Select Page

বিহেভিয়ার ইকোনমিক্স: ‘Me time Investors’ এবং ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এ তানিম নুর!

বিহেভিয়ার ইকোনমিক্স: ‘Me time Investors’ এবং ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এ তানিম নুর!

ট্রেন এবং লঞ্চজার্নির মধ্যে কোনটা অধিক হৃদপাত করে, নির্ধারণে টস করারও পূর্বে যে মীমাংসাতে পৌঁছানো বৌধিক দৃষ্টিকোণে সিগনিফিক্যান্ট তা হলো, সারা পৃথিবীতে ভাষিক সীমানায় বিভূত ভিন্নতা সত্ত্বেও সবখানকার মেকাররা কেন ট্রেনজার্নি প্লটেই ফিল্ম নির্মাণ করেন।

আমার দুটো সম্ভাব্য কারণ লাগে

-একটা ট্রেনে শত শত মানুষ, প্রত্যেকের থাকে নিজস্ব গল্প। দীর্ঘসময় একত্রে থাকার কারণে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষও ঘন্টাখানেক পরে অতি আপন হয়ে যায়। স্টেশন এলে নেমে পড়ে। মধ্যবর্তী মুহূর্তগুলো হয়ে থাকে ম্যাগনেটিকালি ম্যাগনিফিশেন্ট। মাল্টিস্টার কাস্টিংয়ের স্টোরিলাইনের জন্য আদর্শ সেট আপ

– জিরো লোকেশন জটিলতা ৷ একটা সেট ডিজাইন করে ক্যামেরার এঙ্গেল এদিক-সেদিক করেই কাজ চালিয়ে নেয়া যায়। শুটিংয়ে হ্যাপা এবং বাজেট দুটোই থাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে৷

বাংলা ভাষায় এ জ’রায় ক্লাসিক কাল্ট সত্যজিত রায়-উত্তম কুমারের প্রজেক্ট ‘নায়ক’!

প্রসেনজিৎ এবং ঋতুপর্ণা দীর্ঘ ১৫ বছরের বিরতি ভেঙে স্ক্রিন শেয়ার করেছিল ‘প্রাক্তন’ নামের ফিল্মে, সেটাও ট্রেন বিলাস।

তানিম নুর যদি সরকারি চাকরির রিটায়ারমেন্টের বয়স (৬০) অবধি পটল তুলবার দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে পারেন, ‘The Spicy Ingredients of Bangla Commercial Film’ সংক্রান্ত একাডেমিক পড়াশোনায় তার ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিশ্চিতভাবেই স্থান পাবে যদি না এর মধ্যে দক্ষিণপন্থীরা মসনদ দখল করে সিনেমা আর গান-বাজনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বসে!

[ডিসক্লেইমার: স্পয়লার সংক্রান্ত রিজার্ভেশন থাকলে আমার ফিল্ম বিষয়ক লেখালিখি এড়িয়ে চলতে কঠোরভাবে সতর্ক করছি]

লুক অ্যান্ড ফিল এ টপ প্রায়োরিটি দিয়ে আর্টিস্ট-টেকনিশিয়ান রেমুনারেশন, প্রোডাকশন-লজিস্টিক- পোস্ট প্রোডাকশন, প্রমোশন খরচ মিলিয়ে একটা ফিল্মের বাজেট যদি হয় ৫ কোটি (খুবই কনজারভেটিভ ক্যালকুলেশন৷), শুধু খরচ কভার আপ করতে ফিল্ম থেকে রেভিনিউ আসতে হবে ১৫-১৬ কোটির কাছাকাছি। প্রফিট কাউন্টিং অনেক দূর।

বাংলাদেশে ফিল্মে ফাইন্যান্সিং সংক্রান্ত সবচাইতে প্রচলিত গুঞ্জন হলো- এটা অনেকটাই টাকা সাদাকরণ অথবা মানি লন্ডারিং প্রজেক্ট!

গুঞ্জনকে বাতিল করে যদি শুধুমাত্র বাজেটেই ফোকাসড থাকি, বাংলাদেশের বহু কোম্পানির বাৎসরিক টার্নওভার ২০ কোটির কম!

