সিনেমা হলের সংখ্যা যেভাবে হাজার থেকে শয়ে নামল
বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এখন এক নায়কনির্ভর। ২০০৬ সাল থেকে এখানে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন শাকিব খান। দিন যত গেছে তার দাপট তত বেড়েছে। নিজেকে নিজেই অতিক্রম করে চলেছেন তিনি। নিজের রেকর্ড নিজেই ভাঙছেন, আবার নতুন করে গড়ছেন। বিগত বছরও তার একটি ছবি আয়ের দিক থেকে রেকর্ড গড়েছে। ‘বরবাদ’ নামের ছবিটি ঈদুল ফিতরে প্রায় ১২০টি সিনেমা হলে মুক্তি পায়। অথচ কোভিডের আগে শাকিব খানের প্রযোজিত ছবি ‘পাসওয়ার্ড’ মুক্তি পেয়েছিল প্রায় ১৭৫টি সিনেমা হলে। ২০১৯ সালের ওই ঈদুল ফিতরে তার অভিনীত আরেকটি ছবি ‘নোলক’ প্রায় ৭৫টি হলে চলেছিল। অর্থাৎ, একই দিনে এই নায়কের ছবি চলেছে আড়াই শতাধিক সিনেমা হলে।

আমরা যদি আরেকটু পেছনে ফিরে যাই, শাকিব খানের জনপ্রিয়তার আরো বেশি উজ্জ্বল নমুনা দেখতে পাব। ২০০৯ সালের ঈদে এই তারকার ছবি মুক্তি পেয়েছিল পাঁচটি । ছবিগুলো হচ্ছে—’মায়ের হাতে বেহেস্তের চাবি’, ‘জান আমার জান’, ‘সাহেব নামে গোলাম’ ইত্যাদি। ওই ছবিগুলো চলেছিল আড়াই শতাধিক সিনেমা হলে। এ ছাড়া আড়াইশ’র বেশি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়েছিল তার অভিনীত বিভিন্ন পুরনো ছবি। সবমিলিয়ে সেবার ৫০০ শতাধিক সিনেমা হলে তার ছবি চলেছে। তখন দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ৮০০-এর কাছাকাছি।
শাকিব খান ১৯৯৯ সালে ক্যারিয়ার শুরু করেন। রাতারাতি তিনি খ্যাতির দেখা পাননি। তারচেয়েও বড় তারকারা তখন চিত্রাকাশে জ্বলজ্বল করছিলেন। মান্না, রুবেল, মৌসুমী, শাবনূর, রাজিব, ফরীদিরা তখন মস্ত তারকা। দেশজুড়ে তখন সিনেমা হলের সংখ্যা ১২০০ ছাড়িয়ে গেছে। হাজারের ওপরে সিনেমা হল নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা শাকিব খানের ছবি এখন মেরে-কেটে ১০০ সিনেমা হলে চলে। সিনেমা হলের এই ধস আর শাকিব খানের বেড়ে ওঠার বিপরীতমুখী ঘটনা ঘটেছে সমান্তরালে। যত তিনি ওপরে উঠেছেন, তত সিনেমা হলের ব্যবসা নিচে নেমেছে। আগে ঈদে তার পাঁচটা ছবি মুক্তি পেত, এখন মুক্তি পায় একটা ছবি।
শাকিব খান তারকা হিসেবে টিকে গেলেও এই দেশের সিনেমা হলগুলো টিকে থাকতে পারেনি। এর পেছনে তার দায় কতটুকু, তা নিয়ে আমরা পরে কথা বলব। তার আগে কথা বলব—কেন সিনেমা হলের এই বেদনাদায়ক চিত্র—তা নিয়ে। প্রায়ই পত্রিকার শিরোনাম হয় সিনেমা হল ভাঙার খবর। একটা প্রেক্ষাগৃহে হাতুড়ির বাড়ি পড়ে আর তার আঘাত যেন এসে লাগে ওই অঞ্চলের দর্শকের বুকের ভেতরে। দেশের প্রত্যেকটি প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে তার এলাকার মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে নস্টালজিয়া। ফলে প্রেক্ষাগৃহে ভাঙন যেন দর্শকের বুকের পাঁজরে পদাঘাত। এত স্মৃতির হলগুলো কেন এভাবে মাটির সঙ্গে মিশে গেল, আর হলের জমিনে সিনেমার নিশানা মুছে দিয়ে উঠল বহুতল ভবন, তার কারণগুলো খতিয়ে দেখা যাক।

