এখানে রাজনৈতিক আলাপ কতটা জরুরি
বাংলাদেশের টি-স্টল, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কিংবা ধর্মীয় স্থাপনাগুলোয় প্রায়ই লেখা থাকে ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ’। কিন্তু রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ রাখার এ চিন্তা আমাদের সমাজে রয়ে-সয়ে রাজনৈতিক ঝামেলামুক্ত থাকার অভিপ্রায় থেকে তৈরি সেটা নিজেও আরেকটি রাজনৈতিক ঘটনা। দিনশেষে রাজনীতি যে মানুষের জীবনেরই অংশ, প্রতিটি মানুষই রাজনৈতিক সত্তা— সে ধারণাটুকুকে সামনে নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি‘। মিউজিশিয়ান হিসেবে পরিচিত আহমেদ হাসান সানি পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেয়েছে ১৬ জানুয়ারি।

নেদারল্যান্ডস প্রবাসী বাংলাদেশি চাকরিজীবী নূর দেশে এসেছে ছুটিতে, ক’টা দিন পরেই আবার চলে যাবে। এর আগে বের হয়ে পড়ে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে। সেই কুয়াকাটার এক বিস্তীর্ণ দ্বীপে, যেখানে নূরের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত হওয়া ছোট ভাই মুক্ত তার ডকুমেন্টারির এন্ডিং সিনের শ্যুটিং করার কথা ভেবেছিল। পথিমধ্যে দেখা হয় ফরেস্ট অফিসার আজাদের, বাসে যেতে যেতে বৃটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে দেশভাগ নিয়ে বোঝাপড়াগুলো শেয়ার করতে থাকেন তিনি। সেখান থেকে ঘটনাচক্রে নূরের ঠাঁই হয় সত্য দাস নামক একজন শিক্ষিত ফিশারম্যানের বাড়িতে। সেখানে সমুদ্র উপকূলীয় কোলাহলময় এক রাতে সত্য ও ঘটনাচক্রে উপস্থিত হওয়া আজাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আর তার পরবর্তী রাজনৈতিক নানা উত্থান-পতনের গল্প শুনতে থাকে নূর৷ এরই মধ্য দিয়ে উঠে আসে ২০২৪ সাল অবধি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা। এ ধারাবাহিকতা নূরকে নতুন এক পথ দেখায়। যে পথ একজন মানুষকে নাগরিক হিসেবে যে পলিটিক্যালি কনসার্ন হয়ে উঠা জরুরি সেই শিক্ষা দেয়।
খালিদ মাহবুব তূর্য, মোতাসিম বিল্লাহ আদিত্য এবং আহমেদ হাসান সানি রচিত এ গল্পের পলিটিক্যাল ইন্টেনসিটি চমৎকার। গোটা গল্পটাকেই আমরা একজন দর্শকের জায়গা থেকে দেখতে পাই, যেখানে গোগ্রাসে বাংলা অঞ্চলের একের পর এক রাজনৈতিক ঢেউয়ের গল্প গিলতে থাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র নূর। দর্শকের জায়গা থেকেই সিনেমার স্ক্রিনপ্লে’কে তাই অনেকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি করাও যায়।
আদিত্যের তৈরি স্ক্রিনপ্লে’কে যদি সংক্ষেপে আলোকপাত করতে হয় তবে Confused, Monotonous and Too Way Longই বলতে হবে। সিনেমার প্রথমার্ধের অংশ লিনিয়ারই বলা চলে। এখানে দুটো বড় অংশ আছে। দুটোই ওয়ান টু ওয়ান কনভারসেশন। প্রথমটিতে কুয়াকাটাগামী আজাদের সাথে কনভারসেশন চলে নূরের। যাত্রাপথে আজাদ দেশভাগের ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে দেশভাগকে মূলত নেহরু আর জিন্নাহর দ্বন্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যদিও ফাতিমা জিন্নাহ তার আত্মজীবনীতে ভাই জিন্নাহর অসুস্থতার কথা নেহেরু আগে জানলেও এ দেশভাহ হতো না উল্লেখ করেছেন। তার চেয়েও যেটা বড় ফ্যাক্ট তা হলো দেশভাগ ছিলো সে সময়কার বাস্তবতা। সেক্ষেত্রে বৃটিশদের ভাগ করো, শাসন করো নীতির প্রতিফলন এখানে আসেনি। ইতিহাসের পরতে পরতে এসব ফ্যাক্টকে তুলে ধরার চেয়েও এখানে চিত্রনাট্যকার লিনিয়ার ইতিহাসের ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন।