অর্থাৎ ফিল্মমেকিং পুরোদস্তুর বিজনেস ভেঞ্চার;  বিহেভিয়ার ইকোনমিক্স না বুঝলেও সে লেখালিখি, মিউজিক বা পেইন্টিংয়ে নিবেদিত থাকতে পারবে, ফিল্মমেকিংয়ে কখনোই নয়।

ইকোনমিক্সের অন্যতম ইন্টারেস্টিং শাখা বিহেভিয়ার ইকোনমিক্সের খুবই আলোচিত একটি বই ‘predictably irrational’; তানিম নুর তা পড়েছেন অথবা পড়েননি, তবে বিহেভিয়ার ইকোনমিক্সে তার স্বতঃসিদ্ধ প্রজ্ঞার একটা থট এক্সপেরিমেন্ট শেয়ার করি-

‘সিনেপ্লেক্সে সাধারণত একা ফিল্ম দেখা দর্শক কম থাকে। গড়ে দুজন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাপল, অথবা বন্ধু-সহকর্মী। পপকর্ন কিনে, বসে। আমরা যদি প্রতিটি সার্কেলকে প্যাকেজ ধরি, সেখানে গড় সদস্য ৩: প্যাকেজে গড় টিকেটসংখ্যা যদি ৫ বা ৬-এ উন্নীত করা যায়, দম বা প্রেশার কুকার-এ ৩০০ প্যাকেজ, বনলতা এক্সপ্রেসে যদি ২৯০ও হয়, প্যাকেজের ভেতরে সদস্যসংখ্যা বেশি হওয়ায় টিকেটের বিক্রি হবে কয়েকগুণ। নিদারুণ চমৎকার এবং ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া, যেন শার্লেটের হাসি! তার আগের ফিল্ম ‘উৎসব’ এর প্রমোশন লাইন ‘পরিবার ছাড়া দেখা নিষেধ’ মানুষ প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করেছে। বিহেভিয়ার ইকোনমিক্সের রিয়েল লাইফ কেইস হিসেবে এ প্রমোশনাল লাইন এবং কনটেন্ট আন্ডারগ্রেড থিসিস টপিক হতে পারে।

মার্কেট ইকোনমির বোঝাপড়াও খুবই শার্প তার। একজন ২৩ বয়সী তরুণ বা ৪৭ বয়সী ওয়ার্কিং লেডির টিকেটের দাম ৫০০ টাকা, আমরা যারা আনুমানিক ৩৭০০ শব্দের আর্টিকেল লিখি ফিল্ম নিয়ে (যেগুলো আসলে ৩-৪ লাইনের পরই পাঠযোগ্যতা হারায় সোশ্যাল মিডিয়ার ৯৭ শতাঙশ আইডির কাছে), তাদের টিকেট ৯০০ টাকা নয়, ৭০০ টাকা নয়, এমনকি ৫০১টাকাও নয়, একদম ৫০০!

দর্শক আসবে সিনেপ্লেক্সে, কয়েকটা ছবি তুলবে, আড়াই ঘন্টা ‘me/us time’ এ নিমজ্জিত থাকবে৷

আমরা KFC বা রেডিসন, কিংবা গ্লোরিয়া জিন্স যেখানেই খাই, ঘরে ফিরেও কি KFC  মাথায় থাকে, কিংবা পরদিন ঘুম ভেঙে যখন কর্মস্থলে যাই বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে?

উপযোগবাদী দর্শনের এক্সিলেন্স কিংবা আগলিনেস এটাই যে, এখানকার প্রতি সেকেন্ড এমনকি অখণ্ড মানবদেহটারই একটি উপযোগভ্যালু আছে। এই উপযোগভ্যালুর চাহিদা সেই গ্রুপের কাছে বেশি যাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের টেনশন কম, কিন্তু ‘me/us time’ টা উপভোগ্য করতে খরচে ইচ্ছুক। ইউরোপ বা আমেরিকায় বসবাসকারী NRB রাও এ ক্যাটেগরিতে পড়ে। তানিম নুর নূরের অডিয়েন্স গ্রুপ তাই সার্বিক বিচারে ‘me/us time investors’।