বাংলা সিনেমার জোয়ারে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণে গতি
গত বছর সালাহউদ্দিন পরিচালিত কালজয়ী বাংলা ছবি ‘রূপবান’ ৬০ বছর পূর্ণ করল। প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তির প্রায় দশ বছর পরে বাংলা ছবির জয়যাত্রা শুরু। তার আগে কেবলই উর্দু-হিন্দি ছবির জয়জয়কার ছিল। ওই একই বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ভারতীয় ছবি আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। বাংলা ছবির দিগন্ত খুলে দেয় ‘রূপবান’ কিংবা ১৯৬৫ সাল। তখন সিনেমা হলের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। ‘রূপবান’ প্রথম সপ্তাহে চলেছিল ১৪টি সিনেমা হলে। ওই হলগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের ‘সিনেমা প্যালেস’, ময়মনসিংয়ের ‘ছায়াবাণী’ আর নারায়ণগঞ্জের ‘নিউ মেট্রো’ ছাড়া সবই এখন কালের গর্ভে। বিস্ময়করভাবে এই তিনটি সিনেমা হল ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে।
যাই-ই হোক। ষাটের দশকের শেষার্ধেই সিনেমা হল তৈরি ধীরে-ধীরে বাড়ছিল। স্বাধীনতার পর সিনেমা শিল্প যেন ফুলেফেঁপে উঠতে থাকে। প্রতি বছর ছবি মুক্তির সংখ্যা বাড়ে, বাড়ে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা। নতুন তারকা আসে, আসে নতুন নির্মাতা। নতুন-নতুন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এসে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়। ১৯৭২-৭৪, এই তিন বছর ৩০টি করে ছবি মুক্তি পায়। ১৯৭৫ সালে ছবি মুক্তি পায় ৩৪টি। ১৯৭৬ সালে ছবি মুক্তির সংখ্যা একলাফে বেড়ে যায়- ৪৭টি। এভাবে ক্রমাগত ছবির উৎপাদন বাড়তে থাকে। নতুন দেশে তারকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ফারুক, আলমগীর, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল, ওয়াসীম, সোহেল রানা, সুচরিতা, নূতনের। স্বাধীনতার আগেই তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন রাজ্জাক, শবনম, শাবানা, কবরী ও ববিতা। এই তারকাদের টানে সিনেমা হলে হুমড়ি খেতে থাকেন দর্শক।
