Select Page

বৈচিত্র্য, ভীতি ও বাছাই: বনলতা এক্সপ্রেসের নির্মাণ-রাজনীতি

বৈচিত্র্য, ভীতি ও বাছাই: বনলতা এক্সপ্রেসের নির্মাণ-রাজনীতি

গল্প বলিয়ে হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের ‘সাধারণ’ কিছু ভঙ্গি আছে, লেখনির তুলনামূলক গুণ বিচারে যা ‘অসাধারণ’। তার একই গল্পে ভিন্ন ভাবনা-রুচি অল্প কথায়-অভিব্যক্তিতে নিজ বৈশিষ্ট্যসহ জায়গা করে নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তারা, মানে গল্পের চরিত্ররা কাছাকাছি ধরনের দার্শনিকতায় আক্রান্ত থাকেন; যেন পরস্পরকে প্রভাবিত করেন। হয়তো পাঠক ও দর্শকরাও খানিকটা হন; নইলে জাদুকর হিসেবে লেখকের কাজ কী! এটা হয়তো এমন কিছু— যেখানে মানুষে মানুষে ফারাক যাকে প্রায়ই আমরা উদযাপন করি, তার বদলে তারা কোথায় একই রকম থাকে তাকেই সামনে নিয়ে আসা। ‘কিছুক্ষণ’ সেই ধারার একটা উপন্যাস। হয়তো সেই সময়টাই ‘কিছুক্ষণ’, যখন এ বিরল যুথতা আমাদের চোখে ধরা পড়া বা ধরতে পারার মতো অবসর থাকে। ছোটখাটো উপন্যাসটা প্রকাশের পর পরই পড়েছিলাম। অনেক বছর আগে। হুমায়ূন আহমেদই তো মারা গেছেন ১৪ বছর আগে।

উপন্যাস বা সিনেমার পুরো গল্প একটা ট্রেন ভ্রমণে সীমাবদ্ধ। কিন্তু গল্পের মানুষগুলো তো ট্রেনেই সীমাবদ্ধ নয়, তাদের ব্যাক স্টোরিও থাকে। আবার ট্রেনই তেমন এক চিড়িয়াখানা, সেখানে চোর থেকে মন্ত্রী, ম্যাজিসিয়ান থেকে গায়ক; সবাইকে জায়গা করে দেয়া যায়। এমন একটা উপন্যাসকে সিনেমা বানানোর জন্য বেছে নেয়াটা প্রশংসার মতো ঘটনা। একটা সিনেমায় সারাক্ষণ ট্রেন দেখানো কঠিন; কিন্তু পুরোপুরি যে কঠিন না, তার উদাহরণ তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। দর্শককে বিরক্ত না করার মতো চিত্রনাট্যের পাশাপাশি সুন্দর সিনেমাটোগ্রাফি, মিউজিক সর্বোপরি সুন্দর ভিজ্যুয়াল এ সিনেমাকে ‘যথার্থ’ হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

যেহেতু দীর্ঘ সময় আগে পড়েছিলাম,  তাই অনেক কিছু স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। ‘কিছুক্ষণ’-এ আমার কাছে স্মরণযোগ্য চরিত্র ছিল মৌলভী চরিত্র। তার একটা সংলাপে খুবই মজা পেয়েছিলাম। সন্তানের লিঙ্গপরিচয় সংক্রান্ত। উপন্যাসের বোল্ড সেই সংলাপকে মনে হয়েছিল, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার একটা সমালোচনা। তানিম নূর ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ ওই চরিত্রের লেবাস ও পরিচয় ছেটে ফেলেছেন। আর সেই মজার ডায়ালগটা নাই। যারা এসব কিছু না জেনে বা উপন্যাসের ওই অংশ গুরুত্ব না দিয়ে সিনেমাটি দেখে থাকবেন তাদের কাছে বিষয়টাতে ঊনিশ-বিশ কিছু হইছে বলে মনে হবে না। তানিম নূর যে সিনেমাটা বানাইতে চাইছেন সেটা এনগেজিং কি-না বা দর্শককে ধরে রাখতে পারছেন কি-না সেটাই মূল বিষয়।

