
ভায়োলেন্সকে একপাশে রেখে ইমোশনাল গল্প ‘জংলি’
জংলি; পরিচালক: এম রাহিম; শ্রেষ্ঠাংশে: সিয়াম আহমেদ, শবনম বুবলি, দিঘি, ইরফান মৃধা, শহীদুজ্জামান সেলিম, সোহেল খান
এবারকার ঈদের সিনেমায় বৈচিত্র্য খানিকটা কম। প্রায় প্রতিটা প্রত্যাশিত সিনেমার ট্রেলারে নায়ককে দেখা গিয়েছে রাফ অ্যান্ড টাফ ভূমিকায়। এদের মধ্যে জংলিকে বেছে নেয়ার কারণ এর প্রমোশনাল কনটেন্ট এবং প্রায় নিখুঁত ট্রেলার।

“A passionate love story but with a betrayal জংলির এগিয়েছে তার প্রিটিজের প্রতিশ্রুতি মেনে। তৃতীয় দৃশ্যে এসে আমরা পরিচিত হই তিথির (বুবলী) সাথে। তার বয়ানে আমরা শুনি জংলির গল্প। চতুর্থ দৃশ্যে (খুব সম্ভবত) সিনেমার মূল চরিত্র জনিকে (সিয়াম) পরিচিত করানো হয়। পরবর্তী দৃশ্যগুলোতে তিনটে গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন দিয়ে চরিত্রটাকে ডেভলপ করা হয়। এরপর বিট্রেয়াল; যা গল্পের Inciting event; জনিকে বানিয়ে দেয় জংলি। ঘটনাক্রমে জংলির সাথে পরিচয় হয় পাখির। দুই চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় গল্প ঢোকে Rising action ধাপে। তাদের সম্পর্কের ক্লাইম্যাক্স ধরে জংলির গল্প তার পরিণতি খুঁজে নেয়।
জংলির কিছু টেকনিক্যাল সমস্যার কথা বলা যাক। চরিত্রগুলোর ডেভেলপমেন্ট খুব ফ্লাট। প্রথম অংকে (প্লটকে তিন অংকে ভাগ করে) দুটো প্রধান চরিত্র দাঁড় করাতে সময় নেয়া হয়েছে স্রেফ ১০/১২ মিনিট। একটা মোটরসাইকেল আর নায়কের চশমা পড়া চোখের এক্সট্রিম ক্লোজআপ হয়তো নাটকীয় কিন্তু নায়ককে নিয়ে দর্শককে নিয়ে এক্সট্রা কোনো তথ্য দেয় না। সিনেমার প্রধান খলনায়ককে পরিচয় করানো হয়েছে একদম ক্লাইম্যাক্সের আগে। তাই ক্লাইম্যাক্স যতটা ইমোশনালি ব্লাস্ট করার কথা ছিল ততটা হয়নি, ঝুলে গিয়েছে। সুজন (রাশেদ অপু) নামে আরো একজন সাইড খলনায়কের চরিত্র ছিল। ইনাকে রাইজিং অ্যাকশনের সময় পর্দায় আসতে দেখলেও চরিত্রটি সবসময় আন্ডারডেভেলপই ছিল। তাই তার ইমোশনাল টানপোড়েনের দর্শকের একাত্ব হওয়া মুশকিল। চরিত্র ডেভেলপমেন্টের এ সমস্যা জংলির কম-বেশি সব চরিত্রেই ছিল। চরিত্র আর তার পরিবেশকে সংযুক্ত করার প্রয়াস ছিল না।
ছবির কালার কারেকশন বিশেষত নুপুর ও জনির ক্যামেস্ট্রির অংশে এতো বুস্টেড ছিল যা চোখের জন্য অস্বস্তিকর। হাই কী লাইটিংয়ের অতিব্যবহার লক্ষণীয়। কখনো-সখনো দিনের আলোতেও কৃত্রিম আলোর ব্যবহার চোখ এড়ায়নি। পাখি চরিত্রটিকে বেশ ক’দিন একই জামাকাপড়ে দেখানো হয়েছে। কিন্তু কোনো এক অত্যাশ্চর্য কারণে জামা নোংরা হয়নি। মান্ধাতার আমলের চলচ্চিত্রের মতো ফাইটিংয়ের বিদঘুটে সাউন্ড আর দুই এক বান্দার শূন্যে ডিগবাজি এই সময়ে এসে অপরাধ। ভিএফএক্স জ…ঘ…ন্য। কাক (অথবা চিল) দিয়ে পাখি চরিত্রকে পর্দায় পরিচিত করানোর ব্যাপারটা হাস্যকর।