আশির দশকে সিনেমা শিল্প তার যৌবনের মধ্যগগণে পৌঁছায়। ইলিয়াস কাঞ্চন, জসীম, রুবেল, অঞ্জনা, রোজিনা, অঞ্জু, দিতি, চম্পা—তারকায় সয়লাব ইন্ডাস্ট্রি। কারো চেয়ে কারো জনপ্রিয়তা কম নয়। সকলেই সিনেমা হল দর্শকে ভরিয়ে দিতে সক্ষম। আর তাই জেলা শহরে তো বটেই, উপজেলা পর্যায়েও সিনেমা হল তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। এমনকী ইউনিয়ন পর্যায়েও প্রেক্ষাগৃহ দেখতে পাওয়া তখন অস্বাভাবিক ছিল না। তখন নতুন ছবি যেমন ঢাকাসহ জেলা শহরগুলো আলো করে মুক্তি পেত, তেমনই পুরনো ছবি চলত গ্রামগঞ্জের হলগুলোতে। শুক্রবার আর হাটের দিনে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ঠাঁই দেয়াই ছিল মুশকিল। কালোবাজারে টিকেট বিক্রি হতো। নির্দিষ্ট আসনের বাইরে টুল দিয়ে দর্শকের বসার ব্যবস্থা করতে হতো। রিকশায় মাইকিং করে প্রচারণা আর রেডিওতে বিজ্ঞাপন শোনা তখন ছিল জনতার বিনোদনের নিত্য অনুষঙ্গ।
সিনেমা হলের তখন এমন রমরমা যে রাস্তার এই পাশে এক প্রেক্ষাগৃহ তো উল্টোপাশে আরেক প্রেক্ষাগৃহ। একই ভবনে দুটি সিনেমা হল ছিল অগণিত। বন্যার ভেতরেও ছবি হিট হয়ে যায়। সিনেমা হলে এসে গর্ভবতী নারী বাচ্চাপ্রসব করেছেন, এমন অদ্ভুত ঘটনাও ঘটেছে। হলে গিয়ে ছবি দেখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের খবরও এসেছে পত্রিকায়। আর ঘরে ঘরে প্রতিদিনের ঝগড়া-খুনসুটি ছিল তুচ্ছ ঘটনা। পরিবারের সবাই মিলে উৎসবে, পার্বণে ছবি দেখা হয়ে উঠেছিল এই দেশের জনসংস্কৃতির অংশ। সেই সিনেমা হলের যৌবনে কেন ভাটার টান ধরল, কেন সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেল এক লহমায়? এর রহস্য লুকিয়ে আছে নব্বই দশকে।

ভিসিআর কালচার এবং সালমান শাহর বিদায়
নব্বই দশকের গোড়াতেই ঢাকাই সিনেমায় একটি বৈপ্লবিক কাণ্ড ঘটে। তরুণ তারকাদের প্রতি দর্শকের প্রবল আগ্রহ দেখা যায়। নাঈম-শাবনাজ দিয়ে শুরু, একে-একে ওমর সানী, মৌসুমী, সালমান শাহ, শাবনূর দর্শকপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে যান। গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের সঙ্গে-সঙ্গে সিনেমার ভাষায় যেমন রঙ লাগে, তারকাদের পুরনো বন্দোবস্তও যেন ভেঙে পড়ে। নতুন তারকারা দর্শকমনে ঝড় তো তোলেন, কিন্তু ব্যবসা কি আগের মতো জোয়ারের বেগে বইতে পারে? সিনেমার প্রধান শত্রু হয়ে দেখা দেয় ভিসিআর বা ভিসিপি। প্রবাসীরা দেশে ফেরার সময় একখানা ভিসিপি বগলে করে হাসতে-হাসতে বিমানবন্দর পার হয়ে আসেন। মোড়ে-মোড়ে ভিসিআরের দোকানে জমজমাট হয়ে ওঠে হিন্দি ছবির ব্যবসা। মাধুরী, শ্রীদেবী, শাহরুখ খান, সালমান খান, কাজল, মনীষাদের তখন বাড়-বাড়ন্ত। ভিডিও ক্যাসেটের দৌরাত্মে ঝিমিয়ে আসে প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা। ভিডিও পাইরেসির ছোবলে আক্রান্ত হয় ঢাকাই সিনেমা। ফলে বহু বছরের বাংলা ছবির ব্যবসা প্রথমবারের মতো বড় রকমের ধাক্কা খায়।
