পাপেট-চিত্রশিল্পের গণ্ডি ছাপিয়ে নাটকেও উজ্জ্বল মুস্তাফা মনোয়ার
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে এমন বহুমাত্রিক মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যাঁরা একইসঙ্গে চিত্রশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, সংগীতজ্ঞ, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, প্রশাসক এবং পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে সমান স্বীকৃতি পেয়েছেন। একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গন হারাল এক বহুমাধ্যমের সৃজনশীল মানুষকে।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
চিত্রকলায় অসাধারণ সূচনা
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার শ্রীপুরে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। কবি গোলাম মোস্তফার কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। শৈশবের পড়াশোনা কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে, পরে নারায়ণগঞ্জে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত শিল্পের টানেই চলে যান কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর উৎসাহে চারুকলায় ভর্তি হওয়া মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৫৯ সালে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ছাত্রাবস্থাতেই গ্রাফিক্স, তেলরং ও জলরঙে একাধিক স্বর্ণপদক অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নিসার হোসেইনের মতে, তিনি চিত্রকলায় তুলনামূলক কম সময় দিলেও জলরং ও ড্রয়িংয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অন্যতম যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন।
১৯৬০ সালে জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে পাঁচ বছর পর নবযাত্রা শুরু হওয়া ঢাকা টেলিভিশনের আহ্বানে শিক্ষকতা ছেড়ে যোগ দেন টেলিভিশনে।
সেখানে তিনি কেবল অনুষ্ঠান নির্মাতা নন, বরং বাংলা সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম সংগঠক হয়ে ওঠেন। নতুন শিল্পী খুঁজে বের করতে চালু করেন নানা অনুষ্ঠান। তাঁর হাত ধরে তৈরি হয় অসংখ্য নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিশুতোষ আয়োজন।
নাট্যনির্দেশনায় অনন্য মুস্তাফা মনোয়ার
চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচিত হলেও নাট্যনির্দেশক হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং শেকসপিয়ারের দ্য টামিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’—এই দুটি টেলিভিশন নাটক বাংলাদেশের নাট্য ইতিহাসে ধ্রুপদি হিসেবে বিবেচিত হয়। সীমিত স্টুডিও ও স্বল্প প্রযুক্তির মধ্যেও তিনি যে নান্দনিক সেট নির্মাণ ও দৃশ্য পরিকল্পনা করেছিলেন, তা এখনও প্রশংসিত।

অভিনেতা রামেন্দু মজুমদারের ভাষায়, মুস্তাফা মনোয়ারের ছিল অসাধারণ সৃজনশীলতা ও প্রোগ্রাম সেন্স। তিনি এমন একটি দল গড়ে তুলেছিলেন, যারা মিলেমিশে অসাধারণ সব অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে পারত।
এই দুই নাটক পরবর্তীকালে যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশনের ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামার জন্যও মনোনীত হয়েছিল।
চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, একবার সত্যজিৎ রায় তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমাদের ঢাকা টেলিভিশনে একটা নাটক দেখেছিলাম, অসাধারণ! রক্তকরবী, কে করেছেন?” তারেক মাসুদ যখন জানান নাটকটি মুস্তাফা মনোয়ারের নির্মাণ, তখন সত্যজিৎ রায়ের মন্তব্য ছিল—”ওনার নাম শুনেছি, ভালো জলরঙে ছবি আঁকেন।”
সত্যজিৎ রায়ের এই প্রশংসার কথা শুনে মুস্তাফা মনোয়ার নাকি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “আমার তো নোবেল পাওয়া হয়ে গেছে।”
স্বাধীনতার প্রাক্কালে সাহসী সিদ্ধান্ত
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে টেলিভিশন সম্প্রচারের শেষে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের নিয়ম ছিল। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ার পরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠান রাত ১০টার পরিবর্তে মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করেন। ফলে দিন পরিবর্তনের পর সম্প্রচার শেষ হয় এবং ২৩ মার্চ পাকিস্তানের পতাকা আর দেখাতে হয়নি।
এরপর ২৫ মার্চের গণহত্যার পর তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতে চলে যান। সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতার পর ১৮ ডিসেম্বর দেশে ফিরে বাংলাদেশ টেলিভিশনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার কাজে নেতৃত্ব দেন। পাকিস্তান আমলে নিষিদ্ধ বা উপেক্ষিত রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও লোকসংগীতকে আবারও টেলিভিশনের মূলধারায় ফিরিয়ে আনেন।
শিশুদের অনুষ্ঠান ও ‘নতুন কুঁড়ি’
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-এর অন্যতম রূপকার ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। পাশাপাশি শিশুদের সহজে ছবি আঁকা শেখানোর অনুষ্ঠান এবং নান্দনিকতা বিকাশের বিভিন্ন পরিকল্পনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশে পাপেটের জনক
যদিও নাটক ও টেলিভিশনে তার অবদান বিশাল, তবু মুস্তাফা মনোয়ারকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করা হবে বাংলাদেশের আধুনিক পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে।
১৯৬৬ সালে টেলিভিশনে ‘আজব দেশে’অনুষ্ঠানের জন্য তিনি তৈরি করেন ‘বাঘা’ও ‘মেনি’নামের পাপেট চরিত্র। স্বাধীনতার পর সৃষ্টি করেন ‘পারুল’, যে চরিত্রের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে শিল্পবোধ ও নান্দনিকতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। অনেকের মতে, পরবর্তীকালের জনপ্রিয় ‘মীনা’চরিত্রের ভাবনায়ও এই ‘পারুল’-এর প্রভাব রয়েছে।
দ্বিতীয় সাফ গেমসের ‘মিশুক’, ষষ্ঠ সাফ গেমসের ‘অদম্য’, একাদশ সাফ গেমসের ‘কুটুম’—সবগুলোর নকশা ও পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল তাঁর নাম।
দীর্ঘদিনের সহকর্মী কামাল আহসান বিপুল বলেন, পাপেট নিয়ে মুস্তাফা মনোয়ারের আবেগ ছিল অসীম। মাঝরাতেও নতুন কোনো ধারণা মাথায় এলে তিনি নিজেই ওয়ার্কশপে গিয়ে পাপেট তৈরিতে নেমে পড়তেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, “পাপেটের মধ্যেই সব শিল্পকলার সমন্বয় আছে।“
বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
চিত্রশিল্প, সংগীত, নাটক, টেলিভিশন, পাপেট—এসবের বাইরেও শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি), জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
একসময় হিজ মাস্টার্স ভয়েসের সংগীত প্রতিযোগিতায় সেরা গায়কও নির্বাচিত হয়েছিলেন। নাটকে নির্দেশনার পাশাপাশি সংগীত ও নৃত্য পরিচালনাও করেছেন সমান দক্ষতায়।
শিল্পের মধ্যেই অমর
ধানমন্ডির নিজের বাড়ির ছোট্ট পাপেট ওয়ার্কশপেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নতুন নতুন পাপেট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন মুস্তাফা মনোয়ার।
চিত্রকলা, টেলিভিশন নাটক, শিশুদের অনুষ্ঠান কিংবা পাপেট—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্পী, তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্র এবং তাঁর নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিই আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁকে জীবন্ত করে রাখবে।
বিবিসি বাংলা ও প্রথম আলো অবলম্বনে






