Select Page

‘দম’ সিনেমাতে মূল দমের পরীক্ষাটা দর্শকেরই ঘটে

‘দম’ সিনেমাতে মূল দমের পরীক্ষাটা দর্শকেরই ঘটে

‘দম’ সিনেমার দুইটা পর্ব। প্রথম পর্বে সুরা ইউনুসের তেজ দেখানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় পর্বে অলৌকিক গাধার মৃত্যুতে নায়কের বেদনা বোঝানো হয়েছে। তবে যেহেতু নায়কের একজন স্ত্রী দেশে ছিলেন, তাই গাধার মৃত্যুবেদনা ও স্ত্রীর বিরহবেদনার একটা তুলনামূলক আলোকপাত বজায় ছিল। দুইটি পর্ব প্রায় সমান মাপে বিরতির আগে-পরে পরিবেশিত হয়েছে। অবশ্য এই পর্বটিকে ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ম্যাজিক দক্ষতা’ হিসেবেও দেখা চলে। সেই হিসেবে দ্বিতীয় পর্বটি ‘অলৌকিক গাধা’ কিংবা ‘দক্ষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়’ যে কোনো নামে অভিহিত হতে পারে।

কয়েকজন আহাম্মুক এবং একজন কবিকোমল তালিবান সৈন্যের হাতে বাংলাদেশের কাবাডিদক্ষ নায়ক ধৃত হন আফগানিস্তানে। এই নায়কটি কোনো এক (বাংলাদেশি) গ্রামে মাইক্রোক্রেডিটকেন্দ্রিক একটা এনজিওতে চাকরি করতেন। তাঁর কিস্তি তোলার দক্ষতার কারণে প্রমোশন দিয়ে ডাইরেক্ট আফগানিস্তানের গ্রামে কিস্তি তুলতে পাঠানো হয়েছিল। কীভাবে পশতু বা দারি ভাষা ছাড়াই তিনি আফগানিস্তানের গ্রামে গ্রামে কিস্তি তুলতে পারবেন তার ট্রেনিং নিশ্চয়ই দেওয়া হয়েছিল। তবে সিনেমাতে সেই অধ্যায় নেই।

কিন্তু তালিবানদের আহাম্মুক অংশের হাতে তিনি ধরা পড়বার পর শুরু হয় তাঁর বন্দিদশা। প্রথমে মৃত্যুর হুমকি, পরে মুক্তিপণ সব মিলে এক রোমহর্ষক ব্যাপারস্যাপার। মানে সেরকমই ইচ্ছে ছিল সিনেমাটির যাতে দর্শকেরা এই রোমহর্ষকতার স্বাদ পায়। ওদিকে নায়কের মা ও স্ত্রী বন্দি হবার দ্বিতীয় দিনেই রেডিও-টিভি থেকে জানলেও সংযত কণ্ঠস্বরেই শাশুড়ি-বউয়ের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ৭/৮ দিন পর কী যেন এক অজ্ঞাত জজবাতে স্ত্রী ঢাকায় ওই এনজিওর অফিসের দিকে রওনা হন। ততক্ষণে ওদিকে অলৌকিক গাধাকে এক গুলিতে মেরে ফেলেছে পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত এক তালিবান সৈন্য।

এদিকে ঢাকা গিয়ে বউ কান্নাকাটি শুরু করেছে। ওদিকে নায়ক সুরা ইউনুসের গুণাগুণ ভুলে গিয়ে অন্যান্য উপায়ে বাঁচবার চেষ্টা করতে থাকেন। এর মধ্যে আমেরিকা বোমা মেরে বসে গ্রামে। মানে আফগানিস্তানের গ্রামে। তখন একটা বিরাট সুযোগ পেয়েছিলেন নায়ক টয়োটা প্রাডো বা ল্যান্ডক্রুসার গাড়িতে চড়েই পালিয়ে আসবার। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর মৃত এক বালিকার দিকে নজর পড়াতে আর পালিয়ে আসতে পারেননি। তখন আবার তিনি বন্দিমর্যাদায় ঢুকে পড়েন।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হচ্ছে একটা অতি-তৎপর, জনবান্ধব, ক্ষিপ্র, স্মার্ট হাসিখুশি লোকদের অফিস। তাঁরা হাসিহাসি মুখে সমস্যাটির সমাধান করে ফেলেছেন। তবে এক্ষেত্রে নায়কের কলিগদের কলিজাভরা ভালবাসারও অবদান রয়েছিল। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগে কাজ আগালে কী হবে, আহাম্মুক তালিবানরা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল না মেনে নায়ককে কোনো একটা উদ্ভট জায়গায় নামিয়ে দেয়। তারপর সেই পাথুরে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পাকিস্তানি তালিবানের সাথে যা-তা একটা ঢিসুম ঢাসুম হয়। এখান থেকে বাঁচার পর নায়ক বিরাআআআট একটা মরুভূমির মধ্যে গিয়ে পড়েন। সেইটা হেঁটে হেঁটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তিনি চলেন।

তখন কীভাবে কীভাবে যেন আমরা বুঝতে পারি তিনি মুক্তি পেয়েছেন। আসলে আমরাও ছবি দর্শন থেকে মুক্তি পাই। ‘দম’ সিনেমাতে মূল দমের পরীক্ষাটা দর্শকেরই ঘটে। গল্পটা বলে দেয়াকে স্পয়লার বলা হয়ে থাকে। তবে আমার ধারণা এই ছবির গল্পে আলাদা করে স্পয়েল করবার জন্য কারো কিছু করতে হবে না।

ইউনুস জমানাতে শ্যুটিং হওয়া আর কোনো ছায়াছবি বোধহয় আমি দেখিনি। তবে দেখা দরকার।


About The Author

মানস চৌধুরী

লেখক, শিক্ষক ও নৃবিজ্ঞানী

Leave a reply