Select Page

… বিগত দশকেই প্রকৃত ‘মেগাস্টার’ ছিলেন শাকিব খান?

… বিগত দশকেই প্রকৃত ‘মেগাস্টার’ ছিলেন শাকিব খান?

শাকিব খানকে খেতাব দেওয়া হয়েছে —’মেগাস্টার’। ‘প্রিয়তমা’ ব্লকবাস্টার হওয়ার পর তার মুকুটে ‘মেগাস্টার’ নামক পালক জোটে। ‘প্রিয়তমা’ টিমের পরের ছবি ‘রাজকুমার’-এর পোস্টারে শাকিবের নামের আগে ‘মেগাস্টার’ শব্দটি বসানো হয়। তখন থেকেই মিডিয়াতে শাকিবের নামের আগে ‘মেগাস্টার’ শব্দটি যুক্ত করা হতে থাকে। তবে এই খেতাবের ব্যবহার তীব্র হয় ‘তুফান’ সুপারহিট হওয়ার পর। ‘তুফান’-এর প্রথম দুটি ফার্স্ট লুক পোস্টারে শাকিবের নামের আগে ‘সুপারস্টার’ বসানো হয়। ছবি রিলিজের আগে ‘রাজকুমার’-এর অনুসরণে ‘তুফান’-এর পোস্টারেও ‘মেগাস্টার’ ব্যবহৃত হয়। শাকিব তার খেতাবের সার্থকতা প্রমাণ করেন বক্স অফিসে ‘তুফান’ হিট করিয়ে। এরপর থেকে ‘মেগাস্টার’ রব শুরু হয়। ঢালিউডে শাকিব-অনুরাগীদের মুখে ‘মেগাস্টার’ শব্দটি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হতে থাকে। তার গুণকীর্তনে অংশ নিতে থাকেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা স্তরের মানুষ।

‘প্রিয়তমা’ ছবির মধ্য দিয়ে মাল্টিপ্লেক্সে শাকিবের বিজয়নিশান ওড়ানো শুরু হয়। ‘রাজকুমার’ ধারাবাহিকতা ধরে রাখে। আর ‘তুফান’-এ এসে একটা বিস্ফোরণ হয়। সমাজের উঁচুতলার দর্শকদের কাছে তথা উচ্চমূল্যে টিকেট-কেনা দর্শকদের কাছে শাকিবের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে হৈচৈ পড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত ট্রেন্ড হয়ে উঠতে থাকেন তিনি। দেশের সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে তার এক ধরনের স্বীকৃতি জুটে যায়। সোনাল চৌহানের মতো ভারতীয় নায়িকাদের সঙ্গে কাজ করে আরো বেশি মাইলেজ পেয়ে যান শাকিব। ‘দরদ’-এর প্রচারণায় ছবিটিকে ‘প্যান ইন্ডিয়া মুভি’ বলেও উল্লেখ করা হয়। যার অর্থ—শাকিব একজন সর্বভারতীয় তারকা! ভক্তরা তথা শাকিবিয়ানরা তাকে ‘গ্লোবাল স্টার’ বলতেও ছাড়েননি ওই সময়।

সর্বোপরি, এখন শাকিবকে যত বড় তারকা বলে দাবি করা হয়, ইন্ডাস্ট্রিতে তার যতটা প্রভাব দেখানো হয়, আসলেই কি তিনি অতটা প্রতিপত্তি রাখেন? নাকি তার স্টারডমকে এখন ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়? প্রকৃতই কি তিনি এখন ‘মেগাস্টার? নাকি ‘আগেই ভাল ছিলেন’? অর্থাৎ অতীতেই তার সুনাম, চাহিদা, প্রভাব বেশি ছিল? একযুগ আগেই কি শাকিব খাঁটি ‘মেগাস্টার’ হয়ে ওঠেননি? এখন তো কেবল আওয়াজ!

২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চিত্রনায়ক মান্নার মৃত্যু হয়। এরপর শাকিব প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন অবস্থার মধ্যে পড়ে যান। শুরু হয় তার জনপ্রিয়তার রথের যাত্রা। মান্না বেঁচে থাকতেই একের পর এক সুপারহিট ছবি দিয়ে গেছেন শাকিব। এক নম্বর নায়কের আসনও ছিনিয়ে নেন মান্নার কাছ থেকে। কিন্তু মান্না জীবিত থাকতে শাকিব চ্যালেঞ্জের মুখে ছিলেন। মান্না চলে যাওয়ার পর পুরো ইন্ডাস্ট্রি শাকিবের কাঁধে সওয়ার হয়। তার ছবি আগের মতোই হিট-সুপারহিট হতে থাকে। এরমধ্যে তার একটা ছবি ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’ ব্লকবাস্টার হয়ে যায়। চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ দাবি করেন, ছবিটি প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় করে। এরপর শাকিব একলাফে নিজের পারিশ্রমিক ৩৫ লাখ টাকায় নিয়ে যান। শাকিবকে তখন ‘কিং খান’ বলে ডাকা শুরু হয়।

