Select Page

নোলক : গল্পহীন-চিত্রনাট্যহীন সুন্দর ছবি!

নোলক : গল্পহীন-চিত্রনাট্যহীন সুন্দর ছবি!

(স্পয়লারসহ রিভিউ)

একটা সময় ছিল আমরা বাংলা সিনেমাপ্রেমীরা আফসোস করতাম এই বলে যে, বলিউডের ছবিগুলো দেখতে কত সুন্দর! ঝকঝকে সুন্দর ছবিতে সুন্দর সব সেট, লোকেশন, কস্টিউম, প্রপস্‌ আর সাথে সুন্দর নায়ক-নায়িকা আর গানতো আছেই। আমাদের ছবিগুলো কেন এমন হয় না?!!

অর্থাৎ নানা টেকনোলজিক্যাল সীমাবদ্ধতা আমাদের ছবিগুলোকে মানহীন, শ্রীহীন করে ফেলতো।
গত কয়েক বছর ধরে বাংলা ছবির এই দিকটায় একটু একটু করে পরিবর্তন হয়েছে। এখনো মনে আছে, ”ছুঁয়ে দিলে মন” এর মত গতানুগতিক ছবিও আমরা এপ্রিশিয়েট করেছিলাম একটু ঝকঝকে সুন্দর ছবি কিংবা কিছুটা আধুনিক উপস্থাপনার কারনে। পরবর্তীতে ”আয়নাবাজী”, ”ঢাকা এটাক”, ”পোড়ামন ২” কিংবা যৌথ প্রযোজনার ছবিগুলো বাংলা সিনেমাকে টেকনোলজিক্যাল দিক থেকে অনেকটাই উপরে নিয়ে গেছে। এখন আর টেকনোলজিক্যাল দিক নিয়ে আমরা এতো বেশী আদিখেত্যা দেখাই না। যেহেতু একটা লেভেল পর্যন্ত বাংলা সিনেমা পৌছে গেছে সেহেতু আর এ বিষয়ে আদিখেত্যা না দেখানোটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু নোলক যেন এই দিক থেকে আরো এক ধাপ এগিয়ে। অর্থাৎ বলিউডের সুন্দর সেট, লোকেশন, কস্টিউম, প্রপস্‌, সুন্দর নায়ক-নায়িকা, সুন্দর লাইট এবং রঙ মিলে পর্দায় যে সুন্দর একটা ছবি দর্শকরা উপভোগ করতো এক সময় নোলক বাংলা সিনেমার দর্শকদের জন্য নিজেদের বাজেট সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেরকম সুন্দর কিছু একটা দেয়ার চেষ্টা করেছে। বলিউড অবশ্য এদিক থেকে এখন আরো কয়েক ধাপ এগিয়েছে, তবে বাংলাদেশী সিনেমার জন্য ”নোলক” এ বিষয়ে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।

নোলকের লোকেশন এবং সেট দেখতে যেমন ভাল তেমনি এর সিনেমাটোগ্রাফীও বেশ ভাল। ছবির নায়ক-নায়িকার লুক, কস্টিউম খুবই সুন্দর। সাথে সুন্দর সম্পাদনা, বিশেষ করে কালার এবং বিএফএক্স বাংলাদেশী সিনেমা বিবেচনায় বেশ ভাল হওয়ায় ছবির প্রোডাকশন ভ্যালু বেড়ে গেছে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ছবির গল্প এবং চিত্রনাট্যে। ফেরারী ফরহাদ এই প্রথম সিনেমার জন্য গল্প এবং চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি তার গল্প এবং চিত্রনাট্য একেবারে কিছুই হয়নি। আমার মনে হয় একটা দুধের শিশুও এর চেয়ে ভাল গল্প বানাতে পারে।
এমন গল্প নিয়ে কেউ আমার কাছে এসে যদি বলতো এটা নিয়ে সিনেমা বানাবে আমি হাসতে হাসতে তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। এও সম্ভব! এমন গল্প নিয়ে কেউ সিনেমা বানানোর কথাও ভাবে!

কিন্তু নতুন প্রযোজক সাকিব সনেট শুধু এই ছবি বানাতে রাজিই হয়নি বরং এমন বড় আয়োজনে এটা বানিয়েছে দেখে আমার সত্যিই তার জন্য মন খারাপ হয়েছে। একটা ভাল গল্প এবং চিত্রনাট্য পেলে লোকটা বাংলা সিনেমার অন্যতম সেরা প্রযোজক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।
ওমর সানী- মৌসুমীর জঘন্য হাস্যকর কিছু দৃশ্য বাদে পুরো ছবি অত্যন্ত যত্নের সাথে সুন্দর ভাবে বানানো হয়েছে। ছবি দেখে বার বার মনে হয়েছে, আহা্‌ এমন ছবি কেন আমরা নিয়মিত পাই না!

