জীবনধর্মী সিনেমা চলছে না বলে নৃশংসতার সিনেমা করাই উচিত সিয়াম আহমেদের?
সিয়াম আহমেদের আপকামিং ঈদ রিলিজ ‘রাক্ষস’ নিয়ে অনেক আলাপ হচ্ছে। আলোচনা-সমালোচনা দুটোই হচ্ছে। আবার ট্রেলারের ভিউও কম না! অর্থাৎ একদিকে যেমন ‘ছি! আরেকটা এনিমেল নাকি?’ বলা দর্শক যেমন আছে, তেমনি এই সিনেমা দেখার মত ‘আগ্রহী’ দর্শকও কম নেই।

রাক্ষসের ট্রেলার টেকনিক্যালি ওয়েলমেড- এ ব্যাপারে কোন ‘যদি,কিন্তু’ নেই। বিগস্কেল, সাউন্ড, কালার- সব দিকেই প্রিমিয়াম ভাইভ। কিন্তু ভায়োলেন্সের নামে মাত্রাহীন কো*পাকুপি, রক্ত, অতিরিক্ত এগ্রেসিভ আচরণ, প্রেগন্যান্সির সময়ে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সংলাপ- এগুলো আসলেই কানে ও চোখে লাগে আর এগুলো নিয়ে অবশ্যই আলোচনা বা সমালোচনা প্রয়োজন। নির্মাতার স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, তবে স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা বিপদ ডেকে আনে। আবার দিনশেষে, সমাজের প্রতি, শিল্পের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধও থাকা উচিত।
এনিমেল বা কেজিএফের পর সে ধরনের সিনেমার টেমপ্লেটে সিনেমা বানানো শুধুমাত্র অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে না, বরং খোদ বলিউড বা সাউথেই হয়েছে। বেশিরভাগই বক্স অফিসে চূড়ান্তভাবে ধরাশায়ী হয়েছে। এনিমেলের পর বলিউডেই ‘বাঘী ৪’ হয়েছে যা দিনশেষে রক্ত ছড়ানো ছাড়া কিছুই করতে পারেনি।
করোনার পর দুটো জনরায় বেশিরভাগ সিনেমা বক্স অফিসে সফল- হরর আর নৃশংসতা বা ভায়োলেন্স। অর্থাৎ মানুষের আদিম প্রবৃত্তি আবারও ফিরে আসছে, সেগুলোই বেশিরভাগ মানুষকে আকৃষ্ট করছে। ড্রামা বা কমেডি বা সোশ্যাল ম্যাসেজওয়ালা সিনেমার যে বাজার ছিল, তা করোনার পর নেই বললেই চলে।

সিয়াম আহমেদের ফিল্মোগ্রাফিতে এত নৃশংসতার ছবি এর আগে আর একটিও নেই। কলকাতার ইউটিউবার অরিত্র রাক্ষসের ট্রেলার দেখে প্রশ্ন তুলেছেন, সিয়াম আহমেদ রিকশাওয়ালাদের হিরো হতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন কীনা?
কিন্তু আমরা ভুলে যাই, এই সিয়ামই যখন ভালো চিন্তার খোরাক জোগায় এরকম সিনেমা অর্থাৎ ‘পাপপূণ্য’, ‘মৃধা বনাম মৃধা’র মত সিনেমা করেছে, তখন হারিকেন দিয়েও দর্শক খুঁজে পাওয়া যায় নাই সিনেমাহলে। এক সপ্তাহের মাথায় মৃধা বনাম মৃধা হল থেকে নেমে গিয়েছিল।

পাপ পূণ্য চলচ্চিত্রে সিয়াম আহমেদ ও শাহনাজ সুমি
সিয়াম কি খুবই ফাটাফাটি অভিনেতা? আমার মনে হয় না। সিয়াম কি উপরে উল্লেখিত দুই সিনেমায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়েছে? তাও সম্ভবত না। কিন্তু তার চেষ্টা চোখে পড়ে; ভালো পরিচালক, ভালো গল্পে তার একাত্ন হওয়ার ক্ষুধাটা টের পাওয়া যায়। যে মার্কেটে জায়েদ খান আর বাপ্পী চৌধুরীর মত মানুষকে হিরো বা অভিনেতার ‘তকমা’ দেয়া হয়; সেখানে সেই সময়ে একজন নতুন ছেলে এসেই গিয়াসউদ্দীন সেলিম বা তৌকির আহমেদ বা রনি ভৌমিকের সাথে সিনেমা করছে- ইহা মোটেও হেলাফেলার ব্যাপার নয় এই মার্কেটে।
জীবনধর্মী সিনেমা চলছে না বলে নৃশংসতার সিনেমা করাই উচিত সিয়ামের- এমনটা সাপোর্ট করছি? মোটেও না। ট্রেলার দেখেই আমার মনে হয়েছে, এতটা রক্তারক্তি যতটা না গল্পের প্রয়োজনে তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন আরেকটা ‘বরবাদ’ টাইপ কিছু বানিয়েছি- এমনটা শো অফ করানোতে। ট্রেলার লাস্টের ডায়লগটা আমার খুবই চিপ লেগেছে। যার লাস্ট সিনেমা জংলীর মত ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি বা একটি বাচ্চাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গল্প, তারই পরের সিনেমায় এত ভায়োলেন্স আর এই প্রেগন্যান্সির ডায়লগ সেই ফ্যামিলি অডিয়েন্সকে সিয়াম থেকে দূরে ঠেলে দেয় কীনা- এটা আমার আরেকটা কনসার্ন।

মৃধা বনাম মৃধা চলচ্চিত্রে তারিক আনাম খান ও সিয়াম আহমেদ
না, আমি বলছি না সিয়ামকে সারাজীবন ফ্যামিলি অডিয়েন্সকে সার্ভ করে যেতে হবে, এক্সপেরিমেন্ট করতে পারবে না, নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বের হতে পারবে না, ভায়োলেন্স করতে পারবে না। জাস্ট আমরা যেন আমাদের একটি নির্দিষ্ট সীমারেখাটা ভুলে না যাই। আমাদের মাথায় যেন থাকে, আমাদের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা এখনও বেশিরভাগ অডিয়েন্স ফ্যামিলি মেম্বারসহ দেখতে আসে। এটা অন্য ইন্ডাস্ট্রি না যে এখানে সার্টিফিকেট থাকবে আর ১৮ বছরের নিচে কাউকে এই সিনেমা দেখতে হলে ঢুকতে দেয়া হবে না নির্দিষ্ট সিনেমার ক্ষেত্রে।
সব ধরনের সিনেমাই আমাদের লাগবে, সব ধরনের চরিত্রই আমরা দেখতে চাই আমাদের সিনেমার উন্নতির স্বার্থেই। জাস্ট আমাদের জানতে হবে, কোথায় আমাদের থামতে হবে।
এত এত বছর পর আমাদের অডিয়েন্স যখন সিনেমাহলে ফিরেছে, আমাদের ছোট্ট কোন ভুল যেন তাদেরকে আবারও হলবিমুখ না করে।






