Select Page

মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি : চোখটা এত পোড়ায় কেন!

মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি  : চোখটা এত পোড়ায় কেন!

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। যথারীতি বিটিভিতে শুক্রবারের পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি চলছিল। ঠিক বিকেল ৪টার খবরে সংবাদ পাঠিকা খবরের শুরুতেই জানালো ‘একটি শোক সংবাদ।’ শোক সংবাদটি ছিল অমর নায়ক সালমান শাহ-র। তাঁর অকাল মৃত্যুর খবরটি দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন গ্রামে, শহরে বহু মানুষ রাস্তায় বের হয়েছিল। সেই শোক দিন দিন বেড়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের দিনে অনেক বেড়েছে কিন্তু সালমান শাহ-র জন্য শোক কমেনি। ভালোবাসা যেমন বেড়েছে শোকও বেড়েছে। ভালোবাসাটা তাঁর রেখে যাওয়া কাজের জন্য আর শোক তাঁর অসময়ে চলে যাওয়ার জন্য।

‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ গানে গানে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-তে জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেত যে সালমান শাহ-কে এনেছিলেন দর্শকের সামনে তাঁর নামটা পরে ইতিহাস হয়েছিল বাংলাদেশের শোবিজ অঙ্গনে। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে অনেকের থেকে অনেকগুণ এগিয়ে ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন বা সালমান শাহ।

চলচ্চিত্র
১৯৯৩ – কেয়ামত থেকে কেয়ামত
১৯৯৪ – তুমি আমার, অন্তরে অন্তরে, রঙিন সুজন সখি, বিক্ষোভ, স্নেহ, প্রেমযুদ্ধ
১৯৯৫ – দেন মোহর, কন্যাদান, স্বপ্নের ঠিকানা, আন্জুমান, মহামিলন, আশা ভালোবাসা
১৯৯৬ – বিচার হবে, এই ঘর এই সংসার, প্রিয়জন, তোমাকে চাই, স্বপ্নের পৃথিবী, সত্যের মৃত্যু নেই, জীবন সংসার, মায়ের অধিকার, চাওয়া থেকে পাওয়া
১৯৯৭ – প্রেম পিয়াসী, স্বপ্নের নায়ক, শুধু তুমি, আনন্দ অশ্রু, বুকের ভিতর আগুন

নাটক
১৯৮৮ -সৈকতে সারস
১৯৯৩ – পাথর সময়, ইতিকথা
১৯৯৪ – আকাশছোঁয়া, দোয়েল
১৯৯৫ – সব পাখি ঘরে ফেরে, নয়ন
১৯৯৬ – স্বপ্নের পৃথিবী

অসমাপ্ত ছবি (চুক্তিবদ্ধ ও শ্যুট শেষ হয়নি)
শেষ ঠিকানা
কুলি
কে অপরাধী
মধুর মিলন
তুমি শুধু তুমি
মন মানে না
প্রথম প্রেম
ঋণশোধ
প্রেমের বাজি
প্রেমের বেদনা

শিশুশিল্পী
শিশুশিল্পী হিশেবে আলমগীর কবির পরিচালিত ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ ছবিতে অভিনয় করেছিল সালমান। এ ছবির রইচ চরিত্রের ছোটবেলার ভূমিকায় ছিল সালমান। কাজটি শেষ হয়নি। পরে ছবিটি ১৯৯৭ সালে আবারও নির্মাণ করেন পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। তখন রইচের ভূমিকায় অন্য একজন ছিল।

সবচেয়ে বেশি ছবির নায়িকা শাবনূর। তার সাথে ১৪টি। মৌসুমীর সাথে ৪টি, শাবনাজের সাথে ৩টি। লিমার সাথে ২টি।