১৯৯৬ সালে আকস্মিকভাবে মৃত্যু হয় সিনেমার রাজপুত্র সালমান শাহ’র। তার অকাল মৃত্যু তরুণ তারকাদের পাগলা ঘোড়ার গতিতে ছুটে চলাকে থমকে দেয়। রোমান্টিক ছবির ক্ষেত্রে একরকম খরার সৃষ্টি হয়। নতুনরা যখন প্রতিকূল স্রোতের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন হাল ধরার বদলে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েন প্রবীণ তারকারা। শাবানা তিন দশকের লম্বা ক্যারিয়ার ফেলে যুক্তরাষ্ট্রে উড়াল দেন ১৯৯৮ সালে। একই বছর তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী জসীম বিনা নোটিসে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। একসঙ্গে এতগুলো তারকার বিদায়ে ঢালিউডের পাটাতন নড়বড়ে হয়ে ওঠে। এই টালমাটাল সময়ে নতুন তারকা তৈরির উদ্যমে ঝাঁপিয়ে না পড়ে, ছবি নির্মাণের নতুন কলাকৌশল রপ্ত না করে সস্তা পথে পা বাড়ান প্রযোজকরা। ছবিতে অশ্লীল গান যুক্ত করতে থাকেন মুনাফার আশায়। এই মনোবৃত্তি একটা পর্যায়ে সিনেমা শিল্পে পর্নোগ্রাফির উদ্বোধন ঘটায়।
নব্বই দশকের শেষের দিকে আমরা কিছু তারকার উজ্জ্বল মুখচ্ছবি দেখতে পাই—পপি, রিয়াজ, শাকিল খান, ফেরদৌস, পূর্ণিমা এবং শাকিব খান। এই তারকারা সিনেমায় নতুন রক্ত সঞ্চালনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু নির্মাতারা তাদের দক্ষতা ও দর্শকপ্রিয়তার ওপর ভরসা না করে ভরসা করতে শুরু করেন কাটপিসের ওপর। ছবি রোমান্টিক হোক আর পলিটিক্যাল হোক, সেই ছবিতে দ্বিতীয় সারির দুই জোড়া নায়ক-নায়িকা থাকবেই। তারা পর্দায় এসে প্রায় উলঙ্গ নৃত্য করবেই। শুরুতে এভাবে ছবিগুলো নষ্ট হলেও পরের দিকে রীতিমতো নীল ছবির স্টাইলে গান তৈরি হতে থাকে। সেই সব গান কিংবা ধর্ষণদৃশ্য জুড়ে দিয়ে ছবিঘরে চালানো হতে থাকে। ফলে নারী দর্শকরা সিনেমা হলগুলোকে পুরোপুরি বর্জন করেন।

কাটপিসের করাল গ্রাসে ছবিঘর
নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে ভিনদেশি স্যাটেলাইট চ্যানেলের বিস্তারে প্রেক্ষাগৃহে যে মন্দা ব্যবসার আছড় পড়েছিল, উপায়ন্তরহীন পাইরেসির লাগাতার আক্রমণে তা আরো নিম্নগতি পায়। তখন থেকেই প্রেক্ষাগৃহের পশ্চাৎপদতার শুরু। সিনেমা হল ভেঙে বহুতল ভবন তৈরির প্রবণতা দেখা দেয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে। রাজধানীর দর্শক পদভারে মুখর প্রেক্ষাগৃহগুলোর আলো একে একে নিভে যেতে থাকে। গুলিস্তান, শাবিস্তান, তাজমহল, স্টার, মুন, মল্লিকা, নিশাত, নাজ, জ্যোতি, মেঘনা, শ্যামলী, আগমন, অতিথির মতো সিনেমা হল—যেগুলোর নাম শুনলে বুকের রক্ত ছলকে উঠত দর্শকে—সেগুলো সব মিশে যায় ঢাকার ধুলায়।
