Select Page

পূর্ণাঙ্গ মান্না

পূর্ণাঙ্গ মান্না

.

মান্না মূলত কাল্ট ঢালিউডি ইন্ডাস্ট্রিতে। যখনই বক্তব্যধর্মী ছবির কথা সবে তাঁর নাম অবধারিতভাবেই চলে আসবে। তাঁর বক্তব্যধর্মী সোশ্যাল মেসেজের ছবির যে গুণাগুণ সেটা তাঁকে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যান্য ছবিগুলোর মধ্য থেকে সহজে আলাদা করেছে। এখানে মূলত তাঁর কাল্ট ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে।

মান্না-ই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় স্ট্রাগল করা নায়ক যাকে টপ পজিশনে আসতে অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে। আশির দশকে আগমন হলেও পুরো নব্বই দশকে তাঁকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। এমনকি তাঁর পরে ইন্ডাস্ট্রিতে আসা অমর নায়ক সালমান শাহ-ও তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিল, টপ পজিশনে ছিল ৯৩-৯৬ সময়কালে। জুনিয়র নায়কের সাফল্য দেখে তাঁকে ধৈর্য ধরতে হয়েছে টপ পজিশনে আসা পর্যন্ত। তখনকার সিনিয়র জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন-দের রাজত্ব তো ছিলই।

মান্নার নায়িকার সংখ্যা অনেক। তার সমসাময়িক ও বয়সে কিছুটা বড় নায়িকার সাথেও ছবি করেছিল। মান্নার স্ট্রাগল ছিল সব নায়কদের থেকে অনেক বেশি। লং টাইম স্ট্রাগল করে তারপর শীর্ষস্থানে আসতে হয়েছে। প্রথম ছবি ‘পাগলী’-তে নায়িকা ছিল ফারজানা ববি। সেই থেকে শুরু তারপর নিপা মোনালিসা, অঞ্জলী, শেলী (স্ত্রী), রেহানা জলি, নাসরিন (জসিমের দ্বিতীয় স্ত্রী), সুনেত্রা, অঞ্জু ঘোষ, দিলারা, রাণী, চম্পা, কবিতা, নূতন, অরুণা বিশ্বাস, জিনাত, বনশ্রী, সাথী, সুচিত্রা, রেবেকা, দিতি, সন্ধ্যা, শাবনাজ, শাহনাজ, মৌসুমী, শাবনূর, পপি, পূর্ণিমা, ঋতুপর্ণা, শিল্পী, একা, নদী, জনা, সিমলা, নিপূণ, ময়ূরী, মুনমুন, অপু বিশ্বাস, রচনা ব্যানার্জীসহ আরো নায়িকা আছে ক্যারিয়ারে।

মান্নার ছবির যে ভেরিয়েশন সেখানে আশির দশকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর আগমন এবং ২০০৮-এ মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ জার্নির ক্যারিয়ারে অনেক ধরনের ছবিতে অভিনয় করতে হয়েছে। ফ্যামিলি ড্রামা থেকে শুরু করে রোমান্টিক ড্রামা, ফোক-ফ্যান্টাসি, পলেটিক্যাল ড্রামা, সাহিত্যভিত্তিক ছবি এভাবে অনেক ভেরিয়েশন এসেছে ক্যারিয়ারে।

কাজী হায়াতের সমাজবাস্তবতার বক্তব্যধর্মী ছবিগুলোতে মান্না তখনই নিজের একক একটা আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিল। সেই আশির দশকেই ‘যন্ত্রণা’-র মতো ছবি করে নিজের জাত চিনিয়েছিল তারপর নব্বইয়ে ‘দাঙ্গা, ত্রাস, দেশদ্রোহী, লুটতরাজ, তেজী, ধর, মিনিস্টার, শান্ত কেন মাস্তান’-এর মতো ছবি মান্নাকে ভিন্ন একটা পরিচিতি দিয়ে দেয়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই তাঁকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল আর বলা হয়েছিল ‘মান্না বেশ ম্যাচিউর অভিনয় করে।’ সেই ম্যাচিউরিটি বক্তব্যধর্মী ছবির যাত্রা শুরুর মাধ্যমে হয়েছিল।

