
খামতি সত্ত্বেও মনে গেঁথে রাখবার মতো ‘জংলি’
‘ঈদ সিনেমা মানে ধুমধারাক্কা মারামারি, নায়ক নায়িকার হিট গান আর কয়েকটা ভাল সিন – সেইসব ফর্মুলা এখন অতীত। দর্শক দেশ বিদেশের কনটেন্ট দেখে এখন অনেক কনসার্ন। তাদের ইমোশন নিয়ে খেলতে হলে দরকার ভাল গল্প ও রাইটিং, সাথে জানবাজি রাখা পারফরম্যান্স। নয়তো গরমে ঘেমে সিঙ্গেল স্ক্রিনে আর হাজার টাকা খরচায় মাল্টিপ্লেক্সে কেন যাবে দর্শক। ‘জংলি’ দর্শককে হলে এনে প্রতারণা করে নি, ইমোশন নিয়েই খেলেছে। ব্যক্তিগতভাবে এই টিমটার সাথে অনেকদিক থেকেই ‘জংলি’ নিয়ে আলাপ হতো। প্রযোজক, লেখক এবং অভিনেতা সিয়াম ভাইকেও আপন মানুষ লাগে। খুব তরুণ একটা টিম আমাদের আশার গল্প শোনালো জমিয়েই।

‘জংলি’ মানবিক গল্পের হৃদয়স্পর্শী সিনেমা, ঈদে পুরো পরিবারের সকল বয়সীদের নিয়ে দেখার ছবি। বাজেটের সীমাবদ্ধতা চোখে পড়লো, রাইটিংয়ে কিছু খামতি আছে, সিনেমার গতিও অনেক জায়গায় স্লথ। এগুলো একপাশে সরিয়ে রাখলে বলাই যায় – ‘জংলি ইস এ ভেরি গুড বাংলাদেশি মুভি, ট্রিট টু ওয়াচ!’ ‘জংলি’ আপনাকে অজান্তেই কাঁদানোর ক্ষমতা রাখে, নিজের ভেতর প্রশ্নের জন্ম দিয়ে যায়। ‘গুড এন্ড ব্যাড প্যারেন্টিং’ এই সময়ের খুব জরুরি দুইটা টার্ম। ‘কিছু সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত’ এই গল্পে দর্শকের মনে গেঁথে রাখবার অনেক উপাদান দিয়ে দেয় হল থেকে বের হবার সময়।
এক ঝড়-ঝঞ্ঝার রাতে একাকী মা বাচ্চার জন্ম দেয়। বাচ্চার বাবা এই বাচ্চার দায়িত্ব নিতে চায় না। বুকে কষ্ট চেপে রেখে মা বাচ্চাটিকে ফেলে দেয় ময়লায়। সেখানে দেখতে পেয়ে ডা. তিথি বাচ্চাটিকে উদ্ধার করেন ও বাচ্চাটির গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেন মা কে। মায়ের করা প্রশ্নে তিথি নিজের জীবনে দেখা এক মানুষ ‘জংলি’ ও তাকে বদলে দেয়া এক বাচ্চার কাহিনী বলতে শুরু করে।
‘জংলি’র গল্প মূলত ফ্ল্যাশব্যাক সেন্টার্ড। খুব পরিপাটিভাবে জনির (সিয়ামের) জার্নিটা রিভিল হতে থাকে । সমাজের নানা আপত্তিকর ইস্যু, প্যারেন্টিং ও কোর্ট ইস্যু চলে আসতে থাকে গল্পের স্রোতেই। জংলি জনির জার্নির সাথে সাথে গল্প এগোয় এক মর্মস্পর্শী ঘটনার দিকে। আজাদ খান প্রশংসা পাবেন এমন কাহিনী ভাবনার জন্য।
এইটা সিয়ামের লাইফটাইম বেস্ট পারফরম্যান্স অবশ্যই, একইসাথে শিশুশিল্পী নৈঋতা ও বুবলিও দারুন অভিনয় করেছে। সিয়াম খুব পারসোনালি নিয়ে নিয়েছে সিনেমাটা সেটা তার আড়াই বছরের লেগে থাকা দেখলেই বোঝা যায়৷ বাকি ক্যারেক্টারগুলো গল্পের প্রয়োজনে এসেছে গেছে, খুব মনে রাখবার মত না। ইভেন দীঘির জায়গাতেও অন্য কাউকে নিলে খুব হেরফের হত না। সিয়াম শুরুতে কম ভোকাল থাকলেও শেষদিকে ওভার ন্যারেশনে গেছে যেটা বোরিং ছিল।
‘জংলি’র শক্তিশালী দিক যেমন এর রাইটিং, এর দূর্বলতাও ওখানেই অনেকটা। মেহেদী হাসান মুন, সুকৃতি সাহা ফার্স্টটাইম এত ইমোশনাল একটা স্ক্রিনপ্লে লিখেছেন, অনভিজ্ঞতা টের পাওয়া যায় নি। এম রাহিম ‘শান’ বানানোর আগে অনেক এসিস্ট করেছেন, তাই মেকিং এর টেকনিক ও ইমপ্লিমেন্ট করার ভঙ্গি সহজাত ছিল। তবে এই সিনেমাটা যতটা না মাস অরিয়েন্টেড, তার চেয়েও অনেক বেশি হার্টটাচিং যেখানে রাইটিং-ডিরেক্টিং ডুয়ো অনেক প্রেডিক্টেবল ওয়েতে এগিয়েছে, গল্পে ঢুকতে সময় নিয়েছে, রেখে গেছে কিছু লজিক্যাল লুপহোল। কিছু জায়গায় দর্শককে কানেক্ট করতে ও একইরকম ইমোশনালি ট্রিট করতে আরোপিত কান্না জুড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আবার ইজি এক্সেস ছিল বলে সবাই গল্পের ফ্লোতে ছিলো।

প্রিন্স মাহমুদের মিউজিকে গানগুলো ভাল ছিল। তবে গান অতিরিক্ত লেগেছে, অন্তত দুইটা কমানো যেত৷ সবচেয়ে ভাল লেগেছে এর স্মার্ট এন্ডোর্সমেন্ট স্ট্র্যাটেজি৷ দৃশ্যে প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট ছিলো বেশ ভাল।
‘জংলি’ ফ্যামিলি অডিয়েন্সের ছবি৷ খুব ব্রুটালিটি নাই, একশন খুব লো স্কেলে দুইটা, গালাগালিও তীব্রভাবে মনে লাগে না। হয়তো কমিক রিলিফ কম ছিলো, বাজেট ঘাটতিও বোঝা গেছে। আমার ব্যক্তিগত মত, এন্টিরোল সেকশনে যে বা যাদের রাখা হয়েছে তা আরো স্ট্রং ও কনভিন্সিং করতে হতো। তবে ‘জংলি’ দীর্ঘসময় ‘ওয়ার্ড অফ মাউথ’ এ টিকে থাকবার মত সিনেমা, এইটা বলাই যায়।
রেটিং : ৭/১০