Select Page

দুঃখ-কষ্টের অনবদ্য সিনেমা ‘নিঃস্বার্থ’

দুঃখ-কষ্টের অনবদ্য সিনেমা ‘নিঃস্বার্থ’

দুনিয়ার বুকে কিছু মানুষের ঋণ কখনোই শোধ হবার নয়, আবার কিছু মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে কখনোই কেউ সুখের গালিচায় শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। বাবা-মা এবং যে মানুষটি আপনাকে সারাটি জীবন নিজের চাইতে বেশি ভালোবেসে গেলো তাদের কষ্ট দিবেন আর আপনি পাড় পেয়ে যাবেন এমনটা কখনো হয়নি এবং ভবিষ্যৎ এও হবে না। এমনই কিছু দুঃখ-কষ্ট দিয়ে মোড়ানো এক গল্প ‘নিঃস্বার্থ’।

রিভিউ শুরু করবার আগেই বলে নিচ্ছি,’যদি আপনার বাংলা সিনেমায় এলার্জি থাকে কিংবা রংচটা পোষ্টার অথবা রংচটা ভিডিও চিত্রে অতিমাত্রায় এলার্জি থাকে তাহলে প্লিজ আপনারা লেখার এই পর্যন্তই পড়েই চলে যান, আল্লাহ্‌ হাফেজ। তারপরেও যদি অতিমাত্রায় কুলনেস দেখানোর জন্য হা হা রিএক্ট দিতে ইচ্ছুক থাকেন, তবে আসুন হাহা রিএক্ট দিয়ে নিজেকে কুল প্রমাণ করে যান। যাই হোক রিভিউতে চলে যাই, কেমন লেগেছিলো কিংবা এখনো কেমন লাগে সেটাই বলছি।
.
বয়োজ্যেষ্ঠ অনেকের কাছেই শুনেছি জসিম সাহেবের ছবি চলাকালীন সময় নাকি এমন অনেক দোকানদার ছিলো যারা দোকান বন্ধ করে জসিম সাহেবের সিনেমা দেখতে হলে চলে যেতেন। অবাক হবার কিছু নেই সেই সময়টায় এই লোকটা যেভাবে বাংলা সিনেমাকে নিজের প্রাণ মনে করে আগলে রেখেছিলেন তা আপনি বুঝতে পারবেন শুধুমাত্র তাঁর অভিনীত ‘কাজের বেটি রহিমা’ দেখেই। সত্যি কথা বলতে কি এখনকার বাংলা সিনেমার জন্য চলচ্চিত্র পাড়ার কলাকুশলীবৃন্দের সেই ভালোবাসাটাই নেই!