যদিও ছবির গল্প বলে যা আছে তাকে গল্প বলাটাও হাস্যকর, তবু গল্পকার যা বলতে চেয়েছেন তা অনেকটা এরকম – শাকিব খান এবং ববি জমিদার পরিবারের দুই সন্তান। তাদের বাবারা দুই ভাই এবং তাদের এতো বেশী টাকা পয়সা যে টাকা কোথায় খরচ করবে সে চিন্তায় তাদের ঘুম হয় না। তাদের দুই ছেলেমেয়ে সারা গ্রাম চষে বেড়ায় আর মানুষের ফলটা, মুরগিটা, ডাবটা চুরি করে খায়। বাবারা তাতে খুশি, কারন এই উছিলায় তারা কিছু টাকা খরচ করতে পারে কেননা সেই চুরি করা জিনিষের দাম তারা দ্বিগুন, তিনগুন কিংবা বহুগুনে পরিশোধ করে দেয়। গ্রামের লোকজনও খুশি কারন তাদের জিনিষ চুরি হলেই বরং লাভ হয়।

এই পর্যন্ত শুনে যারা মনে করছেন এটা হাস্যকর গল্প তাদের জন্য বলছি, এইটুকু গল্প তাও খারাপ ছিল না। কিন্তু ছবি সামনে যত এগিয়েছে ছবির গল্প ততো হাস্যকর, অযৌক্তিক এবং অর্থহীন হয়েছে। বিশেষ করে বিরতির পর যখন হঠাৎ দুই জমিদার ভাই (যাদের মধ্যে গলায় গলায় ভাব) সিদ্ধান্ত নেয় তারা একজন আরেকজনের নামে মামলা করবে। এই মামলা মামলা খেলায় তাদের টাকাও খরচ হবে আবার সময়ও কাটবে (এমন লেইম গল্প আমি আমার ইহজীবনে এই প্রথম শুনলাম) এরপর কি কি হয় তা না হয় হলে গিয়েই দেখুন। তবে এইটুকু বলতে পারি খুব সুন্দর একটা এন্ডিং থাকার পরও এই গল্প একেবারেই গ্রহনযোগ্যতা পায় না, কারন এন্ডিং পর্যন্ত যেতে হলে আগে গল্পের গাঁথুনিটাতো থাকতে হবে। হাস্যকর গল্পের সাথে হযবরল চিত্রনাট্য মিলে যা তৈরী হয় তা কোন অবস্থাতেই কনভিন্সিং না।

ফেরারী ফরহাদ অবশ্য ডায়লগ মোটামুটি ভাল লিখেছেন। কিছু কিছু ডায়লগ রেগুলার বাংলা ছবির থেকে ভিন্ন এবং উন্নত। তবে সেখানেও তিনি পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। একটা ডায়লগ বেশ লাগে তো আরেকটা খুব লেইম। তবে ছবির গানগুলো কথায় এবং সূরে মোটামুটি ভাল। গানের চিত্রায়নও ভাল।