‘অর্থনীতি এমন এক নীতি যা রাজনীতিরও নীতি বদলায় ফেলে’— এমন উক্তি দিয়ে দেশভাগকে ব্যাখ্যা করাটা দুরুহ। কলকাতার এলিট বাঙালিরা এদেশের অংশ হতে চান নাই, এই ব্যাপারটাও যেমন সত্য তেমনই দুই বাংলা এক থাকতে চাইলে যে কলকাতা না ঢাকা— এ দ্বান্ধিক বাইনারিও যে তৈরি হতো সেই কথাও সত্য। কিন্তু গল্পে সেসব উঠে আসেনি। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের মানুষদের নিম্নবর্ণের মুসলমান ভাবতো— এ ধারণা আমরা এই সিনেমাই নতুনভাবে পাই। কিন্তু বর্গীয় মুসলমান সমস্যার চেয়েও পাকিস্তানি শোষণের মূল সমস্যা যে ছিলো জাতীয়তাবাদী (ভাষা আন্দোলন থেকে উদ্ভুত) সমস্যা (যে সমস্যায় পাকিস্তান এখনো ভুগছে) সে ধারণা এখানটায় পাওয়া যায় না।
‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’র চিত্রনাট্যে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ও পজেটিভ ব্যাপার ছিলো ইতিহাসের বড় বড় ইভেন্ট এবং সে ইভেন্টকেন্দ্রিক আমাদের এখানে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন পূর্ব বাংলা সংগ্রাম পরিষদ) জার্নিকে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও এর বিশাল অংশজুড়ে আমাদের ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো অনুপস্থিত, কিন্তু যে কেউই সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে ভালো ধারণা পাবে।
নূরের সঙ্গে আলাপের পরের অংশজুড়ে থাকে সত্য দাস। তার সঙ্গে কনভারসেশনের ক্ষেত্রে ইতিহাসে আবার ইভেন্টের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায় রাজনৈতিক নেতারা। বিশেষ করে ৭১ পূর্বাপর সময়ের নেতাদের বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে এ কনভারসেশন। সেখানে গোলাহাট ট্র্যাজেডি আসে, (কিন্তু আমরা ট্রেন টু পাকিস্তানের গল্প পাই না), মুক্তিযুদ্ধের মতো বড় একটি অংশকে কেবল শেখ মুজিবুর রহমান আর মাওলানা ভাসানীর বাইনারিতে অল্পে হাজির হতে দেখি। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রে আবার সত্য তার এই ইতিহাসের পাঠদানের ক্ষেত্রে কনক্লুসন টানেন ‘শোনা কথা’ মর্মে। সিনেমার নাম যদিও ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’, কিন্তু ‘মুক্তিযুদ্ধে ইন্ডিয়ার চাওয়া কী ছিলো এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ না’ ডায়ালগ সেখানে আছে। যেন এটা রাজনৈতিক ঘটনা নয়। আবার, সেনাশাসক জিয়াকে একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও আরেক সেনাশাসক এরশাদকে দেখানো হয়েছে খলনায়ক হিসেবে। সেটার আবার ভ্যালিডিটি তৈরি করা হয়েছে ‘শোনা কথা’ হিসেবে। অথচ, চলচ্চিত্রের যে ভাষা তাতে ‘শোনা কথা’ ইটসেলফ একটি স্বতন্ত্র ভিত্তি তৈরি করে দেয় ন্যারেটিভের।
