প্রিন্স : কী হয়নি, আর কী হতে পারত
ঈদ উৎসবের ছবির মধ্যে নির্মাণের দিক থেকে ‘প্রিন্স’-এর সমালোচনা সবচেয়ে বেশি হয়েছে। টিজার রিলিজের পর থেকে ছবির কারিগরি দিকের দুর্বলতা চোখে পড়েছিল দর্শকের। এরপর ছবির গুণগত মান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশিত হতে থাকে দর্শক প্রতিক্রিয়ায়। ছবিটি মূলত দারুণ অ্যাকশন ছবির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেটা হয়ে ওঠেনি কিংবা কি করলে সে সম্ভাবনাটা থাকত এ নিয়েই কথা।

প্রথমত পরিচালক আবু হায়াত মাহমুদের এটাই প্রথম কমার্শিয়াল ছবি। তাঁর জন্য তাই এটা চ্যালেঞ্জই বলা যায়। প্রথম ছবি তার উপর ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ নায়ক শাকিব খান এ দুটি চ্যালেঞ্জ একসাথে সামলাতে গিয়ে সম্ভবত তিনি পেরে ওঠেননি।
শাকিব খানের গ্যাংস্টার স্টোরির ছবি অনেক আছে। ৩৫ মিলিমিটারের শুধু ‘খুনি শিকদার’ ছবির কথাই যদি ধরি তাহলে আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকার পরেও ‘প্রিন্স’ ঐ ছবির থেকে আগাগোড়া পিছিয়ে আছে। তুলনাটা কেন আসল? আসল কারণ দুটোই গ্যাংস্টার স্টোরির ছবি। ঐ ছবির মেকানিজমে অভিনয়, এক্সাইটমেন্ট, পারফেক্ট টার্ন, পারফেক্ট ক্লাইমেক্স এগুলোর যে দুর্দান্ত কম্বিনেশনটা ছিল সেটা ‘প্রিন্স’-এ অনুপস্থিত। যার জন্য ছবিটি শাকিব খানের ক্যারিয়ারের বর্তমান ওজন অনুযায়ী হয়নি।
‘প্রিন্স’-এ দেখা যাচ্ছে শাকিব খান জিরো থেকে হিরো হয়ে যাচ্ছে একজন মাস্টারমাইন্ডের কল্যাণে। সেখান থেকে তার রাইজিং পজিশন যখন হচ্ছে প্রতিপক্ষের সাথে বড় একটা শত্রুতা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ছবির শেষ পর্যন্ত সেই শত্রুতার তেমন কোনো ফিনিশিং দিতে পারছে না পরিচালক। ফার্স্ট হাফে স্টোরি বিল্ডআপের ক্ষেত্রেও সেকেলে স্টাইল লক্ষ করা গেছে যা শাকিব খানের অনেক ছবির সাথে সিমিলার হয়ে যায়।
দুই নায়িকার মধ্যে তাসনিয়া ফারিণকে দেখতে যতটা গ্ল্যামারাস লেগেছে জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডুকে একদমই লাগেনি বরং তার লুক ও ফিগারও নায়িকাসুলভ মনে হচ্ছিল না। অভিনয়ে চটপটে ব্যাপারটা থাকলেও শাকিব খানের অভিনয়ের বিপরীতে একদম দুর্বল লেগেছে। বরং শাকিবের সাথে ফারিণই অভিনয়ের জায়গায় বেশি ভালো ছিল। ছবির প্রধান নায়িকা নির্বাচনের দুর্বলতাও বড় সমস্যা মনে হয়েছে এ ছবির।
কারিগরি দিকের দুর্বলতা তো ছবির টিজার রিলিজের পর থেকেই সমালোচনায় ছিল। ভিএফএক্সের সমস্যা তো ছিলই এর বাইরেও সমস্যা চোখে পড়েছে। বিজিএম একইরকম ছিল বিভিন্ন অ্যাকশন সিনে। শাকিব খানের এন্ট্রি সিনে যে বিজিএম ছিল ওটাই রিপিটেড হিসেবে অনেক সিনে ছিল। ধরে নিলাম থাকতেই পারে কিন্তু বারবার শুনতে ভালোও লাগে না যদি শাকিব খানের সাম্প্রতিক অন্যান্য অ্যাকশন ছবি যেমন ‘তুফান, বরবাদ, তাণ্ডব’-এর কথা বলি তাহলে বিজিএমের বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার ছিল অ্যাকশন সিনে। ইমোশনাল সিনগুলোতে মাঝে মাঝে বিজিএম হারিয়ে যাচ্ছিল এবং নাটকে যেসব টিপিক্যাল বিজিএম ব্যবহৃত হয় তেমন বিজিএম দেখা গেছে যেটি হতাশাজনক এবং শাকিব খানের স্টারডম অনুযায়ী মানানসই না।

যদি স্টোরি বিল্ডআপে আরো কিছু মসলাদার ইলিমেন্ট যোগ করা যেত, যদি সেকেন্ড হাফ শেষের আগে আরো রহস্যজনক কিছু যোগ করা যেত, যদি বিজিএমের সঠিক ব্যবহার করা হত, যদি কলকাতাকেন্দ্রিক ল্যাংগুয়েজ টোন কম রেখে আমাদের লোকাল ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হত, যদি লোকেশন বা সেট ডিজাইন আরো ভালো হত তাহ যদি ক্লাইমেক্সে মেমোরেবল কোনো কিছু রাখা হত তাহলে ‘প্রিন্স’ হতে পারত ধামাকাদার কোনো অ্যাকশন ছবি। গ্যাংস্টার স্টোরিতে শাকিব খানের আরো একটি ছবি যোগ হত কিন্তু সেটি ‘তুফান, খুনি শিকদার’-এর মতো স্ট্যান্ডার্ড কাজ হয়ে থাকত।
অভিনয়ের জায়গা বললে শাকিব খান তার জায়গায় শতভাগ ডেলিভারি দিয়ে গেছে। তার পাশাপাশি শীর্ষ দুই ভিলেনের অভিনয় দারুণ ছিল। নায়িকার মধ্যে ফারিণ মূল না হয়েও জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডুর চেয়ে বেটার অভিনয় করেছে যদিও আইটেম সং-এ ফারিণ ততটা ভালো করেনি। শরীফ সিরাজ ন্যারেটর হিসেবে দারুণ, রাশেদ মামুন অপুও ভালো ছিল।
তো সব মিলিয়ে ‘প্রিন্স’ শাকিব খানের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দুর্বল নির্মাণের ছবি হয়ে থাকবে। পূর্বের কথাটি আবার বলা যায়, পরিচালক তাঁর প্রথম ছবি শাকিব খানের সাথে করার যে চ্যালেঞ্জ সেটি নিতে পারেননি তাই এটি ঘটেছে। শাকিব খানের নিজস্ব সচেতনতা এ ধরনের অ্যাকশন ছবির ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে আরো কাম্য থাকবে।