অভিনয়ে সবচাইতে এগিয়ে পাখি চরিত্রে অভিনয় করা ছোট মেয়েটি। পরিচালক দর্শকদের ইমোশন নিয়ে খেলতে চেয়েছেন এবং পাখিকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছেন। সিয়ামকে নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ওনার অভিনয় অনুযায়ী চেহারার এক্সপ্রেশন পাল্টায় না। জংলির গল্প শেষ এক্টে ঢোকা পর্যন্ত এই অভিযোগ মোটামুটি ঠিক ছিল। চেহারার ট্রান্সফরমেশনের জন্য দেখতে ভিন্ন রকম লাগছিল এই যা। কিন্তু ক্লাইম্যাক্স থেকে সিয়ামের যা ডেলিভারি তা অনবদ্য। এমন সিয়ামকেই বারবার পর্দায় চাই। কাঠগড়ায় সিয়ামের এক্সপ্রেশন দারুন। আমি প্রহেলিকা আর দেয়ালের দেশ দেখার পর থেকেই বুবলির ফ্যান। তাই, তাকে নিয়ে আমার এক্সপেকটেশন হাই। তিথি চরিত্রে বুবলি সর্বোচ্চ চলনসই, ফাটিয়ে দিয়েছেন এমনটা বলতে পারছি না। বাকিদের পর্দার উপস্থিতি নগন্য। তবে, পাখির বাবা-মা চরিত্রের দুজন এই অল্প উপস্থিতিতেও বাজে পারফরম্যান্স দিয়েছেন।
এবার জংলি কোথায় সফল তা বলি। জনি থেকে জংলি হওয়ার জার্নিতে বেশ কিছু এক্সট্রিম লং শট ব্যবহার করা হয়েছে, যা দেখতেও সুন্দর আবার নায়কের মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ফোটাতেও কার্যকর। ওভার দ্য শোল্ডার শট আর স্ট্যান্ডার্ড ক্লোজ আপ শটের উপযুক্ত ব্যবহার করা হয়েছে সিনেমার গল্পের টোন অনুযায়ী। সম্পাদনার কাজ হয়েছে মনোমুগ্ধকর। অসংখ্য ডিজলভ, কিছু পাসিং ট্রানজিশন, ফেড ইন, ফেড আউট, একদম শুরু সিনে এক্সট্রিম লার্জ শট এবং শেষ দৃশ্যে আপ এঙ্গেল শটে সিনেমা শেষ করা। সবটাই সম্পাদকের মুনশিয়ানা। অনেক দিন পর কোনো বাংলা সিনেমার ইন্টারভ্যালে মনমতো হলো। পরিচালক চরিত্র ডেভেলপমেন্টের সময়টা ট্রেড অফ করেছেন চরিত্রগুলোর আন্তঃসম্পর্ক তৈরিতে। এই সম্পর্কটায় দর্শককে সিনেমার গল্পের সাথে জুড়ে রেখেছিল। ক্লাইম্যাক্সের পর ফলিং একশনে এই আবেগ দর্শককে এতোটাই আকৃষ্ট করবে যে দর্শক হল থেকে বেরুনোর সময় আর শুরুর অতৃপ্তি মনে রাখবেন না।
সবাই যখন ভায়োলেন্সের ফর্মুলা মেনে ছবি হিটের পথে হাঁটছেন, এম রহিম তখন তার দ্বিতীয় সিনেমায় ভায়োলেন্সকে সাইড ক্যারেক্টর রেখে একটা ইমোশনাল গল্প বলতে চেয়েছেন। দিনশেষে সিনেমার টেকনিক্যাল ব্যাপার-স্যাপারের চেয়ে এর গল্পকেই বেশি মনে রাখে। জংলি দর্শককে এক মনে ধরার মতোই উপহার দেবে।