চলচ্চিত্রের সালমান শাহ-কে বাণিজ্যিক ছবির অলরাউন্ডার পারফর্মার হিশেবে দেখা গেছে। তাঁর ছবির ক্যাটাগরিকে বাণিজ্যিক ছবির রোমান্টিক, রোমান্টিক ড্রামা, ফ্যামিলি ড্রামা, পলেটিক্যাল ড্রামা, ট্র্যাজেডি, কমেডি সব ধরনের জনারের ছবি তাঁর আছে। আপনি তাকে বাণিজ্যিক ছবির এনজয়অ্যাবল নাচ, গান, ফাইট, ড্রামা সব মিলিয়ে চাইলে ‘আন্জুমান’ দেখতে পারবেন। আগাগোড়া রোমান্টিক নায়কের মধ্যে চাইলে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত, তোমাকে চাই, অন্তরে অন্তরে, জীবন সংসার, তুমি আমার, মহামিলন, স্বপ্নের ঠিকানা’ দেখতে পারেন। ফ্যামিলি ড্রামাতে একইসাথে পাবেন ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত, দেন মোহর, স্নেহ, অন্তরে অন্তরে, জীবন সংসার, মায়ের অধিকার’-এ। পলেটিক্যাল ড্রামাতে ‘বিক্ষোভ, স্বপ্নের পৃথিবী’ আদর্শ ছবি। কমেডিতে ‘আশা ভালোবাসা’ চমৎকার। ট্র্যাজেডিতে ‘আনন্দ অশ্রু, স্বপ্নের নায়ক’ অসাধারণ। মাস্টারপিস কমার্শিয়াল ছবিতে সালমানের ‘আনন্দ অশ্রু, সত্যের মৃত্যু নেই, বিক্ষোভ, এই ঘর এই সংসার’ এ ছবিগুলো যে কোনো সময়ের জন্য আদর্শ।

গ্রাম-শহর দুই প্রেক্ষাপটে যে নায়ক নিজের পারফরম্যান্স দেখাতে পারে সেই ফুল প্যাকেজ নায়ক। সালমানের একই ছবিতে সেই আবহ আছে। যেমন – বিচার হবে। এই ছবির প্রথমদিকে আছে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সহজ-সরল যুবক সালমানের অসাধারণ পারফরম্যান্স অন্যদিকে মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত আছে শহুরে দাপুটে মাস্তানের অভিনয়। এছাড়া ‘রঙিন সুজন সখি’ ছবির গ্রামীণ সুজন তো আছেই। এ ছবির সুজন চরিত্রে ‘কথায় বলে গাছের ব্যাল পাকিলে তাতে কাকের কি’ গানে সালমানের অভিনয় যে কোনো গ্রামীণ চরিত্রে অভিনয় করা নায়ককে হার মানায়।

কমপ্লিট প্যাকেজের একজন কমার্শিয়াল হিরোর দিক থেকে সালমান শাহ-র ধারেকাছেও কেউ নেই। কথাটা অনেকের হজম করতে কষ্ট হতে পারে কিন্তু লজিকগুলো খেয়াল করুন আগে :
সুদর্শন – সালমান শাহ ছিল সুদর্শন। দেখলেই নায়ক মনে হত।

সুঅভিনেতা – তাঁর অভিনয়দক্ষতা ঈর্ষণীয়। চরিত্রকে পোট্রেট করাই ছিল পর্দায় তাঁর স্বাভাবিক কাজ।

ব্যক্তিত্বসম্পন্ন – সালমান লুকের দিক থেকে ছিল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। যে কোনো চরিত্রে তাঁর সহজাত ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেত।

বেসিক স্মার্টনেস ও ফ্যাশন – তাঁর বেসিক স্মার্টনেস ছিল। নিজস্ব পছন্দের শার্ট, প্যান্ট, ব্যান্ডেনা, ঘড়ি, ক্যাপ, আলখাল্লা, সানগ্লাস ইত্যাদি ছিল। তাঁকে ফ্যাশন আইকন বলা হয় এজন্যই।

