সিনেমায় নামমাত্র, সমিতি পুরোপুরি: এফডিসিতে পদের জোর, বড় পর্দায় কোথায় তারা?
উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ২০২৬-২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন সম্প্রতি শেষ হয়েছে । সভাপতি পদে খল-অভিনেতা শিবা শানু এবং সাধারণ সম্পাদক পদে জয় চৌধুরী বিজয়ী হয়ে সমিতির মসনদে বসেছেন।

কিন্তু এই জাঁকজমকপূর্ণ নির্বাচন আর পদের লড়াইয়ের আড়ালে যে প্রশ্নটি বারবার ঘুরেফিরে আসছে তা হলো—সিনেমার পর্দায় তাদের উপস্থিতি কতটুকু? প্রথম সারির তারকা তো দূর, বর্তমান ঢালিউডের মূল ধারার সিনেমায় নিয়মিত শিল্পী হিসেবেও তাদের খুঁজে পাওয়া ভার।
নেতৃত্বের চেয়ারে বসা এই কমিটির অভিনেতাদের সর্বশেষ সিনেমার খোঁজখবর নিলেই স্পষ্ট হয়ে যায়—তারা এখন সিনেমায় যতটা নামমাত্র, সমিতিতে ততটাই পুরোপুরি।
🎬 সিনেমার খেরোখাতা: কার কী খবর?
শিবা শানু (সভাপতি): চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন ধরে খলনায়কের সহযোগী বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি। ২০২৩ সালে ব্লকবাস্টার হিট সিনেমা ‘প্রিয়তমা’-তে শাকিব খানের বড় ভাইয়ের চরিত্রে একটি ছোট ক্যামিও ভূমিকায় তাকে দেখা গিয়েছিল। তবে একই বছরে ‘ওরা ৭ জন’-এর পার্শ্ব চরিত্র ছিল তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ। সম্প্রতি তার অভিনীত ‘ময়নার চর’ সিনেমাটির নাম শোনা গেলেও মূল ধারার বড় প্রজেক্টে কিংবা প্রথম সারির খলনায়ক হিসেবে তার নিয়মিত উপস্থিতি এখন আর নেই বললেই চলে।
জয় চৌধুরী (সাধারণ সম্পাদক): দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কোনো হিট সিনেমা দিতে না পারা জয় চৌধুরীর সর্বশেষ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের ‘প্রেম প্রীতির বন্ধন’ এবং ২০২৪ সালের ‘ট্র্যাপ: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’। ২০২৫ সালে ‘আমার শেষ কথা’ নামে তার একটি সিনেমা এলেও হল সংকটের এই যুগে প্রেক্ষাগৃহে বা দর্শকের মনে কোনোটিই তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। ফলে রুপালি পর্দার চেয়ে এফডিসির সাংগঠনিক রাজনীতিতেই তিনি এখন বেশি পরিচিত মুখ।
ডি এ তায়েব ও ইলিয়াস কোবরা (সহসভাপতি): ঢাকাই সিনেমার এক সময়ের ব্যস্ত ভিলেন ইলিয়াস কোবরা এখন সিনেমা থেকে প্রায় পুরোপুরি নির্বাসিত। অন্যদিকে ছোট পর্দা থেকে এসে বড় পর্দায় খাতা খোলা ডি এ তায়েব ২০২৬ সালের মে মাসে ‘অফিসার’ নামের একটি অ্যাকশন থ্রিলার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তবে মাহি ও মিশা সওদাগরের মতো তারকারা ছিলেন বি গ্রেডের সিনেমাটির পরিচিত মুখ।
অন্যান্য সম্পাদকীয় পদ ও সদস্যবৃন্দ: সহসাধারণ সম্পাদক সুব্রত, সাংগঠনিক সম্পাদক সনি রহমান কিংবা কার্যনির্বাহী সদস্য কাবিলা, আলী রাজ, নাসরিন, চিকন আলীদের নাম এখন আর নতুন সিনেমার কোনো ক্রেডিট লাইনে প্রধান চরিত্রে দেখা যায় না। কাবিলা কিংবা আলী রাজের মতো জ্যেষ্ঠ অভিনেতারা বয়স ও ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত। অন্যদিকে চিকন আলী কিংবা জেসমিনের মতো শিল্পীরা অভিনয়ের চেয়ে এফডিসির নানা ভাইরাল ভিডিও আর নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচারণাতেই ইদানীং বেশি সরব।