পরিচালনা এবং বাদবাকি

বাংলাদেশের পরিচালকবৃন্দদের পরিচালিত সিনেমার তালিকা করা হলে সবার শীর্ষে থাকবেন ঝন্টু সাহেব। এখন অবধি প্রায় ৭৫টি সিনেমা নির্মাণ করেছেন তিনি, বাংলাদেশের আর কোনো পরিচালক এতো সিনেমা বানান নি। ঝন্টু সাহেব মৌলিক গল্পে নিয়ে সিনেমা বানানোর জন্য বিভিন্ন সময় সকলের নিকট প্রশংসিত হয়েছেন। ‘নিঃস্বার্থ’ সিনেমাটিও একটি মৌলিক গল্পের সিনেমা। এই ফিল্মের গল্প,ডায়লগ,পরিচালনা তিনিই করেছিলেন। মজার বিষয় এই ফিল্মের আবহসঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তারই সহোদর ‘আনোয়ার জাহান ঝন্টু’। দর্শক সব সময় চায় গল্পের সাথে যেনো ফিল্মের বিভিন্ন শট গুলোর মিল থাকে। এবং অপ্রাসঙ্গিক শট কিংবা হুট করেই চলে আসা সংগীত গুলো দর্শকের মাঝে বেশ বিরক্তি ঘটায় যা তখনকার দর্শক কেনো এখনকার দর্শকরাও পছন্দ করেন না। যদিও ভুল ভাল সংগীত জুড়ে দেওয়ার একটা ট্রেন্ড বর্তমানে তৈরি হয়েছে। আবার এগুলো নিয়ে কথা বললে এখনকার পরিচালকরা বলে বসেন সমালোচকদের হাতে নির্মাতারা জিম্মি! যাই হোক জোকস আ পার্ট! ঝন্টু সাহেবের রুচি নিয়ে আমি আলাদা করে বলবোই বলবো। কেননা গল্পের সাথে মিল রেখে গল্পের চরিত্র গুলোকে অভিনেতা,অভিনেত্রীদের মাঝে যে সুন্দর করে বিতরণ করেছেন তা দেখেও আমাদের বর্তমানের পরিচালকদের কিছুটা শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। এখন তো একটা ধরে এনে বসিয়ে দিলেই হয়ে যায়! যা অবস্থা চলছে! দাঁত কামড়ে কথা বলা লোকটাও আজকাল রোমান্টিক হিরো হয়ে যায়! এতো কিছুর পরেও আর্টিস্টের ভার্সেটিলিটির একটা ব্যাপার থেকেই যায়, যা বের করে আনে পরিচালক মহদয়রা। ঝন্টু সাহেব এই ফিল্মে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিটি চরিত্রকে, এমনকি বাসার কাজের লোকটাকে দিয়েও একটা চড় মারিয়ে নিয়েছেন যাতে দর্শক মনে রাখেন! কিন্তু দেখেন আজকাল অনেক পরিচালক বিনাকারণে কতো আর্টিস্টদের হুদাই দাড় করিয়ে বা বসিয়ে রাখেন! শিক্ষা শিক্ষা শিক্ষা! হ্যা এখান থেকেও শেখার আছে। যদিও তখনকার সময় এখনকার মতো এইসব এফেক্স ফেফেক্স ছিলো না! তবে ছিলো গল্পে প্রাণ, ছিলো গল্পকে উপস্থাপন করার জন্য বিচক্ষণ পরিচালনা শক্তি। এই ফিল্মের আরো একটি ভালো দিক এর লোকেশন। গল্পের দুস্থ সময় গুলোতে যে দুটো বাড়ি দেখানো হয়, তা একই বাড়ি হলেও খুব দারুণভাবেই দেখানো হয়েছে যাতে কেউ না বুঝতে না পারে। আমি অনেক আগে বিটিভিতে খুব স্বচ্ছ ভাবে কালার টেলিভিশনে দেখার কারণে এটাও বুঝতে পেরে ছিলাম ফিল্মের কালার গ্রেডিং বেশ মানসম্মত। যদিও এখন ভালো রেজুলেশন পাবেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। এছাড়া ফিল্মের আবহসঙ্গীত বেশ মানানসই লেগেছে। সব মিলিয়ে মাস্টারপিস পরিচালনা, মাস্টারপিস কাজ।

অভিনয়সংক্ষেপ

আসলে এখানে যারা অভিনয় করেছেন তারা বাংলা সিনেমার একেকটা নক্ষত্র। এদের কাছে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকলেও কম হয়ে যাবে। তারপরেও এখান থেকে কয়েকজনের কথা আলাদাভাবে বলা অবশ্যই জরুরি।

➡রওশন আরা রেণু রোজিনা
খুব বেশি সময় স্ক্রিনটাইম না পেলেও যতোক্ষণ ছিলেন ততোক্ষণ সাধ্য মতো নিজ দ্যুতি ছড়িয়ে ছিলেন। তবে উনার মেকআপটা আরো একটু কম হলে ভালো হতো, যদিও তখকার স্ক্রীনের সাথে বেশ মানিয়ে নেওয়ার মতো। অভিনয়ে একদম পাক্কা, একজন ধোপানী হিসেবেই তাকে এই ফিল্মে দেখা যাবে। এমন আরো বিভিন্ন রোলেই তাকে দেখা গিয়েছে, নিঃসন্দেহে বলা যায় তিনি একজন পাক্কা ভার্সেটাইল এক্ট্রেস ছিলেন। তিনি দু’বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন।

➡মিঠুন,মানস,অমিত হাসান
নেগেটিভ রোলে এই তিনজন পুরো সিনেমা জুড়ে কাঁপিয়েছেন। বিশেষ করে মিঠুন এবং মানস কে তো আপনার মারতেই ইচ্ছা হবে। চ্যালেঞ্জিং রোল গুলোর মাঝে বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে এরা ছিলেন এবং পুরো পয়সা উসুল কাজ উপহার দিয়েছিলেন।