প্রজন্মজয়ী – নিজের প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় ও আইডল ছিল সালমান। নিজের প্রজন্মকে ছাপিয়ে পরবর্তীকালে অন্য প্রজন্মেরও মন জয় করেছে তাঁর রেখে যাওয়া কাজের মাধ্যমে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো আর কারো মধ্যে নেই। কমপ্লিট হিরো এবং হিরোইজম ছিল তাঁর মধ্যে।

সালমান তাঁর সময়ের একমাত্র তারকা যে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন প্রোডাকশনেও কাজ করেছে। তাঁর নাটকের মধ্যেও হিরোইজম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ‘নয়ন, স্বপ্নের পৃথিবী’-তে। গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা, সচেতনতা তৈরি করতেও ভূমিকা রেখেছিল তাঁর নাটক। ‘ইতিকথা’ নাটকের ‘বজ্রযোগিনী গ্রামে এলো নতুন দিশা’ গানটির মাধ্যমে গ্রামীণ বিপ্লবের একটা হাতছানি মিলবে। ক্যারিয়ারের প্রথমদিকেই কি অসাধারণ বক্তব্যধর্মী কাজ তাঁর ছিল ভাবতেই অবাক লাগে। নাটকেও তাঁর ফ্যাশনেবল উপস্থিতি ছিল।

অনেকে বলে আর্ট ফিল্ম জাতীয় অভিনয় কি সালমান পারত! তাদের অবগতির জন্য জানাতে হয় সালমানের নাটকের যে অভিনয় বিশেষ করে ‘ইতিকথা’ নাটকে ছিল এই অভিনয়টা আর্ট ফিল্ম বা ক্যারেক্টারকে শান্ত, সুন্দর করে তুলে ধরার রসদ ছিল। এমনকি ‘এই ঘর এই সংসার’ ছবির কিছু সিকোয়েন্সে সেরকম ইলিমেন্ট আছে।

মিউজিক্যাল ছবির গুণ সালমানের ছবিগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ২৭টি ছবির কোনো না কোনো গান জনপ্রিয়। এর মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় গানের অভাব নেই। গানের দিক থেকে সালমান পুরো বাংলাদেশী চলচ্চিত্রেই যে কোনো নায়কের সাথে অনায়াসে প্রতিযোগী হয়ে যায়।

এই সালমান শাহ যখন তাঁর তিন বছরের ক্যারিয়ারে ঢালিউডের সবচেয়ে ক্ষণজন্মা নায়ক/অভিনেতা হয়ে নিজস্ব কীর্তি গড়েছিল তাঁকে আমরা অকালে হারাই ১৯৯৬ সালে। তাঁর মৃত্যু রহস্য নিয়ে সেই ১৯৯৬ থেকে আজ পর্যন্ত বিচারের দাবিতে দর্শকভক্ত, পরিবার দুদিক থেকেই আন্দোলন চলছে। প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা ছিল পরে পরিবারের মাধ্যমে আপিল বিভাগে আবেদনের পর উপযুক্ত সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যা মামলা হিশেবে পরিচালিত হচ্ছে পিআইবি-র মাধ্যমে। একের পর এক তারিখ পরিবর্তন হচ্ছে। সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় সেই ১৯৯৬ সাল থেকেই সালমানহত্যার বিভিন্ন প্রমাণ সংবাদপত্র ও বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে থাকার পরেও বিচার হয়নি। আসামীর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল ডন আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও সালমানের স্ত্রী সামিরা আছে। কিছুদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেই জবানবন্দি দেয়া রুবি রহমানের ভিডিও ক্লিপও এখন অন্যতম প্রমাণ। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা যায়নি। রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে বারবার অসহায় হয়ে থেকেছে সালমান পরিবার এবং বিলম্ব হয়েছে বিচার কার্যক্রম। পরিবার, দর্শকভক্ত সবার চাপা কষ্ট নিয়ে দিন পার হচ্ছে। আমাদের নিকটস্থ দেশ ভারতেও অনেক বড় নামকরা ব্যক্তিত্বদেরকে আইনের আওতায় আসতে হয়েছে। যেমন – সন্জয় দত্ত, সালমান খান। অথচ আমাদের দেশে তথ্য, প্রমাণ থাকার পরেও সালমানহত্যার বিচার সম্পন্ন হয়নি। বিচার আমরা আমাদের জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব কিনা তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সালমান শাহ-কে নিয়ে প্রচুর ভিডিও ইউটিউবে আছে। রেভিনিউ কামাই করার জন্য অনেকে অনেককিছু করছে। সালমানের নামে এফডিসিতে রোডের, ভবনের নামকরণ করার জন্য অনেকে দাবি করছে কোনো কাজ হচ্ছে না। অথচ এটা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দায়িত্ব ছিল দাবি কেন করতে হবে! তারা কি জানে না সালমান কি ছিল ইন্ডাস্ট্রির জন্য! তারা তো অনেকেই সালমানকে কাজে লাগিয়ে উপরে উঠেছে। অনেকেই সালমানের সাথে অভিনয় করতে মুখিয়ে থাকত তাহলে কেন তাদেরকে অনুরোধ করতে হবে! অশ্রু বিসর্জন দিতে হয় এসব পরিস্থিতি দেখলে নাকি ঘৃণায় মনটা বিষিয়ে ওঠে ভেবে দেখার অবকাশ আছে।