ছবিতে অভিনয় কেমন ছিল এই বিষয়ে বেশী কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। এতো সুন্দর একটা ছবিকে মন খুলে প্রশংসা করতে পারছি না বলে নিজেরই খারাপ লাগছে। তবু নিয়ম মাফিক বললে, শাকিব খান এবং ববিকে লুকে, কস্টিউমে দারুণ লেগেছে। তাদেরকে এতো সুন্দর খুব কম ছবিতেই লেগেছে। অভিনয়ে আসলে খুব বেশী কিছু করার ছিল না। ছবির যে গল্প বা যে টোন তাতে তারা ঠিকঠাক। একটু টেনে টেনে কথা বলার একটা ব্যাপার বানিজ্যিক ছবিতে থাকে এইটুকু সয়ে নিলে তারা উপভোগ্য অভিনয়ই করেছে। যদিও এমন চরিত্রে অল্প বয়সী নায়ক-নায়িকা নিলে হয়তো আরো বেশী উপভোগ করা যেত। তবু ফেস ভ্যালু একটা বিষয়তো বটেই। সে হিসেবে তাদের দুজনকে ভালই লেগেছে।
অন্য যারা অভিনয় করেছে সবাই ঠিকঠাক তবে মৌসুমী আর ওমর সানী এমন ফালতু চরিত্রে এমন হাস্যকর অভিনয় করেছে যে এতো সুন্দর ছবির মধ্যে কয়েকটি ”বকওয়াজ” দৃশ্য যেন কোথা থেকে এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকটা হারবালের বিজ্ঞাপনের মত। সুন্দর একটা ছবি দেখছি হঠাৎ হারবালের বিজ্ঞাপন নিয়ে হাজির রোবট টাইপের মডেলরা। ওমর সানী, মৌসুমীও রোবটের মত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞাপনের মত ডায়লগ বলে গেছে। কি বলেছে, কেন বলেছে একমাত্র তারাই ভাল জানে, তবে সৌভাগ্যের বিষয় এই যে তারা মাত্র ২-৩ টা দৃশ্যেই দর্শকদের বিরক্ত করার সূযোগ পেয়েছে। এর বেশী দৃশ্য পেলে ছবির সৌন্দর্য পুরোটাই নষ্ট হতো এদের দুইজনের কারনে। কেন এরা এ ধরনের চরিত্র আর অভিনয় করে বুঝি না। এর চেয়ে অবসর নিলে আগের সম্মানটুকু ধরে রাখতে পারতো। যাইহোক, এটা বিষয় না। এরা ছবির কোন গুরুত্বপূর্ন চরিত্র না তাই ঐ ২-৩ টা দৃশ্যে এসে ছবির ১২ টা বাজাতে পারেনি।

তবে ছবির ১২ টা বাজিয়েছে ফেরারী ফরহাদের গল্প আর চিত্রনাট্য।

তবু একজন দর্শক এবং সমালোচক হিসেবে নোলক আমার কাছে স্পেশ্যাল। গল্প থাকুক আর নাই থাকুক সুন্দর সুন্দর দৃশ্য, সেট, লোকেশন, কস্টিউম, লাইট, কালার, সিনেমাটোগ্রাফী, সুন্দর সুন্দর নায়ক-নায়িকা, নাচ-গান পেলে আমি সিনেমা হলে ভাল সময় কাটাই। নোলকে গল্প ছাড়া বাকি সবই কম-বেশী আছে। তাই আমার কাছে নোলক বেশ ভাল লেগেছে। আমার মনে হয় যারা গল্পের কথা না ভেবে সুন্দর একটা ছবি দেখতে ভালবাসেন তাদের নোলক ভাল লাগবে। সিনেপ্লেক্স- এর ফ্যামিলি বা ক্লাস অডিয়েন্স ছবিটা বেশ উপভোগ করেছে। কিন্তু সাধারণ দর্শক, যারা মূলত একটা গল্প দেখতে বা একই সিনেমায় নানা মাসালার স্বাদ পেতে সিনেমা হলে যান তাদের এ ছবি ভাল নাও লাগতে পারে।

আমি হৃদয়ে পাথর চাঁপা দিয়ে নিজের সততার প্রতি শতভাগ সৎ থেকে এই গল্পহীন সুন্দর ছবিটিকে দিচ্ছি ৩* (৬০% মার্কস্‌ বা গ্রেড A-)

**ছবির গল্পটা নূন্যতম কনভিন্সিং হলে আরো অনেক বেশী রেটিং দিতাম। কারন ছবি আমার সত্যিই ভাল লেগেছে। আমি চাই সিনেমাপ্রেমীরা সবাই এই ছবি দেখুক। এতো সুন্দর আয়োজন কেবলমাত্র গল্পের কারনে ব্যর্থ হবে ভাবতেও আমার খারাপ লাগছে। এই ছবি হিট হলে আমি সত্যিই আনন্দিত হবো। এবং মনে প্রানে চাই এমন একটা ছবি যেন অবশ্যই হিট হয়।


অামাদের সুপারিশ

মন্তব্য করুন

ই-বুক ডাউনলোড করুন

BMDb ebook 2017

স্পটলাইট

Saltamami 2018 20 upcomming films of 2019
Coming Soon
বাংলা সিনেমা ২০১৯ সালে কেমন যাবে?
বাংলা সিনেমা ২০১৯ সালে কেমন যাবে?
বাংলা সিনেমা ২০১৯ সালে কেমন যাবে?

[wordpress_social_login]

Shares