নির্বাচন ঘিরে কাদা ছোড়াছুড়ি ও অশ্লীল সিনেমার ক্ষত
বিএফডিসির নির্বাচন ও সাংগঠনিক রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে বড় যে সমালোচনাটি উঠছে, তা হলো নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ এবং ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকের তথাকথিত ‘অশ্লীল যুগের’ কাটপিস সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অতি-সক্রিয় অংশগ্রহণ ও আধিপত্য। এদের অভ্যন্তরীণ কাদা ছোড়াছুড়ি, ব্যক্তিগত আক্রমণ আর সস্তা ঝগড়াঝাঁটিতে দেখা যায় বেশি। সামান্য পদ কিংবা প্যানেল কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বে একে অপরকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করা, টকশো বা ক্যামেরার সামনে কান্নাকাটি কিংবা একে অপরের অতীত রেকর্ড নিয়ে নোংরামি করা যেন এদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সাধারণ দর্শক যেখানে সিনেমা হলে গিয়ে ভালো ছবি দেখতে চান, সেখানে শিল্পী সমিতির এই মুখচেনা মানুষদের পর্দায় কোনো ব্যস্ততা না থাকলেও এফডিসির মূল ফটক থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া পর্যন্ত তাদের এই ঝগড়া ও নোংরা কোন্দলের নাটক পুরো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির ভাবমূর্তিকে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত করছে।
এসব ঘটনায় উসককানিদাতার ভূমিকায় আছেন এক শ্রেণির সাংবাদিক ও ইউটিউবাররা। তারা অশ্লীল সিনেমার অভিনেতাদের বড় আকারে প্রচার করছে।
🔍 পর্দা বনাম পদ: যেখানে বাস্তবতা থমকে আছে
নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, ৫৭৩ জন ভোটারের মধ্যে ৪৮০ জন ভোট দিয়ে এই কমিটিকে নির্বাচিত করেছেন। আরমান-মুক্তি পরিষদকে হারিয়ে ব্যালটের লড়াইয়ে তারা বিজয়ী ঠিকই, কিন্তু সিনেমার বাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কিংবা দর্শক টানার ক্ষমতা এখন তলানিতে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে: শিল্পী সমিতি চলচ্চিত্রের উন্নয়নের চেয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দলাদলি আর উৎসব নিয়ে যতটা ব্যস্ত থাকে, সেই তুলনায় বর্তমান কমিটির নেতাদের কেউই ইন্ডাস্ট্রির মূল চালিকাশক্তি নন। যেখানে শাকিব খান কিংবা এই প্রজন্মের প্রথম সারির নায়কদের একেকটি সিনেমা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে, সেখানে শিল্পী সমিতির শীর্ষ পদগুলো দখল করে আছেন এমন সব মানুষেরা—যাদের শেষ সিনেমা কবে মুক্তি পেয়েছে কিংবা আদৌ সুপারহিট হয়েছে কি না, তা সাধারণ দর্শক মনেও করতে পারবে না।”
বিএফডিসি প্রাঙ্গণে প্রতি দুই বছর পর পর যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, সেই একই রকম উদ্দীপনা যদি এই নেতারা দেশের সিনেমা হলগুলোর জন্য দেখাতে পারতেন, তবে হয়তো ঢালিউডের চিত্রটা আজ অন্য রকম হতো। কিন্তু নির্বাচিতদের অতীত ট্র্যাক রেকর্ড বলে, সে ধরনের সক্ষমতাও তাদের নেই। আপাতত বড় পর্দায় না থাকলেও, আগামী দুই বছর এফডিসির চেয়ারে বসেই তারা নিজেদের লাইমলাইট ধরে রাখবেন—এটাই এখনকার বাস্তবতা।