যা বলছিলাম, সিনেমার প্রথম অর্ধেক প্রচন্ড ধীরগতির, তাত্ত্বিক সংলাপে ভরপুর। শুধুই কনভারসেশন এবং এ কনভারসেশন ছাড়াও সিনেমা চলতে পারতো। প্রায় এক ঘন্টা দৈর্ঘ্যের প্রথমার্ধ আমার-আপনার জানা ইতিহাসকেই রিভিশন দেয়, বোঝাপড়ায় নতুন কোনো মেদ যুক্ত করে না। কিন্তু পরের অর্ধেক সময়টায় জুলাই আন্দোলন, তার প্রেক্ষাপট, জুলাইয়ের সময়কার প্রতিনিধিত্ব ও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটকে একত্র করাটা প্রশংসার দাবীদার। সেই সাথে দুজন ভিন্ন মানুষের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে জুলাই অভ্যুত্থানকে দেখানোর ভেতর দিয়ে জুলাইয়ের যে আর্থসামাজিক বাস্তবতা এখানে প্রতিফলিত হয় তা প্রশংসার দাবীদার। যদিও সেখানটায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভুল রিপ্রেজেন্টেশন, জুলাইয়ের নারীদের ভূমিকা উঠে না আসা, জুলাই টাইমলাইনের ধারাবাহিকতা না থাকাটা বারবার জুলাই অভ্যুত্থান সম্পৃক্ত যে কাউকেই বিব্রত করবে। যেমন শহীদ মিনারে সমাবেশের দিনের সংবাদে আবু সাইদের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হওয়ার খবর প্রকাশের মতো বড় কিছু প্লটহোল আছে। সেসবের পরেও এ অংশটুকু উৎরে যাবে যথাযথভাবে গল্প এগিয়ে নিয়ে যেতে পারায়।
তবে এ ভুলগুলো আমাদের ফিল্মমেকারদেরও যে অনেকবেশি রাজনৈতিক আলাপ করা জরুরি তা মনে করিয়ে দিবে। পুরো সিনেমায় সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট ছিলো মুক্তের ডকুমেন্টারির জন্য নেয়া মানুষের অভিমতগুলো। গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্নে মানুষদের তব্দা খাওয়া বা গুমের সঙ্গে স্বাধীন সাংবাদিকতা ব্যাহত হওয়ার যে যোগসাজশ সেটাকে আলোকপাত করাটাই ফিল্মমেকার হিসেবে আহমেদ হাসান সানির একটা বড় অ্যাক্টিভিজম।

সিনেমার মূল চরিত্র নূর। অভিনয় করেছেন ইমতিয়াজ বর্ষণ। চরিত্রটি মিলেনিয়াল ও জেন জি প্রজন্মের মাঝামাঝি থাকা থাকে। এ ধরনের চরিত্রের সঙ্গে বর্ষণ মিশে যেতে পারেন, সহজেই দখলে নিতে পারেন স্ক্রিনটাইমের পুরো অংশটুকু। সিনেমায় বর্ষণ তথা নূর একজন ট্রাভেলার। তার জার্নি একই সাথে রাজনীতির সড়কে, ইতিহাসের সড়কে; এবং অবশ্যই বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতির ধারক হিসেবে। বর্ষণ সেদিক থেকে সাবলীল অভিনয় উপহার দিয়েছেন। কিন্তু চিত্রনাট্যে কারিশমার ঘাটতি নূর চরিত্রের প্রতি যথাযথ বিচার করতে পারেনি। নূর যে জেনারেশনের হয়ে রাজনীতির নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে সে জেনারেশন ফোনে অভ্যস্ত শোনার চেয়েও। তার চেয়েও বেশি অভ্যস্ত ডিনায়াল ও ফ্যাক্টকে কোশ্চেন করার মধ্য দিয়ে কনভারসেশনকে এগিয়ে নিতে। নূরকে আমরা সেরকম কোনো অ্যাপেয়ারেন্সে পাই না। আজাদের কথার পর কথা বা সত্যর নিজের মুখের কথাতেই ইতিহাস তৈরি করার চেষ্টার ভেতরেও নূর প্রশ্ন করতে জানেন না। অথচ, রাজনৈতিক ‘আলাপ’ এর কথা বলা হচ্ছে আমাদের।
মানসি চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন কেয়া আল জান্নাহ। মানসি চরিত্রটির সাথে অ্যাপেয়ারেন্স পাওয়ারফুল না। স্ক্রিনটাইমও কম। এর ভেতরও নিজের ভালোটা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সিনেমায় সে অর্থে কোনো নারী ক্যারেক্টারই নেই। অনেকটা আসন্ন সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সংখ্যার মতনই। কিংবা জুলাই আন্দোলনের নারীদের আড়াল করে দেয়ার মতন।