তবে ওই চরিত্রটা পাল্টে ফেলাকে সহজ সিদ্ধান্ত মনে হয় নাই আমার কাছে। কারণ এ উপন্যাসের মূল কাঠামোই হলো বৈচিত্র্য। আর বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাস-সিনেমা বা নাটকে ধর্মীয় চরিত্রগুলোর যে অবস্থা; তাতে হুমায়ূন খানিকটা ব্যতিক্রম। ধর্মকে ছেটে ফেলায় জায়গায় থাকেন না; যদিও সেটা আমাদের জন্য সুবিধাজনক চরিত্র আকারেই হাজির থাকেন। এখন সিনেমা বানাতে গিয়ে তানিম নূর সেই চরিত্রটি ছেটে ফেললেন। আমরা ধারণা, ওই চরিত্র বিষয়ে নির্মাতা-লেখকদের মাঝে ভীতিও কাজ করতে পারে। সেটা নানান কারণে অমূলকও নয়। সাম্প্রতিক দশকে বাংলাদেশে মাজার-বাউল বা ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত যে বিষয়গুলো দেখেছি, তার প্রতিক্রিয়া হতে পারে এই চরিত্র বাছাই। এবং একই কারণে এ ট্রেনের মধ্যে বৈচিত্র্যের একটা খামতি ও আরো বৃহৎ পরিসরে বাংলাদেশে দেখা হলো না।

সিনেমা হিসেবে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর সাফল্য ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে বিশেষ ঘটনা। এ ধরনের নির্মাণকে ‘মিডল সিনেমা’ বলার একটা চল ছিল বলে শুনেছি। যেটা প্রচলিত ফর্মুলা ও আর্টহাউজ সিনেমার মাঝামাঝি থাকে। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বাংলাদেশ সেই ধারাকে মেইনস্ট্রিম করল, ‘উৎসব’-এর মতো আর এক্সপেরিমেন্টাল নয়। বাণিজ্যিক পরিসরে নির্মাতারা নানা ধরনের নীরিক্ষা করবেন, এটা স্বাভাবিক; সেখানে বাংলাদেশের রুগ্ন ইন্ডাস্ট্রিতে সাফল্য বড় ঘটনাই। ২০২২ সালে মুক্তি পায় মেজবাউর রহমান সুমন পরিচারিত ‘হাওয়া’, এ সিনেমাকেও সেই পরিসরে রাখছি। একই সঙ্গে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর সাফল্য মাল্টিপ্লেক্স কালচার ও বিশেষ শ্রেণীর দর্শকের উত্থান দেখিয়ে দিচ্ছে। যেটা আমাদের ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে নতুন কালচারাল আইডেন্টিটির সঙ্গে বোঝাপড়া করবে তারও একটা পরীক্ষাক্ষেত্র। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই পরিচয়সূচক অধ্যায়ে তানিম নূরের আশ্রয় নস্টালজিয়া ও পরিবারিক সংস্কৃতি।

এমন কিছু কি কল্পনা করা যায়। তানিম নূর ‘কিছুক্ষণ’ থেকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নির্মাণ করলেন। হুমায়ূন আহমেদের নাম গোপন রাখলেন। আর সেই সিনেমার চরিত্রগুলো হুমায়ূনীয় ঢংয়ে কথা বলছে না। তাহলে কেমন হতো? আমার ধারণা, সেখানেও তানিম নূর সফল হতেন। কিন্তু এখন যা ঘটল, হুমায়ূন আহমেদকে সামনে রেখে তার গল্পকে কীভাবে ইন্টারপ্রেট করা যায়, তানিম ও তার লেখকরা সেই কসরত করলেন। তা বেশ ভালো, ভিজ্যুয়ালি হুমায়ূন তর্জমার নতুন পথ খুলে দিল। এবং হুমায়ূন আহমেদকে আমরা কত তরিকায় আবিষ্কার করতে পারি তার উদাহরণ হয়ে থাকবে।