২০০৮ সালে শাকিব অভিনীত ‘এক টাকার বউ’, ‘মনে প্রাণে আছ তুমি’, ‘আমার জান আমার প্রাণ’, ‘সন্তান আমার অহংকার’ সুপারহিট হয়। ওই বছর তার অভিনীত ১৪টি ছবি মুক্তি পায়। এই হারেই তখন তার ছবি মুক্তি পেত। ২০০৯ সালে তার অভিনীত ছবির সংখ্যা ১৭। এরমধ্যে ‘বলব কথা বাসর ঘরে’, ‘জান আমার জান’, ‘সাহেব নামে গোলাম’, ‘মায়ের হাতে বেহেশতের চাবি’ সুপারহিট হয়। শেষের ছবিটি প্রায় ১০০ সিনেমা হলে রিলিজ হয়। প্রিন্টের যুগে ১০০ সিনেমা হলে রিলিজ মানে প্রায় ১ কোটি টাকা শুধু ছবির প্রিন্টবাবদ খরচ। এবারের ঈদে শাকিবের ছবি ‘রকস্টার’ রিলিজ হয়েছে ১০০ সিনেমা হলে। প্রিন্টের কোনো খরচই নেই। প্রিন্টের টাকা এখন ছবির প্রডাকশনে ব্যয়িত হয়ে ছবির মান বাড়াতে সাহায্য করে।

২০০৯ সালের ঈদুল ফিতরে শাকিব অভিনীত ৫টি ছবি মুক্তি পায়। ২০০৮ সালের ঈদুল ফিতরেও মুক্তি পায় ৫টি ছবি। ২০০৭ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় ৪টি ছবি। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত— প্রতি ঈদে কমপক্ষে ৩টি ছবি মুক্তি পেত তার। কোভিডের আগে পর্যন্ত এই রেকর্ড শাকিবের অক্ষুন্ন ছিল।

২০০৮-০৯ সালের দিকে সিনেমা হলের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে ৮০০-তে নেমে আসে। যে ঈদে শাকিবের চার ছবি মুক্তি পেত, দেখা যেত তার নতুন মুক্তি পেয়েছে প্রায় ৩০০ সিনেমা হলে, আর তার পুরনো ছবি চলছে আরো ৩০০ সিনেমা হলে। বিশ্বের কোনো নায়ক বিশ্বসিনেমার ইতিহাসের কোনো পর্যায়ে এই রকম একচেটিয়াভাবে ইন্ডাস্ট্রি শাসন করতে পেরেছেন কি না আমাদের জানা নেই।

সেই সময় শাকিব বছরে ১০টি থেকে ১৫টি ছবিতে অভিনয় করতেন। একজন প্রযোজকের গড়ে একটি ছবি করতেন। ১০-১২ জন প্রযোজকের ছবি নিয়মিত করতেন। আবার প্রতি বছর একাধিক নতুন প্রযোজক তার ছবিতে বিনিয়োগ করতেন। তাকে কেন্দ্র করে ইন্ডাস্ট্রিতে পুঁজির প্রবাহ ছিল। আর তার পুরনো ছবির প্রযোজকরা তো পুরনো ছবি নিয়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সচল রেখেছিলেনই। তখন অগণিত সিনেমা হল তার ছবির ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

বিগত দশকে প্রতি বছর ৫০-৬০টি করে ছবি মুক্তি পেত। রিয়াজ, আমিন খান, কাজী মারুফ, ইমন, নীরবসহ আরও কয়েকজন নায়ক নিয়মিত ছবি করতেন। পরের দিকে আরিফিন শুভ, বাপ্পি চৌধুরী, সাইমন সাদিক, অনন্ত জলিলসহ একাধিক ভারতীয় নায়ক পর্দায় আসেন। প্রতিযোগিতা হলেও কেউই শাকিবের একক রাজত্বে চিড় ধরাতে পারেননি।

প্রতি বছরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবিটি থাকত শাকিবের। ২০০৬ সালে ‘চাচ্চু’, ২০০৭ সালে ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ২০০৮ সালে ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’, ২০১০ সালে ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’, ২০১১ সালে ‘তোর কারণে বেঁচে আছি’, ২০১২ সালে ‘খোদার পরে মা’, ২০১৩ সালে ‘মাই নেম ইজ খান’, ২০১৪ সালে ‘হিরো দ্য সুপারস্টার’, ২০১৬ সালে ‘শিকারী’, ২০১৭ সালে ‘নবাব’—প্রতি বছর শীর্ষ ব্যবসা সফল ছবিটি হত শাকিব অভিনীত। এই ভাবে শীর্ষ নায়কের মান তিনি ধরে রাখতেন।