➡আনোয়ারা জামাল
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে মা চরিত্রে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ অভিনেত্রী কাজ করেছেন কিন্তু মিসেস আনোয়ারা ম্যাডামের মতো এতো দারুণ অভিনয় দক্ষতা আমি আর কারো মাঝে পাই নি। উনার অভিনয় দেখে যেকোনো মানুষের চোখ বেয়ে জল নেমে আসবে। ভাবা যায় আজ অবধি তিনি আটবার দেশ সেরা পুরস্কার ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ পেয়েছেন। আমি বলবো আপনি শুধু এই ফিল্মে উনার এক্সপ্রেশন দেখবেন আর ভাববেন আগে আমাদের সিনেমা কতো সমৃদ্ধশালী ছিলো। আমি এখনকার জেনারেশনকে বলবো আপনারা শুধু উনার অভিনীত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এবং ‘ডুমুরের ফুল’ দেখুন! বাকি সিনেমা গুলো আপনি নিজেই খুঁজে নিজ দায়িত্বে দেখবেন।

➡আবদুল খায়ের জসীম উদ্দিন
বাংলা চলচ্চিত্রের অ্যাকশন গুরু মানা হয় জনাব জসীমকে। কিন্তু মজার বিষয় উনার ছিলো না সিক্সপ্যাক ছিলো না ১৭ ইঞ্চি বাইসেপ! কিন্তু তাঁর অ্যাকশন দৃশ্যের সময় দর্শক চিৎকার করে জানিয়ে দিতেন হলে জসীমের পাঁচ কেজি ওজনের ঘুষি চলছে। এই কথা শুনে আবার তথাকথিত নাম না বলা নায়কের ফ্যানরা ছুটে আইসেন না এবং বইলেন না তাহলে দেখেন সে কি জন্য ভুঁড়ি কমায় না। যাই হোক অ্যাকশনের জন্য দরকার কৌশন এবং এক্সপ্রেশন, যার গুরু ছিলেন জসীম স্যার। একজন মানসম্মত অভিনয় শিল্পী ছিলেন আমাদের জসীম স্যার। সে কখনো হয়েছেন এলাকার ডন, কখনোও বা রক্ত হিম করা ডাকু, আবার কখনো বা আদরের ভাই তাও শাবানার মতো অভিনেত্রীর বিপরীতে, আবার কখনোও বা রিক্সা চালক কিংবা ঠেলাগাড়ি চালক। এই ফিল্মে তার যে আবেগময় ডায়লগ, দরাজ কন্ঠের প্রতিবাদী ডায়লগ আহা মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। সবশেষে ফিল্মের ফুল প্যাকেজের মধ্যে এক্সট্রা ডিসকাউন্ট হিসেবেই জসীম স্যারের দেখা মিলবে।

✅অনেক কথা বললাম আরো একটু বলি, আপনি সিনেমা বানাচ্ছেন কাদের জন্য? অবশ্যই দর্শকদের জন্য? এখন এদেরই যদি পাত্তা না দেন তাহলে কি হয় বলুন! সিনেমা ভালো না খারাপ সেটা নিয়ে কথা বলার অধিকার শুধুমাত্র দর্শকেরই আছে। আগের সিনেমা মুক্তির পরে এমনকি সব সময় দর্শকদের যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হতো কেনো জানি মনে হয় এখনকার সময়ে এটা করাই হয় না। সিনেমা শিল্পের আজকের এই দশার আরো একটি উল্লেখযোগ্য কারণ দর্শকদের প্রতি উদাসীনতা 🙂 সবশেষে একটা কথাই বলবো বাংলা সিনেমাকে দর্শক ভালোবাসবে কিন্তু আপনাদেরও উচিৎ দর্শককে ভালোবাসা। একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন এই জসীম সাহেব দর্শকদের জন্য কি করতেন। তিনি যেমন বাংলা সিনেমাকে নিজের প্রাণ হিসেবে দেখতেন তেমনি দর্শকদেরকে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হিসেবেই দেখতেন।

এক নজরে “নিঃস্বার্থ”
পরিচালকঃ  দেলোয়ার জাহান ঝন্টু
রচয়িতাঃ      দেলোয়ার জাহান ঝন্টু
শ্রেষ্ঠাংশেঃ    রোজিনা,জসীম,আনোয়ারা,আনোয়ার হোসেন,মিঠুন,মানস,অমিত হাসান,জাম্বু,অরুনা বিশ্বাস আরো অনেকে।
ধরণঃ           ড্রামা,অ্যাকশ্যান,ট্রেজেডি
মিউজিকঃ    আনোয়ার জাহান ঝন্টু
ব্যাপ্তিকালঃ  ১৩৪ মিনিট
মুক্তিসালঃ    ৯০ দশক।
দেশঃ            বাংলাদেশ
ভাষাঃ           বাংলা
ব্যক্তিগত মতামতঃ ৯.০/১০


মন্তব্য করুন