কিছু ক্ষেত্রে হুমায়ূনীয় আবহ ধরে রাখা, বিশেষ করে শেষ দিকে হুমায়ূনের বিখ্যাত দুই চরিত্রের ক্যামিও বাড়াবাড়িই মনে হয়েছে। নতুন বয়ান নির্মাণের পাশাপাশি হুমায়ূনকে নানাভাবে অনুকরণের লোভ তানিম নূর সামলাতে পারতেন। অন্য একটা সমালোচনাও করা যায়। দর্শকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার লোভ। এমনিতেই পুরো গল্প ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে মধ্যবিত্ত-কল্পিত বা লেখকরা তাদের যেভাবে কল্পনা করতে শিখিয়েছেন তারই রিপ্রেজেন্টশন। দেখবেন এ সিনেমায় গরিব মানুষ তেমন নাই, এক চোখ ছাড়া। সেখানে আলাদা করে এলআরবির বিখ্যাত ‘বাংলাদেশ’ গানটা (শুনতে বেশ ভালো লাগলেও) জোর করে চাপিয়ে দেয়া মনে হয়েছে।

সিনেমা মোটাদাগে যে ঘটাতে পারে তার মধ্যে অনেক ব্যাপার থাকে। যেমন দর্শকের পূর্বানুমানকৃত ধারণার বিস্তৃত ঘটানো। এটা পর্দা ও পর্দার বাইরের জগতে সংযোগ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ টুলস, শুধু বিনোদন দেয়ার মতো ঘটনায় সঙ্গে যুক্ত এমন নয়। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সে ধারায় সংযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে এমন কিছু আবেগঘন মুহূর্ত তৈয়ার করে যেখানে একাত্ম হওয়া ছাড়া দর্শকের আর কিছুই থাকে না। এসব মুহূর্ত দর্শককে মনোযোগ দিয়ে সিনেমাটি দেখতে বাধ্য করে। হুমায়ূন আহমেদও তার ক্যারেক্টারগুলোকে এমন জায়গায় দাঁড় করান, সেটা বোধহয় আরো তীক্ষ্ণ ও আন্তরিকভাবে দেখালেন তানিম। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সম্পর্কের মুহূর্তগুলো যতটা না প্রেম-রোমান্স সম্পর্কিত; তার চেয়ে বেশি মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক। এটা হলো আমাদের দুনিয়া থাকার একটা প্রি-কন্ডিশান, বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন তানিম নূর। এ জায়গায় মোশাররফ করিম, শ্যামল মওলা ও শামীমা নাজনীন কাঁদিয়েছেন, আক্ষরিক অর্থে। তার সুফল ষোলো আনায় ঘরে তুলেছেন তানিম নূর।

সম্পর্কগুলোকে আরো বড় জায়গায় ধারণ করতে চেয়েছেন তানিম নূর। সেটাই আগেই বলেছি অনেকটা ‘বেমানান’ভাবে রিপ্লেস করা ‘বাংলাদেশ’ গানে। এছাড়া শিক্ষামন্ত্রী ও তার স্ত্রীর কথপোকথনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থী প্রভাবজনিত কিছু ‘ফ্যান্টাসি’ ওঠে আসে। ভোটের ময়দান বা রাজনৈতিক পরিসরে এমন চিন্তার প্রভাব ততটা না থাকলেও তাদের কালচারাল হেজিমেনি পাকাপোক্ত। এ অবজারভেশন তানিমের গল্পের সঙ্গে কীভাবে যায় জানি না, কিন্তু ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বিষয়টা মনে করিয়ে দেয়। এখানে দেখানো হলো, একটা কবিতার অর্থ উদ্ধার বা অনুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় দেশের মানুষের ভাগ্য। বাংলাদেশে শিল্প-সংস্কৃতিকে আমরা অনাচার জাস্টিফাই করার টুলস আকারেও দেখি। এবং বাংলাদেশে বরাবরই মিডল ক্লাশের রাজনৈতিক বোঝাপড়াও কালচারাল এ দাগের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, তাকে কোনোভাবে দাগানো ছাড়াই তুলে ধরা হলো। এর বাইরে কোনো অনিয়ম-অবিচারের বাংলাদেশে এ মানুষগুলো থেকে ‘বাংলাদেশ’ গান ছাড়া বোঝা যায় না। রাজনৈতিক এ বোঝাপড়া দর্শকের জন্য অস্বস্তিকর নয়। মাল্টিপ্লেক্স কালচারের দর্শকরা হয়তো রাজনীতিকে এভাবে দেখতে চান। আর তানিম যেহেতু রাজনীতি বিষয়টা একেবারেই বাদ দিতে পারছেন না, সচেতন থাকার জন্য তাকে ধন্যবাদ।