এই একনায়ক-নির্ভরতাই ইন্ডাস্ট্রির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। একজন নায়কের পক্ষে যুগের পর যুগ ইন্ডাস্ট্রিকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। ফলে একসময় চলচ্চিত্র ব্যবসায় ভাটার টান দেখা দেয়। ধীরে ধীরে সিনেমা হল বন্ধ হতে থাকে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে ঝুলতে থাকে তালা। সেলুলয়েড যুগ শেষে ডিজিটাল যুগ এলে আজেবাজে ছবির জোয়ার ওঠে। মেধাহীন নির্মাতাদের আস্ফালনে ঢালিউডে দেখা দেয় খরা। কোভিড এসে সিনেমার কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেয়।

অন্ধকার থেকে প্রত্যাবর্তনের সূচনা হয় ২০২৩ সালে ‘প্রিয়তমা’ দিয়ে…। তাই ‘কিং খান’ খেতাব আর যথেষ্ট নয় শাকিবের জন্য। নতুন খেতাব ‘মেগাস্টার’-এ ভূষিত করা হয় তাকে। কিন্তু যদি আমরা ঢালিউডের সাম্প্রতিক বছরের ইতিহাস ঘাঁটি, তবে শাকিবকে এই খেতাবের উপযুক্ত অবস্থায় দেখতে পাই আরো এক যুগ আগে। তখন প্রায় প্রত্যেকটা উপজেলায় প্রেক্ষাগৃহ ছিল। সেখানে শাকিবের ছবি পৌঁছে যেত। মফস্বলে তার ছবি নিয়ে প্রদর্শকদের মধ্যে কাড়াকাড়ি হত। এখন দেশের প্রায় অর্ধেক জেলায় সিনেমা হলই নেই। সারা বছর ছবি চলে এমন সিনেমা হল পঞ্চাশটিও নেই। কেবল দুই ঈদে শ খানেক প্রেক্ষাগৃহ খোলে, দুই তিন সপ্তাহ ছবি চলে ফের বন্ধ হয়ে যায়। ছয়শ সিনেমা হলের নায়ক শাকিব এখন শয়ে নেমেছেন।

তবে শাকিবের নতুন বাজার হয়েছে মাল্টিপ্লেক্স। ‘শিকারী’ দিয়ে এই বাজার খুললেও বড় ধাক্কাটা দেয় ‘প্রিয়তমা’। বাংলা সিনেমার নতুন দিগন্ত খুলে যায়। খুলে যায় বিপুল ব্যবসার দুয়ার। দেশের বাইরেও এখন শাকিবের ছবি ভাল চলে। বৈদেশিক মুদ্রার এই খাত একসময় পুরো অচেনা ছিল শাকিবের জন্য। তবু তার পায়ের কোথায় কাঁটা ফুটছে সেটা বলি…।

গত কয়েক বছরে অভিনেতা হিসেবে শাকিব নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন সত্যি, ড্রেস-লুক-গ্ল্যামারে চমক জাগিয়েছেন ঠিকই, আবার একটানা পর্দায় নৃশংসতা ছড়ানোর জন্য সমালোচিতও হয়েছেন। একটার পর একটা নেতিবাচক চরিত্র রূপায়ণ করেছেন। তার ‘নায়ক’ ইমেজের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। পারিবারিক টানাহেঁচড়ায় ব্যক্তি ইমেজের ক্ষতিও কম হয়নি।

শাকিব এখন বছরে দুটোর বেশি ছবি করেন না। সেই ছবির বাজেট অনেক বেশি থাকে। তিনি পারিশ্রমিকও পান আকাশচুম্বী। কিন্তু ‘প্রিয়তমা’ রিলিজের পর গত তিন বছরে তার তিনটি বিশাল বাজেটের ছবি—’রাজকুমার’, ‘দরদ’ ও ‘প্রিন্স’ বক্স অফিসে চরম ভরাডুবির শিকার হয়েছে। ‘তাণ্ডব’ আহামরি ব্যবসা করতে পারেনি। চলমান ‘রকস্টার’ও প্রত্যাশামাফিক ব্যবসা করতে পারছে না। বছরের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবির দাবিদারও হয়তো তিনি হতে পারবেন না। সম্ভবত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ হতে চলেছে এই বছরের সর্বাধিক আয়কারী ছবি।

কোণঠাসা হতে-হতে শাকিব এখন দুই ঈদে আটকে গেছেন। গোটা ইন্ডাস্ট্রিই দুই ঈদের চক্করে ফেঁসে আছে। শাকিব কাদায় পড়ে যাওয়া সিনেমা শিল্পের চাকাকে রাস্তায় ওঠাতে পারছেন না। তাহলে শাকিবের এই ‘মেগাস্টার’ খেতাবের ফলাফল কী? বরং বিগত দশকেই কী তিনি প্রকৃত ‘মেগাস্টার’ ছিলেন না— যখন তিনি কাটপিসবিধ্বস্ত ঢালিউডকে কয়েক বছর একা হাতে ধরে রেখেছিলেন?


About The Author

মাহফুজুর রহমান

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক

Leave a reply