ষাটের দশকের ঈদের সিনেমা
ষাটের দশকের শুরুতে ছিল উর্দু ছবির দৌরাত্ম্য। ১৯৬৫ সালে ‘রুপবান’ মুক্তির পর বাংলা ছবির জোয়ার ওঠে। তবু পুরো দশকজুড়ে উর্দু ছবির সঙ্গে বাংলা ছবিকে লড়ে যেতে হয়। ঢাকায় ছবি নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ঈদে প্রথম যে ছবিটি মুক্তি পায়, তা একটি উর্দু ছবি। মুস্তাফিজের বিখ্যাত সেই ছবি ‘তালাশ’ মুক্তি পায় ১৯৬৩ সালের ঈদুল আজহায়।

ষাটের দশকে আরও অনেক বিখ্যাত উর্দু ছবি মুক্তি পায় ঈদে। জহির রায়হানের ‘সঙ্গম’ ও ‘বাহানা’ এবং এহতেশামের ‘চকোরী’ ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবি। ‘সঙ্গম’ পুরো পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি। আফজাল চৌধুরী এই ছবির চিত্রধারণ করেন। খলিল, রোজী, হারুন এবং সুমিতা দেবীর অভিনয়সমৃদ্ধ এই ছবি পাকিস্তানে তুমুল সাড়া ফেলে। ‘বাহানা’ও একই পথের পথিক। আফজাল চৌধুরীর ক্যামেরাচালনায় এই ছবি পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি। রহমান-কবরী জুটির এই ছবি দর্শকজোয়ারে ধন্য। ‘চান্দা’র পর এহতেশামের আরেক রেকর্ডের ছবি ‘চকোরী’। নাদিম-শাবানা জুটির এই ছবি ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য পায়।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলা ছবিও ঈদে মুক্তি পেয়ে তুমুল সাফল্য পেতে থাকে। সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ এবং খান আতাউর রহমানের ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবি। বাংলা সিনেমার প্রতিষ্ঠার পথে এই দুটি ছবির ভূমিকার কথা সবারই জানা। ‘সুতরাং’ ছবির মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে সুভাষ দত্তের এবং নায়িকা হিসেবে কবরীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ ছবির গানগুলো এখনও শ্রোতাদের কানে গুঞ্জরন তোলে।
পরিচালকদের মধ্যে জহির রায়হান, এহতেশাম, খান আতাউর রহমান এবং সুভাষ দত্তের ছবিই বেশি মুক্তি পায় ঈদে। তারকাদের মধ্যে রহমান ও শবনমেরই দাপট দেখা যায়। এই জুটির সাফল্য ছিল প্রায় নিশ্ছিদ্র।
সেই সময় একটি নতুন ছবি ৬/৭টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতো। কখনও-কখনও বড় প্রযোজনা সংস্থার উর্দু ছবি হলে আরও বেশি সিনেমা হলেও মুক্তি পেতো। জহির রায়হানের ‘বাহানা’ পূর্ব পাকিস্তানের ৬টি সিনেমা হলে একযোগে মুক্তি পায়।
একটি ছবি হিট হয়েছে কিনা তা বোঝা যেত কোনও ছবি সিলভার জুবিলি তথা ২৫ সপ্তাহ অতিক্রম করলে। ছবির বড় সাফল্যের লক্ষণ ছিল কোনও ছবির গোল্ডেন জুবিলি তথা ৫০ সপ্তাহ অতিক্রম হওয়া। ‘তালাশ’ ব্যবসার দিক থেকে রজতজয়ন্তী পার করা একটি ছবি।
ষাটের দশকে ঈদে ছবি মুক্তির জন্য নির্মাতাদের মধ্যে তেমন কাড়াকাড়ি ছিল না। তখন ছবির উৎপাদন ছিল কম। ৪০টার বেশি ছবি কোনও বছরই তৈরি হয়নি। ফলে ঈদের বাইরেও বড় ছবি মুক্তি পেতো, সেসব ছবি সাফল্যও পেতো। ঈদের মধ্যে ব্যবসা আটকে থাকতো না।
ঢাকায় নির্মিত উর্দু ছবি সরাসরি উর্দু ভাষায় যেমন মুক্তি পেতো, তেমনই উর্দু থেকে বাংলায় ডাব করেও ছবি মুক্তি পেতো। যেমন, ‘তালাশ’ ছবিটি স্বাধীনতার পরে ডাব করে বাংলাদেশে মুক্তি দেওয়া হয়। আবার উর্দু ও বাংলা এই দুটো ভাষাতেও একই সঙ্গে চিত্রায়িত হতো কিছু ছবি। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ এমনই একটি ছবি।
শুরুর দিকে সামাজিক ছবির আধিক্য দেখা যায়। পরের দিকে এই ধারার ছবির সঙ্গে যুক্ত হয় ফোক ঘরানার ছবি। ছবির ধরন যেমনই হোক না কেন, দর্শক পছন্দে ঈদের ছবি বরাবরই এগিয়ে থাকতো।