এ গ্রুপের জন্য কালচারাল কমোডিটিতে কয়েকটি ইনগ্রেডিয়েন্টের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক-

১.নস্টালজিয়া (মিলেনিয়াল এবং জেনারেশন এক্স গ্রুপ, যারা এখন পরিবারের ডিসিশন মেকার, আর্থিক এবং সামাজিকভাবে নিরাপদ। মধ্যবয়স টাচ করেছে, অথবা অতিক্রম করে গেছে। ৯০ আর শূন্য দশকে কেটেছে শৈশব-তারুণ্য। তাদের পছন্দের কমোডিটি নস্টালজিয়া)

২. পাঞ্চিং শব্দ, সার্কাজম, ট্রেন্ডি ঘটনা বা ডায়লগ (যেহেতু হলের ভেতরে ফাঙ্কি মুড অন থাকে, গভীর মনোযোগে কোনো দৃশ্য বিশ্লেষণ বা সিম্বোলিক কারুকাজ থেকে ইঙ্গিত পাওয়ার মানসিকতা কাজ করে না। স্ট্যান্ড আপ কমেডির মতো তাৎক্ষণিক রিয্যাকশন দরকার, অনেকটা স্টেরয়েড যেভাবে কাজ করে৷ এক্ষেত্রে স্টেরয়েড হলো ক্রিস্পি ডায়লগ, এর মধ্যে ২-১টা ভাইরাল হয়ে যায়)

প্রশ্ন আসতে পারে, এ ইনগ্রেডিয়েন্ট গাইডলাইন অনুসরণ করলেই কি যে কোনো পরিচালক তানিম নৌর হতে পারবেন? ক্রিকেট থেকে উদাহরণ দিই। তামিম ইকবাল, মুশফিক, সাকিব, রিয়াদ- প্রত্যেকেই কভার ড্রাইভ খেলেছে জীবনে, যে কোনো ব্যাটসম্যানই এ শটটা জানে খেলতে, তবু একই শট যখন লিটন দাস খেলে, এত তারিফ কেন করে সবাই, পার্থক্যটা কোথায় এবং কেন হয়!

২০২২-এ তানিম নূরের দীর্ঘ ইন্টারভিউ করেছিলাম। তিনি লাজুক প্রকৃতির মানুষ, মাত্র ‘কাইজার’ রিলিজ হয়েছে, তাকে আমার লেখা ‘সিগনেচার সরণ’ বইটা কুরিয়ার করি, ভেতরে থাকে চিঠিগ্রাফ। তিনি ফোন করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, বইয়ের ভেতরে এত বড় চিঠি নাকি কেউ তাকে লিখেনি। তার কৌতূহল ছিল কী কারণে তার সিরিজ অব ইন্টারভিউ করতে চাই। রিপ্লাই ছিল- আপনি সামনে অনেক জনপ্রিয় ফিল্ম মেকার হবেন, তখনকার ভাবনা শুনতে বোরিং লাগবে। এখনকার চিন্তা-দর্শন বরং ফ্রেশ; এই যে অনেকদিন আগেই আপনাকে ডিসকভার করছি, ব্যাপারটা আমার জন্য স্পার্কিং!

তানিম নূরের কাজের যে বৈশিষ্ট্যটি আমার অতি পছন্দের, রকগানের রিক্রিয়েশন।

তার প্রতিটি কাজে বাংলা রকগানকে যেভাবে জায়গা দেন, অতীত-বর্তমান মিলিয়েও কেউ এ ধারাটির চর্চা করেননি। বিহেভিয়ার ইকোনমিক্স কনটেক্সটেও এটি প্রমিজিং উদ্যোগ। একটা নতুন ট্র‍্যাক ‘me time investors’ গ্রুপ গ্রহণ করবে কিনা, নিশ্চয়তা নেই। যে গানটি ইতোমধ্যে লক্ষ মানুষের উপযোগ মিটিয়েছে, তাকে প্লেসমেন্ট দিলে এটাচমেন্ট তৈরি হয়। আইয়ুব বাচ্চুর ‘উড়াল দেব আকাশে’ গানটা তার শ্রেষ্ঠ ৭০টা কাজের মধ্যেও থাকবে না, বনলতা এক্সপ্রেসে যখন শুনছিলাম, অত্যাশ্চর্যজনক হলেও শিহরণ বোধ করছিলাম। প্রথমবার গানটা ভালো লাগলো। এখানেই কৌশলী মেকারের ক্যারিশমা।