সত্য দাস একজন উচ্চশিক্ষিত জেলে। নিজের যাপিত জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি অনেকটাই বিপ্লবী রূপ ধারণ করেছেন। এ বিপ্লবী বেশে আমরা আজাদ আবুল কালামকে দেখি। একদিকে ভীষণ বাজে ডায়ালগ ডেলিভারি, অন্যদিকে চলিত কিংবা আঞ্চলিক, কোন ভাষারীতিতে এ রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাস কৃষক নিজের ডায়ালগ ডেলিভারি দিবেন তার দোটানা তাকে প্রায় আড়ষ্ট করে রাখে। বরঞ্চ তার চেয়েও বড় ক্যারেক্টার হয়ে উঠে কৃষক আন্দোলন।
ফরেস্ট অফিসার আজাদ চরিত্রে একে আজাদ সেতুর অভিনয়েও বিশেষ কিছু দেয়ার ছিলো না। যেটুকু অংশ ছিল তাতে মনে হয়েছে এই ক্যারেক্টারের চেয়েও ডায়ালগ বেশ ভারী।
মুক্ত চরিত্রটি নজর কেড়েছে। অভিনয় করেছেন তানভীর অপূ্র্ব, সিনেমার বড় অংশজুড়ে নিজের স্পেসটুকু কাজে লাগিয়েছে তিনি। কখনো চোখের নড়াচড়ায় কিংবা কখনো পিন পয়েন্ট ডায়ালগ ডেলিভারি দিয়ে ক্যারেক্টারকে ওন করতে পেরেছেন পুরোটাই।
‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’তে নজর কাড়বে মনোজ্ঞ সিনেমাটোগ্রাফি। আবু রায়হানের ক্যামেরায় ড্রোন শটে বন কিংবা সাগর, সন্ধ্যার বিভিন্ন ফ্রেমিং, নানা অ্যাঙ্গেল থেকে কনভারসেশনকে ক্যামেরাবন্দি করার চেষ্টা চোখে পড়বে। সাগরের ঢেউ বা সবুজ প্রান্তরে একা নূরের দৌড়ানো, শেষ দৃশ্যে শহীদ মিনারের ক্রেন শট মানানসই বটে। মাস্টারশটগুলোয় একই সঙ্গে প্রত্যেকটা চরিত্রকে স্পেস দেওয়াটাও ইতিবাচকই। তবে কিছু বি রোলে ফোকাস নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও বা রয়েছে লাইটিংয়ের তারতম্য। আলোর রেফারেন্সের বিপরীতে ফ্রেম নিয়ে অনেকগুলো শট নষ্টই করেছে বলা যায়।
সিনেমার ইনডোর লাইটিংগুলো মনোরম। কিন্তু আউটডোরজুড়েই লাইটিংয়ের প্রচুর সমস্যা চোখে পড়েছে। পারিপার্শ্বিক আলোর তারতম্য ঘটেছে সিন টু সিন সিনক্রোনাইজেশনে; অনেক সময় মেঘলা আকাশের সঙ্গে আবার রোদের শট জুড়ে দেয়া হয়েছে, নৌকা থেকে নামার আগের লাইটিং আর পরের লাইটিংয়ে বিশাল পার্থক্য দেখা গেছে।
ইমামুল বাকের অ্যাপোলো এডিটর হিসেবে ছিলেন ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’তে। সিনেমার সম্পাদনা বেশি খাপছাড়া। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রচুর স্টক ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু ছোট ছোট ডিউরেশনের ফুটেজগুলো দর্শককে ধারণা দিতে পারে না যে ঠিক কী হচ্ছে এখানটায়। ফলে শুটিংয়ের ফুটেজের সঙ্গে একটা খাপছাড়া ব্যাপার তৈরি হয়। সিনেমায় সময়ের ক্রোনোলজিও মেইন্টেইন করা যায়নি। যেমন সন্ধ্যাবেলায় নূর আর মুক্তর কবর জেয়ারতের পরের সিনেই দেখা যাচ্ছে ফোন কল পেয়ে ছুটে যাওয়া মুক্তর আন্দোলন চলছে দিনের বেলায়। এ ধরনের বড়সড় ভুল সিনেমার মেরিটোক্রেসিকেই নষ্ট করে। তবে ডকুমেন্টারি স্টাইলে ভিডিও প্রেজেন্টেশন, আন্দোলনের বিভিন্ন শট যেসব শুট করা হয়েছে সেসবে উল্লেখযোগ্য কিছু সম্পাদনাগত পারদর্শীতা দেখা যায়। দ্বীপের রাতের বেলার শটগুলোয়ও আমরা কনভারসেশনগুলোকে যতটুকু সম্ভব দর্শকগ্রাহী করার প্রচেষ্টা দেখি।