আর যে হলগুলো সাইক্লোনের প্রবল ধাক্কার মধ্যেও টিকে যায়, সেগুলোতে লাগে যুগের হাওয়া। কাণ্ডজ্ঞানহীন, শিল্পসুষমাহীন আবর্জনা ছবির নামে এই হলগুলোতে চলতে থাকে। কখনো দর্শকের উপচেপড়া ভিড়, কখনো আবার খরা। সত্তর, আশির দশকের মতো সপরিবারে ছবি দেখার চল পুরোপুরি উঠে যায়। প্রেমিক আর প্রেমিকা ঘনিষ্ঠ হতে আশ্রয় নেয় প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে। তরুণরা দল বেঁধে আসে মউজ-ফূর্তি করতে। গাঁজা-বিড়ির ধোঁয়ায় ঘোলা হয়ে আসে পর্দা। সেখানে চলে ভিলেনের হুঙ্কার আর গালাগাল। সিনেমা হল মালিকরা হারাতে থাকেন সামাজিক সম্মান। সমাজে দাবি ওঠে অসামাজিক কাজের আখড়া হলগুলো ভেঙে ফেলার। ফলে দেশজুড়ে হিড়িক পড়ে প্রেক্ষাগৃহ ভাঙার।
গোটা সিনেমায় তখন ভাঙচুরের সময়। এফডিসিতে ভাল ছবি বনাম মন্দ ছবির দ্বৈরথ চলছে। একদল অশ্লীল ছবি বানানোর প্রতিজ্ঞতায় অটল। আরেকদল প্রেক্ষাগৃহ থেকে বিতাড়িত মহিলা দর্শকদের ফিরিয়ে আনতে শপথবদ্ধ। এই গোষ্ঠীরই একজন—জনপ্রিয় চিত্রনায়ক মান্না। তার ছবির মান নিয়ে কথা হতে পারে, বিতর্ক হতে পারে তার ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে, তবু কাটপিসের জোয়ারের বিরুদ্ধে তার জেহাদ ঘোষণাকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যে মানের, যে উচ্চতার ছবি দিয়ে প্রবলভাবে জেঁকে বসা নোংরামোকে ঠেকিয়ে দেয়া সম্ভব, তেমন ছবির মিছিল তিনি তৈরি করতে পারেননি। হাতেগোনা কয়েকজন নির্মাতা আর গুটিকয় শিল্পী নিয়ে সুস্থধারার আন্দোলন ছিল খাঁ খাঁ মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টি।
সেই মান্নাও হুট করে চলে গেলেন ২০০৮ সালে। ততদিনে ঝড়ের পর শান্ত হয়ে এসেছে এফডিসি। এক/এগারোর সরকার সিনেমা শিল্পে টাস্কফোর্স নামিয়ে কাটপিস ব্যবসায়ীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। ময়ূরী, মেহেদি, পলি, সোহেল, ঝুমকা, শাহিনরা নিষিদ্ধ হয়েছেন সিনেমা পাড়ায়। কিন্তু নিষিদ্ধ হননি একজন। তিনি হচ্ছেন শাকিব খান। স্বল্প বাজেটের অসংখ্য কাটপিসযুক্ত ছবির নায়ক হলেও তার চোরাগুপ্তা জনপ্রিয়তা ছিল। তিনি খুব নীরবে তরুণ দর্শকদের ভেতরে নিজের জায়গা তৈরি করে ফেলেছিলেন। মান্নার অকাল মৃত্যুর পর তিনি একচেটিয়া অবস্থানে চলে যান।

শাকিবশাসিত ঢালিউডে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের হিড়িক
এখান থেকেই সিনেমা হল ধ্বংসের ধারবাহিকতায় চূড়ান্ত মুহুর্তের সূত্রপাত। শাকিব খান প্রধান নায়ক হয়ে দৃশ্যপটে হাজির হোন বটে, কিন্তু তার ছবির নির্মাতা হিসেবে যারা নিযুক্ত হোন, তারা প্রায় সকলেই ‘বি’ গ্রেডের অ্যাকশন ছবির পরিচালক-প্রযোজক। ফলে শাকিব খান অত্যন্ত দ্রুত একঘেয়ে হয়ে ওঠেন। বছরে ১৪/১৫টি ছবি করে সিনেমা শিল্পে ছবির জোগান তিনি বজায় রাখেন। যদিও ফাঁকা মাঠে তার পারিশ্রমিক হু হু করে বাড়তে থাকে, কিন্তু তারকাশূন্য, প্রতিযোগিতাশূন্য ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি একা হয়ে পড়েন, বৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়েন। তবু তার প্রতিভার সামনে কোনো নায়ক দাঁড়াতে পারেননি, বরং দিন দিন বাকিরা অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়েন।