তিনটি জায়গায় তিনি আরো সচেতন হতে পারেন

প্রথমত, ‘অবলম্বনে’ এর স্থলে ‘inspired from’ ব্যবহার করা প্রমোশনাল এক্টিভিটিতে। আমাদের ‘me time investor’ রা বই এবং ফিল্মের পার্থক্য ধরতে হিমশিম খায়। তিনি ‘উৎসব’-এর কনসেপ্ট নিয়েছিলেন চার্লস ডিকেন্সের গল্প থেকে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর কনসেপ্ট এসেছে হুমায়ূন আহমেদের একটা লেখা থেকে। ঘটনাক্রমে সেই গল্পগুলো যদি কারো পড়া থাকে সে বইয়ের সঙ্গে ফিল্মকে লাইন বাই লাইন মেলাতে শুরু করে, এবং অমিল পেয়ে প্রত্যাশাভঙ্গ ঘটে। তিনি যে প্লটটা শতভাগ রিক্রিয়েট করেছেন, যা ওই বইটি থেকে স্বতন্ত্র আইডেন্টিটি- এ ক্লারিফিকেশনটা ‘অবলম্বনে’ নেই, ‘inspired from’ এ আছে।

দ্বিতীয়ত, তার টেকনিকালি আরো নির্ভুল হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কয়েকটা বলি

-‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটের ট্রেন, আমি নিজেও ভ্রমণ করেছি এ ট্রেনে। ঢাকা থেকে ছাড়ে দুপুর দেড়টায়, চাঁপাইতে পৌঁছুতে সাড়ে ৭টা। ফিল্মে তিনি রাতের ট্রেন দেখিয়েছেন। যদি রিয়েলিস্টক এপ্রোচে যেতে চান, যেকোনো রুটের একটা রাতের ট্রেনের নামই দেয়া যেত। বনলতা নামের কারণে এক্সট্রা কোনো সুবিধা তো পাওয়া যাচ্ছে না, ‘জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস’ নামটাও কাব্যিক। গড়মানের মেকার হলে এ মাইনর ফ্ল-কে উপেক্ষা করতাম, কারণ মন্ত্রীর কারণে ওইদিন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ রাতের সার্ভিস দিতেই পারে। শক্তিমান পরিচালকেরা যেহেতু খুবই সূক্ষ্ম ডিটেইলিংয়েও নজর রাখেন, তাই রিমার্কেবল ভ্যালু এড না করলে রিয়েল লাইফ এলিমেন্টের সাথে টাইমলাইন ওভারল্যাপ না করাই বেটার। ‘উৎসব’-এও ৯০ দশকের ঘটনায় আর্টসেলের গান যুক্ত করেছিলেন। ‘me time investor’ দের জন্য এসব ম্যাটার না, তবে টেকনিকালি ফ্ল-লেস থেকেও একই পরিমাণ রেভিনিউ জেনারেট করার স্কোপ থাকলে সেদিকেই নজর দেয়া যেতে পারে বোধহয়।

-ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্মের এক্সিলেন্সের জন্য আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত।  তানিম নুর এখনো পর্যন্ত চমক বা গিমিক সৃষ্টি তথা স্ক্রিনপ্লেতেই নিবিষ্ট আছেন, তার ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ সাদামাটা। ‘কাইজার’ এবং ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজে পার্থক্য খুবই সামান্য, তাহলে একটা ওটিটি কনটেন্ট তথা ওয়েবসিরিজ, অন্যটা ফিল্ম বলছি কী কারণে!