কালারিস্ট জহির রায়হান ডার্কিশ গ্রিটি টোনে হাই কন্ট্রাস্ট কালার থিম ব্যবহার করেছেন। এটা এ ধরনের কাজে নতুন এক্সপেরিমেন্ট। তবে এক্সপেরিমেন্টটা বড় স্ক্রিনে ফিল গুড ভাইব দিয়েছে মনে হয়।
‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’তে মিউজিক ডিরেকশন দিয়েছেন রুসলান রেহমান। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর করেছেন অভিষেক ভট্টাচার্য। সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর অত্যন্ত পাওয়ারফুল। সাসপেন্স তৈরিতে নতুনত্ব পাওয়া গেছে। ছিলো স্যাড টিউনে একধরনের মেলানকলি তৈরির প্রচেষ্টাও। ‘আমার এমন দুঃখ দেবে যদি’ গানটি গেয়েছেন আহমেদ হাসান সানি। এটি একটি চমৎকার গান। তবে সিনেমায় ঠিকঠাক ব্লেন্ড করা যায়নি।
ওভারঅল সাউন্ডও ভালো। একটি চওড়া ধাঁচের ব্যালেন্সড ইকো সাউন্ড পাওয়া গেছে সিনেমাজুড়ে। কিন্তু মিক্সিংয়ের ক্ষেত্রে ফলির কিছু গলদ বা হঠাৎ হঠাৎ নানা প্রাণীর ডাক/সমুদ্রের গর্জনের উপস্থিতি, সেটাও আবার ডায়ালগে প্রাসঙ্গিকতা আনার পরেই আসাটা বেশ বেখাপ্পা দেখায়। তবে আন্দোলনের অংশের সাউন্ড ডিজাইন চমৎকার।
‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’র কারিগরি যত ত্রুটি, কিংবা যত ধরনের গল্পের ফ্লস অর মনোটনি তার বেশিরভাগই প্রথম অর্ধেক অংশে। ওই অর্ধেক অংশের গোটা সময়জুড়েই এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাস শেখানোর চেষ্টা দেখা গেছে। কিন্তু এ লেসনগুলো সামগ্রিকতার ছোট অংশকেই ধারণ করে। ফলে এই সিনেমাকে রাজনৈতিক সিনেমা বলা গেলেও রাজনৈতিক ইতিহাসের রেফারেন্স বলা যায় না। দ্বিতীয়ত, সিনেমার প্রথম অংশ ছাড়াই দ্বিতীয় অংশ আলাদাভাবে একটা গল্প হতে পারতো। তবে নির্মাতার যে ৪৭-৭১-৯০-২৪’ কে একসঙ্গে গাঁথার প্রচেষ্টা তাতে হয়তো ভাটা পড়তো এতে। তবে এই প্রচেষ্টাটুকুকেও সাধুবাদ জানানো জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের রাজনৈতিক বোধ নিয়ে সিনেমাটি নতুন করে ভাবাতে উদ্বুদ্ধ করে। রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসের সামনে আমাদের নতুন করে দাঁড় করিয়ে দেয়। আর মনে করিয়ে দেয়, একসময় বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিক আন্দোলনগুলোর ধারাবাহিকতায়ই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাস্তায় নেমেছিলো, সেই রাস্তায় নামাটাও একটা পলিটিক্যাল ঘটনা। এই পলিটিক্যাল ঘটনা আমাদের নতুন আশা দেখায়, যে আশায় নেদারল্যান্ডস প্রবাসী নূরও দেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এ সময়ে এসে জুলাই আন্দোলনের যে মবোক্রেটিক কনক্লুসন আর নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কুক্ষিগত করার যে বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে তাতে এই আশা দর্শকদের কতটুকুই বা উদ্বুদ্ধ করবে আমরা জানি না।
But we know, ‘Hope is a good thing, maybe the best thing and no good things ever dies’.