আরেকটি বিষয় হলো, সিনেমার বেদনাবিদুর সমাপনীর কাছাকাছি গিয়ে নতুন শিশুর জন্ম; যে কি-না অচিরেই তার বাবাকে হারাতে যাচ্ছে; মানবজীবনের যে নাজুকতা তার মাঝে আনন্দদায়ক কিছু। নিরাপদ একটা গুড ফিল আনন্দ ও হাহাকারের মধ্য দিয়ে গল্পের ইতি টানা হলো। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিত্যদিনের জটিলতাকে গণ্ডির ভেতর থেকে স্পর্শ করে বা চরিত্রের অভিজ্ঞতাগুলোকে নির্দিষ্ট প্রত্যাশার ভেতর চমৎকারভাবে আটকে রাখে। যেভাবে একটা ট্রেন মূলত দুটি ট্র্যাকের মাঝেই নিজেকে আটকে রাখে। কখনো কখনো চরিত্র বাছাই করে, যোগ-বিয়োগ চলে। সেখানেও চরিত্রগুলো ব্যাকস্টোরির কিছু হাহাকার বাদে ট্রেনেই থাকে, যতটা আমরা রাস্তা-ঘাটে মানুষজনকে দেখি, তার চেয়ে বোধহয় একটু বেশি। তবে যতটা দেখতে চাই, ততটা নয়। এই আরকি! হুমায়ূন যেমন আমাদের বেদনাকে আনন্দে রূপদান করেন, অতৃপ্তিকে একান্ত নিজ ধাঁচে উপভোগ্য বানিয়ে দেন; এ সিনেমাও তেমন।

তানিম তার আগের সিনেমার মতো ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ নস্টালজিয়া ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেটা সিনেমার সেলিং পয়েন্ট বটে। একইসঙ্গে হয়তো প্রত্যাশিত ঘটনাও। কারণ নব্বই দশক নিয়ে সারা দুনিয়ায় বোধহয় কাছাকাছি ধরনের বোঝাপড়া আছে; হয়তো আধুনিকতার ভেতর সেটাই সেরা সময়। যখন পুঁজির দ্রুত সঞ্চালন, প্রযুক্তি-আবিষ্কারসহ নানা কারণে মানুষে মানুষে সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। মানুষ খুব দ্রুতই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সে হারিয়ে যাওয়াকে এখন উদযাপন করি। যা যায় তা তো ফিরে আসে না, আসলে অন্যভাবে আসে। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সেই স্মৃতি উসকে দেয়া, মানুষের সামষ্টিক বোধের জায়গা থেকে যুথতার ‘দরকারি’ রোমান্টিসাইজ এবং সিনেমা পর্দায় দারুণ অ্যাডাপ্টেশন! একইসঙ্গে ‘কিছুক্ষণ’ থেকে স্রেফ আরেক হুমায়ূনীয় সিনেমা বা নাটক হওয়া থেকে মুক্তি, সেটা নিশ্চয় ভবিষ্যতে যারা হুমায়ূনের সাহিত্য নিয়ে কাজ করবেন, তাদেরও পথ দেখাবে। আচ্ছা, এ কথা তো আগেই একবার বলেছি। তো, আবারো বললাম।


About The Author

বিএমডিবির সহপ্রতিষ্ঠাতা

Leave a reply