ভালোবাসলে রাক্ষসও হতে হয়!
শুরুর আগে একটা ছবির দৃশ্যের কথা বলতে চাই। মালেক আফসারী পরিচালিত ‘মৃত্যুর মুখে’ ছবির দৃশ্য। ইলিয়াস কাঞ্চন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন খলিলকে গ্রেফতার করতে এসে খলিলের জালে আটকা পড়েছে। এরপর কাঞ্চনকে ছুরি মারতে যায় খলিল। ছুরি মারার দৃশ্যটাতে মালেক আফসারী যে বিজিএম ব্যবহার করেছেন এবং লাউড অ্যাকটিং-এর প্রাধান্য যোগ করেছেন সেটা ছিল অসাধারণ। তাঁর ম্যাক্সিমাম কমার্শিয়াল অ্যাকশন ছবিতেই এ স্টাইল ব্যবহার হয়েছে। এ স্টাইলের সাথে ডিজিটালে মেহেদি হাসান হৃদয়ের স্টাইলের বেশ মিল পাচ্ছি। হৃদয়ও লাউড অ্যাকটিং-এর প্রাধান্য ও কড়া বিজিএম ব্যবহার করছেন। তাঁর প্রথম ছবি ‘বরবাদ’-এ এটি যেমন ছিল দ্বিতীয় ছবি ‘রাক্ষস’-এ তার থেকে বেশি দেখা গেল। এর থেকে বোঝা যায় মেহেদি হাসান হৃদয় কমার্শিয়াল অ্যাকশন ছবিকে ধামাকাদার হিসেবে প্রেজেন্ট করতে বেশি আগ্রহী।

‘রাক্ষস’-এর টিজার রিলিজের পর থেকে যে হিন্দির কপি জাতীয় কথাগুলো উঠেছিল সেটা শুধু এ ছবিকে ঘিরেই উঠেছে তা নয় বরং ‘বরবাদ’-এর টিজার/ট্রেলার রিলিজের সময়ও হয়েছিল। ইন্সপায়ার্ড জিনিসটা থাকলেও তার সাথে নিজস্ব মশলা যোগ করেই ‘রাক্ষস’ নির্মিত হয়েছে। পরিচালক হৃদয় নিজেই তার সিনেমাটিক ইউনিভার্সের দায় স্বীকার করে জানিয়ে দিয়েছেন তিন পর্বের ভায়োলেন্স সিরিজ হতে যাচ্ছে এটি। ছবির শেষের ক্রেডিট সিনের মাধ্যমেও সে বার্তা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ পরিচালক তাঁর জায়গা থেকে ক্লিয়ার থেকেছেন।
অনেকের মতে ‘রাক্ষস’ ভায়োলেন্সের ছবি ছাড়া কিছু না। আসলেই কি তাই! খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তো এটা রোমান্টিক ভাইব থেকে অ্যাকশনে চলে যাওয়া ছবি যেখানে ভালোবাসার জন্য প্রধান চরিত্রকে রাক্ষসের মতো বীভৎস কিছু হতে হয়েছে। ভালোবাসলে মানুষ রাক্ষসও হয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে।
মেহেদি হাসান হৃদয় সিয়াম আহমেদকে দিয়ে ‘বরবাদ’-এর চেয়েও বেশি ভায়োলেন্সে ‘রাক্ষস’ নির্মাণের যে সাহস বা চ্যালেঞ্জটি নিয়েছেন এটা একইসাথে আশ্চর্যের ও করে দেখানোর বিষয়ও হয়ে গেছে। সিয়ামের ট্রান্সফরমেশন অ্যাকশন ছবিতে যা দেখা গেল এটি হাইলি অ্যাপ্রিশিয়েট করার মতো। এরকম অ্যাকশন অবতারে সিয়ামকে দেখা যাবে তা এত দ্রুত হয়তো ভাবাই যায়নি।
যে-কোনো প্রফেশনে কোন মানুষের কোন দিকটি বেশি অ্যাপ্রিসিয়েশন পায়? চেষ্টা, চেষ্টা যত করা হবে নিজের পরিবর্তন তত আসবে এবং মানুষের সাধুবাদ আসবে। ‘রাক্ষস’ ছবিতে সিয়ামের চেষ্টাটাই সবচেয়ে সাধুবাদের যোগ্য। ছবির গল্প ও পরিণতি ওভারঅল সিয়ামকেন্দ্রিক। এককথায় ওয়ান ম্যান আর্মির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজেকে ভয়ঙ্কর রূপে আবিষ্কার করার জার্নি ছিল একেবারে অন্যরকম। লং হেয়ার থেকে শুরু করে ফিটনেস পরিবর্তন, ফাইটের দারুণ চেষ্টা। তার ভয়েস নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিন্তু এরকম অ্যাকশন ছবিতে প্রথমবারের মতো তার লাউড ভয়েসের অ্যাকটিং তার চেষ্টাকেই সামনে নিয়ে আসে। সামনে যদি অ্যাকশন ছবি আরো করে তাহলে ভয়েস নিয়ে আরো কাজ করার সুযোগ আছে। ছবির শেষের আধঘণ্টা পুরোপুরি সিয়াম শো ছিল আর কারো কিছু করার ছিল না। স্ট্রিট ফাইটের সিনটি ছবির বাকি ফাইটের থেকে একদম ভিন্ন ছিল এবং বেশ দক্ষতার সাথে সিয়াম হ্যান্ডেল করেছে।

সিয়ামের পর ছবিতে দ্বিতীয় কেউ নজর কেড়েছে সোহেল মণ্ডল। ভিলেনের লুক যেমন স্টাইলিশ অভিনয়ও শক্তিশালী। ‘মুসাফির’ ছবির সেই সোহেল মণ্ডল আর আজকের সোহেল মণ্ডলের মধ্যে বিরাট ব্যবধান।
সিয়ামের বিপরীতে নায়িকা সুস্মিতা চ্যাটার্জীর স্পেস যথেষ্ট ছিল। অভিনয়ের সুযোগ তত বেশি না থাকলেও কিউট লুক আকর্ষণীয়। সিয়ামের বাবার চরিত্রে আলীরাজের লুক আর ব্যক্তিত্বপূর্ণ অভিনয় নজর কেড়েছে এবং মায়ের চরিত্রে নাজনীন চুমকিও ভালো ছিল। সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র লেগেছে সুজাতাকে। এতদিন পর ক্যামেরার সামনে এসে একদম রুদ্ররূপে দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রমাণ করে দিলেন ওল্ড ইজ গোল্ড।
ছবির গানগুলোর মধ্যে ‘তুমি ছাড়া’ বেশ রোমান্টিক ভাইব দেয়। ডুয়েট, ফিমেল দুই ভার্সনই বেশ রোমান্টিক। ‘শুদ্ধতার প্রেম’-এর হুইসলিংটা ভালো। আইটেম সংটা এনার্জেটিক।
কমার্শিয়াল ছবির ভাষা আয়ত্ত করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মেহেদি হাসান হৃদয় কমার্শিয়াল ছবির ভাষা ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছেন যার লেটেস্ট প্রমাণ ‘রাক্ষস’ এবং এ ধারাবাহিকতা নির্মাণ করছেন এর ধারাবাহিকতা থাকলে তাঁর অবস্থান বেশ ভালো পর্যায়ে যাবে।
রেটিং – ৮/১০






