার জীবনের গল্পকে তুলে ধরেছে বড় পরিসরে। ছবির নামকরণেও সাহিত্যিক মানদণ্ড রয়েছে। নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদ তাঁর প্রথম ছবি ‘গহীন বালুচর’-এর পর দ্বিতীয় ছবিতে নিজস্বতার দিকে আরো একধাপ এগিয়ে থাকলেন।
গল্পটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের হলেও এতে সাহিত্য, গানের সংমিশ্রণ খুব ভালোভাবে রয়েছে। একজন নিজের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভিন্ন কিছু ঘটে যায় তার সাথে। সেখানেই শ্যামার সাথে তার দেখা, কথা এবং রহস্যের শুরু। দ্বিতীয়বার তার সাথে দেখা হবার পর রহস্যের ভেতর আরো ভালোভাবে ঢুকে যায় দর্শক। এরপর সে রহস্যের ডালপালা বিস্তারের জন্য রাজনৈতিক দিকেও গল্পটি টার্ন করে। প্রধান অভিনেতা ও অভিনেত্রী দুজনের জন্যই ভিন্ন গল্পের থেকে আরেকটা নতুন গল্পের সংযোজন। এই ত্রিমাত্রিক আবহটি নির্মাতার পারদর্শিতার প্রকাশ ঘটিয়েছে।
সাহিত্য ছবিটিকে ক্লাসিক অ্যাপ্রোচে নিয়ে গেছে কিছু ফ্যাক্টে। প্রধান অভিনেতার ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাস নেয়া এবং নায়িকার মুখে রবার্ট ফ্রস্টের সুবিখ্যাত কবিতা ‘stopping by woods on a snowy evening’-এর বিখ্যাত লাইনগুলোর আবৃত্তি জীবনের রহস্যকে তুলে ধরে –
‘the woods are lovely dark and deep
but i have promises to keep
and miles to go before i sleep’.
কবিতার সূত্র থেকেই যেন ছবিতে ‘ঘুম’ একটা ব্যতিক্রমী চরিত্র হয়ে উঠল ছবির যেখানে ছবিটি আর পাঁচটি ছবির থেকে নিঃসন্দেহে আলাদা করার মতো।
কোটেশনের দিক থেকে রবার্ট ব্রাউনিং-এর এ লাইনটিও ভূমিকা রেখেছে –
‘i was ever a fighter, so—one fight more, The best and the last.’
আর মায়া অ্যাঞ্জেলোর মতো বিখ্যাত স্মৃতিবিশারদের এ লাইনটি দেয়ালে সাঁটার মাধ্যমে যেন জীবনকেই দেয়ালের মতো বাধার প্রতীকে তুলে ধরেছে –
You will face many defeats in life, but never let yourself be defeated.

কাল্পনিক দৃশ্যগুলোতে ফ্রয়েডীয় অ্যাঙ্গেল ছিল বিশেষ করে বাবা-ছেলের সিকোয়েন্সে।
‘কথা কারা কম বলে, জানেন? যারা নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায়’ নীলাঞ্জনা নীলার এ সংলাপটি ছবির শক্তিশালী সংলাপের মধ্যে একটি। তার মধ্যে সৌন্দর্য আর অভিনয়ের দ্বৈত রূপ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সোহেল মণ্ডলের চশমাপরা ভারিক্কি ব্যক্তিত্বের অভিনয়ও তার বড় অভিনেতা হয়ে ওঠার ধাপকে তুলে ধরে। প্রধান দুই অভিনয়শিল্পীর বাছাইটা সুন্দর হয়েছে। ইন্তেখাব দিনারের চরিত্রটি তাদের দুজনের পর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। জেনি কম সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গল্পে মোড় আনা চরিত্র। সাজু খাদেম, একে আজাদ সেতুও গুরুত্ব রেখেছে তাদের চরিত্রে। নির্মাতা সব চরিত্রকেই নিজস্ব জায়গায় ছবির প্রয়োজনীয় অংশে পরিণত করেছেন এটা প্রশংসনীয়।
গান এ ছবিতে সাহিত্যের পরেই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর ‘পাখি যাও পাখি যাও’ শিরোনামের গানটি ছবিতে বিশেষত্ব যোগ করেছে।
কারিগরি দিকও ভালো ছিল। কাল্পনিক সিকোয়েন্সে বিজিএম সবচেয়ে ভালো ছিল।
সব মিলিয়ে ‘শ্যামাকাব্য’ গল্পে, গানে, লিটারারি অ্যাঙ্গেলে ক্লাসিক প্রেজেন্টেশনের ছবিতে পরিণত হয়েছে। উঁচুদরের কাজও বলা যায়।
রেটিং – ৮/১০