– প্রত্যেক পরিচালকেরই একটা আর্টিস্ট বলয় গড়ে উঠে সময়ের পরিক্রমায়, তাতে আইডিয়া আর্টিস্টকে ডেলিগেট করা এবং আর্টিস্টের ডেলিভার করার জার্নিটা মসৃণ হয়। তানিম নূরের ক্ষেত্রে সাপোর্টিং ক্যারেক্টারে কয়েকজন আর্টিস্ট নিয়মিত হলেও লিড রোলের ক্ষেত্রে চঞ্চল চৌধুরীরই কন্টিনিউয়েশন দেখলাম শুধু। চঞ্চল ইতোমধ্যেই এস্টাব্লিশড, সেখানে তার সিগনেচার রাখার স্কোপ সীমিত। যারা এখনো পরিপূর্ণতা এচিভ করেনি, যেমন শরিফুল রাজ, শ্যামল মাওলা, তটিনী প্রমুখকে তার প্রজেক্টে বেশি বেশি ইনভলভ করা যেতে পারে। বনলতার কাস্টিং দুর্দান্ত, দুটো বাদে। চঞ্চল ও বাঁধনকে কোনো এঙ্গেলেই সমবয়সী লাগেনি, যদিও স্টোরিলাইন বলছে তারা ভার্সিটি লাইফে ব্যাচমেট ছিল।

যেহেতু ক্যারেক্টারগুলোর বেশিরভাগই হুমায়ূন নির্মিত, সে ভাইব রাখতে শামীমা নাজনীনকে নেয়া হয়েছে, ক্যামিও এপিয়ারেন্স হিসেবে এসেছে আইকনিক ফারুক আহমেদ-ডাক্তার এজাজ জুটি,অথচ  হুমায়ূনের পোস্টার বয় জাহিদ হাসান-মাহফুজ আহমেদই নেই। চঞ্চলের ক্যারেক্টারে বেস্ট ফিট হত জাহিদ হাসান, বাঁধনের ক্যারেক্টারে বিপাশা হায়াত, অথবা মোশাররফের চরিত্রে জাহিদ, চঞ্চলের জায়গায় মাহফুজ। ছাগলকান্ডে জাহিদ-মাহফুজের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে হয়তবা, দুজনকে কাস্ট করা তাই সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে চঞ্চলকে সরিয়ে জাহিদ হাসান। সম্প্রতি রুম্মান রশিদ খানের পডকাস্টসূত্রে জানলাম বিপাশা হায়াতকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, অনুমান করি সেটা বাঁধনের ক্যারেক্টার। তার জবাবের আন্ডারটোন মিনিং হলো অনেক বেশি স্টার কাস্টিং এবং নিজের ক্যারেক্টারের ব্যাপ্তি কম থাকায় রাজি হননি। ভুল করেছেন। বাঁধনের ক্যারেক্টারটা স্টোরিলাইনকে ডিরেক্ট করেছে, বিপাশা হায়াত থাকলে ফোকাস এমনিতেই পেয়ে যেতেন। বিপাশা এভেইলেবল না হলে দ্বিতীয় অপশন হতে পারত বিজরি বরকতউল্লাহ (কোথাও কেউ নেই দ্রষ্টব্য)। আমার ধারণা জাহিদ-মাহফুজ এনকাউন্টার যেহেতু সম্ভব হয়নি, পরিচালক তাদের পরের জেনারেশনের চঞ্চল-মোশাররফকে পিক করেছেন। এতে প্রমোশনাল সুবিধা পাওয়া গেলেও স্ক্রিনপ্লে কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

– দিলওয়ালে দুলহানিয়া ফিল্মে শাহরুখ-কাজলের সেই আইকনিক ট্রেন দৃশ্যটা রিক্রিয়েট করা হয়েছে সাবিলা-রাজের মাধ্যমে। খানিকটা হিউমারাস টোনে। রাজের মা হেলিকপ্টারে ঢাকায় চলে গেছে, মোশাররফ নেমে গেছে নিজের স্টেশনে, সাবিলা রাজকে জিজ্ঞেস করছিল সে কোথায় থাকবে। সেই ধারাবাহিক সিকুয়েন্সেই রাজের দৌড়ে ট্রেনে উঠা। সিকুয়েন্সটা শেষ হয় এভাবে, রাজ বলছে- ট্রেন মিস করতে পারি তোমাকে মিস করব না৷ এরপরেই কাট। সিকুয়েন্সের ইনটেনসিটি বাড়াতে এখানে চুম্বন অত্যাবশ্যকীয় রিয়্যাকশন ছিল। বাংলাদেশিদের মেধাশক্তি এবং যৌনশক্তি কম বলে এ দৃশ্যে ট্যাবু থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে চুম্বনের ইঙ্গিতপূর্ণ  রেখেও শেষ করা যেত। বিহেভিয়ার ইকোনমিক্সের কাছে আর্টিস্টিক চাহিদা পরাজিত।

