‘নয়নের আলো’ মুক্তির পর পৃথিবীর যাবতীয় পুরস্কার পাওয়া হয়ে গেছে জাফর ইকবালের
প্রায় একশ ছবিতে অভিনয় করেছেন জাফর ইকবাল। কিন্তু একটি ছবির জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাননি। তার মৃত্যু হয় ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি। পরের বছর জাফর ইকবালকে মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হয়। খাতা-কলমে এই পুরস্কারটি তিনি পান ১৯৯১ সালে। যদিও তখন তিনি জীবিত!

জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন না বলে জাফর ইকবাল বেঁচে থাকতে যে খুব হৈচৈ হয়েছে—এমন নয়। রহমান, উজ্জ্বল, ওয়াসীম, সোহেল রানা, জসীমের মতো তারকা অভিনেতারাও তখন পর্যন্ত কেউ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাননি। কিন্তু তারা প্রত্যেকে জননন্দিত সুপারস্টার ছিলেন।
তখন জাতীয় পুরস্কার পাওয়াটা আজকের মতো সহজ ও সুলভ ছিল না। এখন তো দু তিনটা ছবি করেও পুরস্কার পেয়ে যাচ্ছেন অনেকে। প্রথম ছবিতেও কেউ-কেউ পুরস্কার বাগিয়ে নিচ্ছেন। ছবির অভাবে প্রতিযোগিতাও জমছে না। স্বজনপ্রীতি, দলবাজি আর লবিংয়ের চোটপাটে অন্ধকার দশা।
সেই সময় জাফর ইকবালের পুরস্কার না পাওয়াটাকে বড় করে দেখা হয়নি। কথায় বলে পেটে খেলে পিঠে সয়। তখনকার তারকারা দর্শকের ভালোবাসায় ধন্য ছিলেন। ছবি পছন্দ হলে দর্শকরা দলে-দলে সিনেমা হলে আসতেন। একই ছবি বারবার বারবার বারবার দেখতেন। দর্শকের ভয়ে চিত্রতারকারা কোথাও যেতেই ভয় পেতেন! তাই পুরস্কার না পেলেও কোনো আফসোস ছিল না তারকাদের। পুরস্কারের অভাব ঘুচে যেত বাণিজ্যলক্ষ্মীর তুমুল আশীর্বাদে।
জাফর ইকবালের পুরস্কারের কথা যদি বলতে যাই…তার আসলে পৃথিবীর যাবতীয় পুরস্কার পাওয়া হয়ে গেছে ‘নয়নের আলো’ মুক্তি পাওয়ার পর। এমন একটা ছবি যেকোনো শিল্পী তার ক্যারিয়ারেগ্রাফে রাখতে চাইবেন। এমন একটা ছবি করার পর আর কোনো কাজ না করলেও একজন শিল্পী শত ছবি পূর্ণ করার গৌরব অনুভব করতে পারবেন।

‘নয়নের আলো’র জাতীয় পুরস্কারে তেমন অর্জন নেই। গানের জন্য কোনো পুরস্কার পায়নি ‘নয়নের আলো’—ভাবা যায়? সর্বকালের অন্যতম সেরা গানের ছবির কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই, এটাই সত্যি।
মুদ্রার বিপরীত পিঠের সত্যি হচ্ছে—’নয়নের আলো’র মতো ছবি, জাফর ইকবালের মতো শিল্পীর উচ্চতা পুরস্কারের অনেক ওপরে…।
এই যে এত-এত পুরস্কার বিদেশ থেকে আমদানি হচ্ছে, এরমধ্যে কয়টা ছবি ইতিহাসে টিকবে? ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে বাংলা ছবির জয়জয়কার এখন। আগামী দিনে কয়টা ছবি শেষ পর্যন্ত ক্ল্যাসিক বিবেচিত হবে? সাম্প্রতিককালে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া কিছু ছবি একদিন কেউ ছুঁয়েও দেখবে না।
কিন্তু ‘নয়নের আলো’র মতো ছবিগুলো ঠিকই মাস্টারপিস হয়ে রয়ে যাবে। এই ছবি রিমেক হবে। এই ছবির গান কোটি কোটিবার শোনা হবে। কাভার হবে। রিমিক্স হবে। এই ছবির উদযাপন চলতেই থাকবে।
সময় হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিচারক। সময়ের স্বীকৃতির ওপরে কোনো স্বীকৃতি নেই। জামানার কাছ থেকে, জনগণের কাছ থেকে জাফর ইকবাল পুরস্কার পেয়ে গেছেন রাষ্ট্রের লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতার বহু আগেই…।