সালমানের সাথে ছবি করেছে এমন অনেক নামকরা তারকা মিডিয়াতে বহাল তবিয়তে আছে অথচ তারা স্মৃতিচারণ বলেন বা সালমানের জন্য কিছু করার কথা বলেন দেখা যায় না তাদেরকে। তারা আজকে বড় বড় তারকা কিন্তু সালমানের বেলায় আড়ষ্ট হয়ে থাকে।

বাস্তবতা দেখলে আজকের সারাংশে বলতে হয় সালমান শাহ নামের নক্ষত্রটি আসলে ভুল ইন্ডাস্ট্রিতে জন্ম নিয়েছিল। যার মাধ্যমে ঢালিউড সম্পূর্ণ আলাদা একজন তারকাকে পেয়েছে ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে গর্ব করার জন্য সেই ইন্ডাস্ট্রি তাকেই ধরে রাখতে পারেনি অথচ দায়িত্বটা তাদেরই ছিল বেশি। অন্য কোনো ইন্ডাস্ট্রি হলে তাঁকে পরম যত্নে আগলে রাখত। দুর্ভাগ্য এ স্বার্থপর ইন্ডাস্ট্রির তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রই করেছে। নিষিদ্ধ পর্যন্ত করেছিল নোংরা ফিল্ম পলিটিক্স। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দেয়নি।

সালমান শাহ একাই একটা ইতিহাস। নামে, কর্মে। তাঁর মতো আর কেউ নেই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সব উজ্জ্বল তারকাকে সম্মান প্রদর্শনের পরেও সালমানের জন্য একদম একটা জায়গা ফাঁকা রাখতে হয় আলাদা করে কারণ সে সবার থেকে আলাদা। তাঁর পূর্ণতা ও শূন্যতার দিকে তাকালে চোখটা পোড়ায় ভীষণ। একটা ঘটনাই ঘটে তা হলো চোখজোড়া ছলছল করে।


অামাদের সুপারিশ

মন্তব্য করুন

ই-বুক ডাউনলোড করুন

BMDb ebook 2017

Coming Soon
বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকের অভিনয়শিল্পী বাছাই কেমন হয়েছে?
বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকের অভিনয়শিল্পী বাছাই কেমন হয়েছে?
বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকের অভিনয়শিল্পী বাছাই কেমন হয়েছে?

[wordpress_social_login]

Shares