‘Me time investors’ এর বাইরে কেউ যদি ফিল্ম দেখে তার ভালো লাগার উপকরণ আছে অনেকগুলোই

-শ্যামল মাওলার ক্যারেক্টারটা সবচাইতে কমপ্লেক্স। আমাদের চারপাশে এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমরা কেবল তাদের আচরণ দেখি, না বলা গল্পগুলো শুনলে তাদের প্রতি পারসেপশনে বদলও আসতে পারে।

-হুমায়ূন আহমেদের গল্পের ফিল্মে ন্যারেটর হিসেবে কন্ঠ দিয়েছে নুহাশ হুমায়ূন, স্ক্রিনে যে একটি লাশ। হুমায়ূনের প্রথম দিককার সন্তানদের মা কিছুদিন পরপর ফেসবুকে যেভাবে সদর দরজা খুলে দেন, তাতে আমরা জেনেছি বোনদের মতো নুহাশও পিতার প্রতি বিমুখ (আমি নিজে যেহেতু ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে, নুহাশের নেগেটিভ ইমোশনের ব্যাপারটা আমি অন্তর দিয়ে ফিল করতে পারি); মোশাররফ আমেরিকা থেকে তার মৃত সন্তানকে দাফন করতে বাংলাদেশে এসেছে। কথার এক পর্যায়ে বলছে- ওই দেশে তো ১৮ হলেই ছেলে-মেয়েরা আলাদা থাকে। অনেকবার ভেবেছি ওকে বলব আমি একা থাকি, আমার সাথেই থাক’, সে মুহূর্তে ন্যারেটর নুহাশের কন্ঠে শুনি- ‘বাবা একটাবার যদি বলতা’!

আমি জানি এই বাবা আসলে কোন বাবা! ফলে এই ছোট্ট লাইনটাই প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিতে পারে যারা কনটেক্সটটা কানেক্ট করতে পারবেন!

-মন্ত্রীর শ্যালিকা ক্যারেক্টার করা অভিনেত্রীর নাম জানি না। বাঁশের চাইতে কঞ্চি বড় আমাদের জনপদের চিরায়ত প্রবাদ। এই কঞ্চিগুলো স্যাডিস্ট প্রকৃতির, এবং বাঁশকে ভাঙিয়ে খেতে খেতে সর্বশান্ত করে দেয়। এ ক্যারেক্টারটা ভাবাবে।

-নাটক সারাজীবনেই খুব কম দেখেছি, তবে  বাংলাদেশি সিনেমা দেখার শীর্ষ ১০০ দর্শক র‍্যাংকিং করলে আমি প্রথম ৫৯ এ স্থান পাব কনফিডেন্টলি বলতে পারি। সেই গোলাম মোস্তফা, আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, সালমান শাহ, রিয়াজ, শাকিব খান— সব জেনারেশনের অভিনেতার অগণিত ফিল্ম দেখেছি। সবাইকে বিবেচনায় রেখেই বলি, শরিফুল রাজ সবচাইতে ভারসেটাইল। তার ব্রিডটাই আলাদা। যখন যে ক্যারেক্টার করে অবিকল মানিয়ে যায়। যদি চোখ বন্ধ করি এবং বনলতা এক্সপ্রেস নিয়ে ভাবি- শরিফুল রাজ, শ্যামল মাওলা আর শামীমা নাজনীনের বাইরে সবাইকে কন্ঠস্বর মনে হয় শুধু, চেহারা দেখতে পাই না