‘কাসেম মালার প্রেম, আলো আমার আলো’-র মতো রোমান্টিক ছবির পাশাপাশি ‘গরিবের বন্ধু, শিমুল পারুল, পালকি, ঘরবাড়ি, টাকা পয়সা, অবুঝ সন্তান, স্ত্রীর স্বপ্ন, গরিবের বউ’-এর মতো ড্রামাটিক ছবিও মান্না করেছে, টোটাল অ্যাকশন ছবিতেও নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে যার প্রমাণ ‘আম্মাজান, বোমা হামলা, আমি জেল থেকে বলছি, সমাজকে বদলে দাও, এদেশ কার’ আবার সাহিত্যভিত্তিক ‘কাবুলিওয়ালা, উত্তরের খেপ, সাজঘর’ এর মতো ছবিতেও তুলনাহীন।

নব্বই দশকের শেষের দিকে ‘আম্মাজান’ মুক্তির পর নতুন দৃশ্যপটে মান্নার রাজত্ব শুরু হয়। নিজের সেরা সময়টাতে আসতে তাঁকে এক যুগেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে এত বড় স্ট্রাগল আর কোনো নায়ক করেনি। তাঁর স্বপ্নই ছিল শীর্ষস্থান। নব্বই দশকের প্রান্তে এসে যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছিল তা মৃত্যু পর্যন্ত ছিল। সমসাময়িক নায়ক ব্যবসায়িক দিক থেকে দু’এক বছর এগিয়ে গেলেও মান্নাই ছিল ২০০০ পরবর্তী ইন্ডাস্ট্রির টপ নায়ক।

প্রযোজক মান্নার গুণাগুণও তার টোটাল ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। ‘কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র থেকে যে ছবিগুলো নির্মিত হয়েছিল তার পেছনে থাকত মান্নার বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তাভাবনা। কোন ছবিতে কোন তারকাকে নিলে ছবি চলবে, ছবির সিনিয়র তারকা কারা থাকবে, পারিশ্রমিক যাই লাগুক নিজের স্যাটিসফেকশনের জন্য নির্ধারিত তারকাকে নিতেই হবে এসব প্রযোজক মান্না খেয়াল রাখত তাই সাফল্য পেয়েছিল। শাকিব খান যখন নিজের অবস্থান তৈরি করতে লাগল মান্নার সাথে কিছু ছবিতে দেখা গেছে। মান্না জানত দুজন এক ছবিতে থাকলে দর্শক গ্রহণ করবে তাই সফলও হয়েছে। এক ছবি মুক্তির পর বা শ্যুটিং প্যাকআপের পর মিটিং করত পরের ছবি কীভাবে আরো সফল করা যাবে তা নিয়ে এতটা সচেতন ছিল। গুরু জেমসকে মান্না-ই প্রথম রাজি করায় ‘মনের সাথে যুদ্ধ’ ছবিতে গান করার জন্য এবং তাঁর আন্তরিকতায় জেমস রাজি না হয়েও পারেনি। মেকানিজমের জ্ঞান ছিল মারাত্মক। এসব কারণে মান্নাকে ‘গবেষক নায়ক’-ও বলেন তাঁর সমসাময়িক পরিচালক, সহকর্মীরা। একজন মান্না এভাবেই তাঁর সময়কে জয় করে গণমানুষের নায়কে পরিণত হয়েছিল কেননা তাঁর টোটাল ক্যারিয়ারে গণমানুষের উপযোগী ছবির সংখ্যাই ছিল বেশি।

মান্না চলচ্চিত্র ছাড়া আর কিছু ভাবত না। যে কথাটা জসিমকে নিয়ে বলা হত যে জসিম আপাদমস্তক চলচ্চিত্রের ভাবনায় ডুবে থাকত মান্নাও তাই ছিল।

মান্না একটা টোটাল ফিল্ম প্রোডাক্ট ছিল যার কাজ নিয়ে প্রচুর গবেষণা হবে ভবিষ্যতে এবং সেটা তাঁর সর্বশ্রেণির দর্শক গ্রহণযোগ্যতার জন্যই হবে।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply