বনলতা এক্সপ্রেস ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কী ঘটছে, আর এ সিনেমায় ইসলাম অবমাননার কোনো বিষয় আছে কিনা— এমন প্রশ্ন নিয়ে এক বড় ভাই বিশাল পোস্ট লিখেছেন। সেখানে আমার রিভিউর প্রসঙ্গ এসেছে, মূলত সেই কারণে ওই পোস্টে কমেন্ট করা। বলেছিলাম, এ সিনেমায় ইসলাম অবমাননার কিছু দেখি নাই। বরং পরিচালক সাবধানি হয়ে মূল উপন্যাসের একটা চরিত্র বদলে ফেলেছেন। এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রাথমিকভাবে প্রদর্শনী বাতিলের দাবি উঠেছে, সেটা মূলত সিনেমা সম্পর্কে গড়পরতা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। তবে পরে সেই পোস্টে আরেকজনের একটি কমেন্ট পড়ে আমি ধাক্কা খেয়েছি। তিনি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ ইসলামবিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় প্রপাগান্ডা খুঁজে পেয়েছেন।
নরমালি আমি একক ব্যক্তির মন্তব্য ধরে কথা বলতে পছন্দ করি না। এটা আমার কাজও না। কিন্তু বিপরীত কিছু বিষয় মাথায় আসতে মনে হলো, আমাদের সমাজে পারস্পরিক বোঝপড়ার ঘাটতি ভীষণ। আবার, আমার যে মত তা তো খুবই বিরল ক্ষেত্রে একদমই অভিনব হতে পারে। আমিও কোনো না কোনো সামাজিক অবস্থা-চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত।

আমরা সমাজের ভিন্ন ভিন্ন অংশ, এমনকি প্রতিদিন যাদের রাস্তা দেখি, একই গণপরিবহনে চলাচল করি— সেখানে যারা ‘অপর’ তারা কেমনে কথা বলে, কেমন খায়, কেমনে আবেগ প্রকাশ করে, তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস কেমন, তারা বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব-পরস্পরবিরোধী অবস্থান সামাল দেয়; তা নিয়ে আমরা বেখবর। বরং আমার মনের মতো যা না, তাকে অনেক সময় বৃহৎ ষড়যন্ত্র বলে দেখাটাই বড় বিষয়। তাহলে অন্যের খবর রাখার মতো আন্তরিক ইচ্ছা ও দায় থেকে আমরা বেঁচে যাই। এবং সমাজে একই মানুষের মধ্যে ইতি-নেতি নানা বিষয় কীভাবে একইসঙ্গে ফ্যাংশন করে তা না দেখে অন্ধ থাকলেও চলে।
দুই.
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আরেকটি ঘটনার কথা বলি। মাসখানেক আগে মজা করেই ফেসবুকে বিষয়টি শেয়ার করেছিলাম। ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া রায়হান রাফী পরিচালিত ‘প্রেশার কুকার’ দেখছিলাম। হলে বসে। অ্যাডাল্ট সনদ পাওয়া এ সিনেমায় কিছু রগরগে দৃশ্য আছে। ওই ঈদে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ একমাত্র সিনেমা যেটা ‘ইউ’ বা সর্বজনীন সনদই পাইছে। মানে পরিবারিক সিনেমা।
প্রসঙ্গ ‘প্রেশার কুকার’। আমি পাশের বন্ধুটিকে বলছিলাম, রাফীর সিনেমায় শুধু খারাপ লোকগুলো নামাজ পড়ে। উত্তরে সে বলল, না। নায়কও তো নামাজ পড়তেছে, সে তো রাজনৈতিক নেতার মতো লোক দেখানো ধর্ম করছে না। যা দেখাচ্ছে, ঠিকই আছে।
সিনেমাটি শেষ হয় মাদ্রাসায় পড়া এক কিশোরের চোখ দিয়ে, যে কিনা মূল চরিত্র পাখির ছেলে। আবহে একটি কাসিদা বাজতে থাকে, আর সর্ষে ক্ষেতের মধ্যে মুখ ঢেকে বোরকা পড়া অনেক নারী দাঁড়ায়া আছে। হল থেকে বের হওয়ার সময় শুনলাম এক নারী দর্শক বলছেন, ‘শেষে এটা কী গান ছিল? রাফী ইসলামপন্থী নাকি?’
এর আগেও রগরগে দৃশ্যময় ‘সুড়ঙ্গ’ নিয়ে একজনের সঙ্গে তর্ক হয়েছিল। তার মতে, ইসলামে ব্যাভিচারের শাস্তি হলো মানুষকে পুড়িয়ে মারা— রাফী সেটাই দেখাচ্ছে। আমি যখন বললাম, এমন কোনো বিধান ইসলামে নাই। তিনি কোনো রেফারেন্স দিতে পারেননি। অর্থাৎ এমনও এক ধরনের দর্শক আছেন, যারা মনে করেন ইসলামী কোনো অনুষঙ্গ থাকলে রগরগে দৃশ্যও যেন ইসলাম প্রচারের স্বার্থেই দেখানো হচ্ছে! মানে আমাদের সমাজের এক অংশে যেকোনো ধর্মীয় চিহ্ন বা ধর্মের মতো কিছু মনে হইলে; তা নিয়ে অস্বস্তি জাগে। অন্য সব অনুষঙ্গ আর মাথায় থাকে না।
তিন.
এখন আসি বনলতা প্রসঙ্গে। ‘বনলতা সেন’ নয়, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রসঙ্গে।
এ সিনেমায় কীভাবে ধর্ম অবমাননা খুঁজে বের করা যায়, তার একটা নমুনা শুরুতে বলা বড় ওই ভাইয়ের কমেন্টে দেখলাম।
একটি আপত্তি ছিল এমন— “একেবারে শুরুতে দুই ছেলের সংলাপ, ‘তোর লাগেজ দেখে মনে হবে আমরা দুইজন হানিমুনে যাচ্ছি।’ দুই ছেলে কীভাবে হানিমুনে যায়? বোঝেন কখন দুই ছেলে হানিমুনে যায়?”
এই আপত্তি পড়ে সত্যিই হতবুদ্ধিকর অবস্থায় বলে গেছি। কারণ সিনেমার প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে আপত্তি তোলা হচ্ছে। গল্পে দেখা যায়, এক মেয়েকে প্রপোজ করার জন্য ছেলেটি বিনা টিকিটে ট্রেনে উঠে পড়ে, আর যাবতীয় বুদ্ধি দেয় তার বন্ধু। মানে তাদের রিলেশন এমন ইঙ্গিত দেয় না।
আরেকটি আপত্তি হলো, “মাঝখানে এক দৃশ্যে মোশাররফ করিম ওই মহিলার স্বামীকে বলেন, ‘এইভাবে তাকাইলে লোকে মনে করবে আপনি আমার প্রেমে পড়ে গেছেন।’”
এছাড়া “ট্রেন যখন এক স্টেশনে থামে, তখন নায়িকা নেমে কথা বলছিলেন। তার গায়ে ছিল রংধনু রঙের ডিজাইনের একটি শাল।” আপত্তিকারীদের প্রশ্ন— “পৃথিবীতে হাজার হাজার রঙের শাল থাকতে ওইটিই কেন? এটা কি কাকতালীয়? না। ‘যাদের চোখ খোলা, তারা এসব দেখে।’”
আমি ইউটিউবে সিনেমার ট্রেলারটা দেখলাম আবার। ওই চাদরে অনেক কালার আছে বটে, কিন্তু সে সিম্বলের কথা বলা হচ্ছে, প্যাটার্নটা একদমই সেই রকম না। এখন সবকিছুতে যদি রংধনুর প্রতীক খুঁজতে যাই, তাহলে তো খোদ রংধনুকেই নিষিদ্ধ করতে হবে! পুরো সিনেমায় মোশাররফ করিমের যে উইটি ব্যবহার, তা মূলত তার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে আলাদা করে রাখা। আপনার-আমার কাছ থেকে পাশের মানুষটি যেভাবে নিজেকে আড়াল করে, তেমন। এ চরিত্রকে স্টাডি করার অনেক কিছু আছে। এমনকি এ সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় সংলাপটা মোশাররফ করিমের কণ্ঠে, যেখানে সে বলতেছিল জানাজা নামাজে কেন আজান থাকে না! হ্যাঁ, এ সংলাপে ভুল থাকতে পারে। বাট, মানুষের আবেগ এত কারেক্টনেস নিয়ে চলে না।

আর উইচহান্টিংয়ের মতো এ ধরনের প্রতীকী ব্যাখ্যা মাথায়ই আসে না— যদি না আপনি আগে থেকেই সেসব খুঁজতে থাকেন। বরং সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী কীভাবে কথা বলে, জীবনযাপন করে, তাদের মূল্যবোধ কী— সে সম্পর্কে ধারণা না থাকলে যেকোনো কিছুকেই এভাবে প্রতীকে পরিণত করা সম্ভব।
আরো গুরুতর বিষয় হলো, আমাদের এখানে যারা ধর্মের রক্ষক সেজে আছেন; এবং রাজনৈতিক দলগুলোও কিছু বিষয় নিয়ে কখনো কথা বলে না। আমরা কখনো তাদের মাদ্রাসায় সংঘটিত ‘যৌন নিপীড়ন’-এর ঘটনাগুলো নিয়ে সোচ্চার হতে দেখি না। যেখানে শত শত বাচ্চা ছেলে জীবনটা শুরু করে ট্রমার মধ্য দিয়ে।
চার.
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের মৌলভী চরিত্রটি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ হয়ে গেছে এক পোড়খাওয়া মধ্যবিত্ত মানুষ, যে জীবনের নানা আঘাতে ক্রমে কট্টর হয়ে উঠেছে। আশ্রয় নেয় ধর্মে, এটা তো বিরল ঘটনা না। স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় সে নারী ডাক্তার খোঁজে। উপন্যাসেরও অন্যতম কেন্দ্রীয় সংকটই এটি। সমাজে এমন সমস্যা যে নেই, তা তো নয়। শেষ পর্যন্ত এ লোক প্রয়োজনের কারণে কনভিন্স নয়। নানা কারণে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়।
কিন্তু ওই পোস্টে এটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে— “তারপর হচ্ছে ইসলাম কোপানো। কেন? কারণ ভারত ফেরত আনতে হলে ইসলাম কোপাতে হবে। উনি ইসলামিক মাইন্ডের, তাই মহিলা ডাক্তার খোঁজেন। উনার বউ বিপদে, তাও ছাড় নাই। ইসলাম এমন আদিম, নিষ্ঠুর, ব্যাকডেটেড— এই ন্যারেটিভ ঢুকানো হচ্ছে।”
সিম্বল, ন্যারেটিভ!
ধার্মিক হয়ে ওঠা ভদ্রলোক যখন কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে নিজের স্বল্প আয়ু আর স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেন, সেটিকেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে যে আমেরিকায় শিক্ষিত একজন মানুষের সামনে ধার্মিক ব্যক্তিকে ছোট করে দেখানো হয়েছে। মাটিতে বসা মানে ছোট হওয়া। মানুষ কীভাবে আবেগ প্রকাশ করে, ভেঙে পড়লে কী করে— এসব কি তারা কখনো দেখেনি?
আরেকটি অভিযোগ ছিল: “একেবারে শেষের দৃশ্যে লোকটা বলে, বৃষ্টিতে ভিজতে চায়, কিন্তু ঠান্ডা লাগলে নিজের দোষ দেবে না, বৃষ্টির দোষ দেবে। কেন? কারণ বৃষ্টি দেয় কে? আল্লাহ। তাইলে দোষ কার দিকে গেল? এইসব সূক্ষ্ম উপায়ে বিষ ঢোকানো হয়।”
কিন্তু সিনেমার সংলাপে কোথাও ‘আল্লাহ’র উল্লেখই নেই। বরং সেখানে মায়ের অবহেলার কারণে বৃষ্টিতে ভিজে তার ছোট বোনের মৃত্যুর ঘটনার প্রসঙ্গ আসে। ওই ট্র্যাজেডি তাকে প্রিয়জন হারানোর ট্রমার মধ্যে নিয়ে যায়, এখন তার মৃত্যুও সন্নিকটে।
এ জায়গায় আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাও মনে পড়ল। আমি বৃষ্টি খুব একটা পছন্দ করি না, কারণ কাদাপানি আমার অসহ্য লাগে। একবার আমার বোন বলল, এসব নিয়ে নাখোশ হতে নেই; আল্লাহ সবকিছুই কোনো না কোনো কারণেই দেন। বৃষ্টি তোর ভালো লাগে না, প্রকৃতির জন্য দরকারি।

যাই হোক, এমন আপত্তির মুখে মনে হচ্ছে আমাদের ভাষার ওপরও লাগাম দিতে হবে। কারণ যদি বলি, “মনে ভালো নেই”, “শরীর ভালো নেই” বা “দূর, ভালো লাগছে না”— তাহলেও হয়তো কোনো না কোনো ধর্ম অবমাননা খুঁজে পাওয়া যাবে!
এখানে আরেকটি আপত্তি এসেছে সিনেমার অর্থায়ন নিয়ে। বলা হয়েছে, সিনেমাটির ফান্ডিং ভারতীয়। আসলে বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং মূল দুটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশি। স্ট্রিমিং পার্টনার হিসেবে হইচই সহ-প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
ঘটনা হলো, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে গত এক দশকের হিসাবেই দেখা যাবে, ভারতীয় সংশ্লিষ্টতা এখন প্রায় ডালভাত হয়ে গেছে। লগ্নিই নয়, এর চেয়ে হয় অন্যান্য খাতে। এটা শুধু বিনিয়োগের প্রশ্ন নয়; সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরেই এমন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে গত ঈদুল ফিতরের সিনেমাগুলোর পরিস্থিতিও দেখা যেতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, এ বিষয়ে কেউ কি শিল্প সংস্কারের প্রস্তাব দেবেন, নাকি শুধু সিনেমাকে খারাপ জিনিস হিসেবে দেখেই সন্তুষ্ট থাকবেন? যদি তা না-ই হয়, তাহলে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে নিজেদের ভাবনাও তো শেয়ার করা যেতে পারে।
যাই হোক, তর্ক-বিতর্ক করা আমার কাজও নয়, খুব একটা পারিও না। তবে এই দুটি সিনেমা ঘিরে অভিজ্ঞতা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে— আমাদের সমাজে অন্যকে ততটা জানি না, বুঝিও না। বৃহত্তর পরিসরে একে অপরকে দেখার, বোঝার এবং জানার আগ্রহ আমাদের মধ্যে ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এই না বোঝা, না জানার ভেতর দিয়ে আমরা অন্যরে বদলাতে চাই, রুখে দিতে চাই। কীভাবে সম্ভব!
পাঁচ.
চলচ্চিত্রের এই অসহিষ্ণুতা আসলে আমাদের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বেরই প্রতিফলন। হাসিনা পালানোর পর আমরা দেখেছি মজলুম কীভাবে জালিমের সুরুত ধরছে, জালিম কীভাবে হয়ে উঠছে মজলুমের আদর্শ। এই প্রবণতা জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে করুণ পরিণতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।