‘Me time investor’ দের জন্য কিছু রসদ

– হেলিকপ্টারে ফারুক-এজাজ জুটির ক্যামিও, এবং হুমায়ূনীয় সিগনেচার স্টাইলে শামীমা নাজনীনের হেলিকপ্টারে উঠে পড়া

-পুরুষ ডাক্তারকে লেবার পেইন উঠা স্ত্রীর ডেলিভারি করতে দিবে না বলে শ্যামল মাওলাকে বেঁধে রাখা

-চিত্রা বিয়ে থেকে পালিয়েছে, তাকে যে বান্ধবী পালাতে সাহায্য করেছে, সে বসে চিত্রার বিয়ের দাওয়াত খাচ্ছে

-আইয়ুব বাচ্চুর ‘বাংলাদেশ’ গানটা

-‘মহানগর’ সিরিজ থেকে মোশাররফের আইকনিক সংলাপকে রিফ্রেজ করা- ‘দুটো কথা মনে রাখবা। যে কোনো দুটো কথা হলেই হলো। তোমাদের মেমরির যা অবস্থা, এর বেশি পারবা না’

-আইয়ুব বাচ্চু যখন সলো গিটার বাজায়, তাকে কেউ গানের জন্য রিকুয়েস্ট করে না— প্রচন্ড উইটিফুল সংলাপ

-যৌবনে কোন এক কবিতা লেখার কারণে এক কবির পুরস্কার স্থগিত হয়েছে সম্প্রতি। সে ঘটনাকে একোমোডেট করা হয়েছে চঞ্চল চৌধুরির মন্ত্রীত্ব হারানোর কারণ হিসেবে দেখিয়ে।

-পকেটমার আর মন্ত্রীর পিএস ধরনের কমিক চরিত্র।

-কয়েকটা সিকুয়েন্স। যেমন এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা ডেলিভারি চাইলে বউকে আরো আগে প্রেগন্যান্ট বানাইতেন। ইন্তেখাব দিনার বলছে এই বগিতে একমাত্র ইয়াং মেয়ে তো তুমি, অন্য তরুণীর তাৎক্ষণিক জবাব- কেন আংকেল, আমাকে কি মহিলা মনে হয়!  চিত্রা ফোনে তার বান্ধবীকে জানাচ্ছে ডাক্তারের প্রেমে পড়েছে। এত দ্রুত প্রেম শুনে বান্ধবী বিস্মিত, চিত্রা বলছে- এর আগে কোনো ছেলে তো আমার সামনে বাচ্চাও ডেলিভারি করে নাই।

-হুমায়ূনীয় বাচ্চারা শার্প এবং চপল প্রকৃতির হয়। এখানেও আছে নীতু নামের এক শিশু। সে আনন্দ দিতে পারে।

-বন্ধুত্ব, বিভিন্ন ধরনের ইমোশনাল সম্পর্ক— অনেককে নাড়া দিতে পারে

বাংলাদেশি কমার্শিয়াল ফিল্ম আসলে কেমন হওয়া উচিত? তেলুগু-তামিলায়ন যে আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার দিন সমাগত প্রিন্স এবং রাক্ষস সে ইঙ্গিত শুরু করলো মাত্র।

ঔচিত্য প্রশ্নে একটামাত্র স্যাম্পল হয় না আসলে। বাংলা কমার্শিয়াল ফিল্ম অনেক রকমই হতে পারে, তার এক রকমে তানিম নূর নিজের পজিশন ক্রিয়েট করেছেন বিহেভিয়ার ইকোনমিক্সের প্রয়োগে, me time investor দের এটেনশন অধিকার করে নিয়ে— তার এ অর্জনে আমি আনন্দিত।

এসব ইনগ্রেডিয়েন্ট অনুসরণ করেই তিনি যদি মিউজিকাল ফিল্ম নির্মাণ করেন কখনো, ৯৭ জন শুভাকাংখী সমেত সেটা দেখতে বসব, এ প্রতিশ্রুতি আজই হস্তান্তর করে দিলাম!


About The Author

মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়

লেখক ও বায়োপিক এনালিস্ট

Leave a reply