সত্তর দশকের ঈদের সিনেমা
স্বাধীনতার পরপরই ঈদ হয়ে ওঠে সিনেমার উৎসব। একে তো উর্দু ছবির প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়, সেই সঙ্গে উপমহাদেশের ছবি আমদানিও নিষিদ্ধ থাকে। ফলে বাংলা ছবির প্লাবন সৃষ্টি হয়। প্রচুর ছবি তৈরি হতে থাকে। সত্তর দশকের প্রথম ভাগে কিছুটা কম, কিন্তু দ্বিতীয় ভাগ থেকে ছবি উৎপাদনের হিড়িক পড়ে।

১৯৭২ সালের ঈদেই ব্যবসার রেকর্ড তৈরি হয়ে যায়। এই বছরের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়ে কাজী জহিরের ‘অবুঝ মন’ পাকিস্তান আমলের সব ব্যবসায়িক রেকর্ড ভেঙে দেয়। রাজ্জাক, শাবানা ও সুজাতা অভিনীত এই ছবি গান-গল্পে গোটা বাংলাদেশকে আলোড়িত করে। এখান থেকেই শুরু হয় ঈদের ছবির জয়জয়কার।
সত্তর দশকের যত বড় বড় হিট ছবি, তার অধিকাংশই মুক্তি পায় ঈদে। জহিরুল হকের ‘রংবাজ’, খান আতার ‘সুজন-সখী’, এসএম শফির ‘দি রেইন’, আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এবং ইবনে মিজানের ‘জিঘাংসা’, ‘বাহাদুর’ ও ‘নিশান’ মুক্তি পায় ঈদে। এই ছবিগুলো শুধু সত্তরের দশকের সেরা ছবিই নয়, সিনেমার ইতিহাসেও এগুলোর পদচিহ্ন অত্যন্ত উজ্জ্বল।
সত্তর দশকের ঈদের ছবিগুলোর সাফল্য তৈরি করে দেয় বেশ কয়েকজন বাণিজ্যসফল নির্মাতার ক্যারিয়ার। আলমগীর কুমকুম, মোহসীন, অশোক ঘোষ, সিরাজুল ইসলাম ভূইয়া, মমতাজ আলী, সাইফুল আজম কাশেম, কামাল আহমেদের ক্যারিয়ারে এই দশকের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত তাদের পরিচালিত ছবিগুলোর ভূমিকা অনেকখানি।

তারকাদের বেলায়ও ঈদের ছবির খোলামেলা অবদান রয়েছে। রাজ্জাকের ক্যারিয়ারে নতুন ইনিংসের সূচনা ‘রংবাজ’-এর সাফল্যে। শাবানার ক্যারিয়ারে ‘অবুঝ মন’ এক মাইলফলক। কবরীর ক্যারিয়ারে ‘সুজন-সখী’র মতো ছবি দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া ভার। ববিতার জন্য ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নিশান’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ ছবিগুলো অরুণের মতোই জ্বলজ্বলে। আর ওয়াসীমের উত্থান ও বিকাশ এই দশকেরই ঈদের ছবি ‘বাহাদুর’, ‘কে আসল কে নকল’, ‘দি রেইন’-এর মধ্য দিয়ে।
১৯৭৪ সালের ঈদুল ফিতরের ব্যবসা সফল ছবি ‘ভাই-বোন’ মুক্তি পায় ৮টি সিনেমা হলে। সেই সময় নতুন ছবি ৭/৮টি সিনেমা হলেই মুক্তি পেতো। সত্তর দশকের শেষের দিকে অবশ্য ছবিপ্রতি সিনেমা হলের সংখ্যা ১০/১২টিতে উন্নীত হয়।
তখন ঈদে ছবির ব্যবসা এতটা বেড়ে যায় যে প্রযোজক-প্রদশর্করা এই দিনটির জন্য মুখিয়ে থাকতেন। ১৯৭৭ সালের ঈদুল ফিতরের সময় ছবির লাভের হিস্যা নিয়ে প্রযোজক-প্রদর্শক দ্বন্দ্ব বাঁধে। সেই গোলমালের মধ্যেই প্রদর্শকরা প্রযোজকদের নিষেধাজ্ঞার পরোয়া না করে ছবি মুক্তি দেন। ‘নিশান’ ও ‘দাতা হাতেম তাই’ চালিয়ে হল মালিকরা প্রচুর মুনাফার মুখ দেখেন।

সত্তরের দশকে বিভিন্ন ধারার ছবি ঈদে দর্শকপ্রিয় হয়েছে। সফল ছবির তালিকায় যেমন ‘আগুন’-এর মতো সামাজিক ছবি আছে, আবার ‘দস্যুরাণী’র মতো ফ্যান্টাসি ছবিও আছে। ‘রংবাজ’-এর সূত্র ধরে যে অ্যাকশন ঢাকাই সিনেমায় যুক্ত হয়, গোটা সত্তর দশকজুড়েই এর দাপট দেখা গেছে। ইবনে মিজানের ছবি মানেই ছিল অ্যাকশনে ভরপুর বিনোদন ছবি। ঈদে তার ছবিই মুক্তি পেয়েছে বেশি। সেসব ছবির সাফল্যও চোখধাঁধানো। ফলে পরের দশকেও ইবনে মিজানের ফর্মুলার জয়জয়কার দেখা গেছে।