এই একমুখী চলচ্চিত্র কারখানায় প্রচণ্ড হতাশা ছড়িয়ে যায়। ঈদে সাতটা ছবি মুক্তি পেলে তার পাঁচটার নায়ক শাকিব খান, এই লেখার শুরুতেই যে তথ্য আমরা দিলাম…। সিনেমার ‘দূর দূরতক’ এই এক নায়ক ছাড়া আর কাউকেই দেখা যায় না। ‘কিং খান’ উপাধি পাওয়া তারকাটির সব ছবি আবার ব্যবসা করে না। যেটুকু যা চলে, তার ছবিই চলে; বাকিদের ছবি তো দর্শক ছুঁয়েও দেখে না। এই অবস্থায় সিনেমার মন্দা কাটাতে ভারতীয় ছবি আমদানির তোড়জোড় শুরু হয়। ২০১০ সালে তিনটি ভারতীয় ছবি এসে ঢালিউডের বন্দরে ভেড়ে। এর বিরুদ্ধে কাফনের কাপড় পরে শাকিব খানের নেতৃত্বে হয় আন্দোলন। পরে এই নায়কই পরিস্থিতি বুঝে যৌথ প্রযোজনার ছবিতে অভিনয় করে নিজের ক্যারিয়ারকে নতুন মাত্রা দেন ২০১৬ সালে।
এবার যৌথ প্রযোজনার ছবি নিয়ে জলঘোলা শুরু হয়। এক পক্ষ ছবি আমদানি করে সিনেমা হল বাঁচাতে চান, আরেক পক্ষ দেশি ছবির মধ্যেই উত্তরণ খোঁজেন। এই রশি টানাটানির মধ্যে ছবি উৎপাদনের গতি কমে আসে, বেকার হতে শুরু করেন শিল্পী-কলাকুশলীরা। আর বন্ধ হতে থাকে সিনেমা হল। রাজধানীর ইসলামপুরের লায়ন, বংশালের মানসী, কারওয়ানবাজারের পূর্ণিমা, মীরপুরের সাগরিকা ও বিউটি, পোস্তাগোলার যমুনা ও ডায়না, নিউ মার্কেটের বলাকা ও বিনাকা, ক্যান্টনমেন্টের গ্যারিসন, টঙ্গীর আনারকলি ভেঙে ফেলা হয়।
আমরা এই লেখার শুরুতে শাকিব খানের ‘পাসওয়ার্ড’ ছবির কথা বলছিলাম। কোভিডের আগে এটিই শেষ হিট ছবি। তখন দেড়শ’র মতো সিনেমা হল নিয়মিত ছবি প্রদর্শন করত। আরো দেড় শতাধিক হল শুধু ঈদে চালু হতো, উৎসব ফুরালে বন্ধ হয়ে যেত। এই নাজুক অবস্থার আরো অবনতি হয় কোভিডের পরে। যে প্রেক্ষগৃহগুলো ধুঁকে ধুঁকে টিকে ছিল, সেগুলোও করোনার সময় চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকার রাজমণি, জোনাকী, অভিসার, নেপচুন, মানসী, পূরবী, শাহিন, পদ্মা, সুরমা, এশিয়া, মুক্তি, চিত্রামহল, টঙ্গীর চম্পাকলি বিলীন হয়ে যায় স্মৃতির অতলে।

মাল্টিপ্লেক্সের দাপট বনাম সিনেমা হল সংকট
কোভিডের সময় উত্থান ঘটে ওটিটি (ওভার দ্য টপ) প্ল্যাটফর্মের। ঘরে বসে ছবি দেখার অভ্যাস তৈরি হয় দর্শকের। সিনেমা হল চিরতরে হারিয়ে যাবে কি না সেই বিতর্ক দেখা দেয়। এরইমধ্যে ২০২২ সালে একটা উল্টো ঘটনা ঘটে। মাল্টিপ্লেক্সে বাংলা ছবির জোয়ার ওঠে। ‘পরাণ’, ‘হাওয়া’, ‘প্রিয়তমা’, ‘সুড়ঙ্গ’ স্টার সিনেপ্লেক্সসহ সমস্ত মাল্টিপ্লেক্সে রেকর্ডভাঙা ব্যবসা করে। বাংলা সিনেমার হারানো দর্শক আবার ফিরে আসতে শুরু করে থিয়েটারে। এটি নতুন প্রবণতা এই দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য। দুই দশক আগে সিনেপ্লেক্স চালু হলেও কখনো বাংলা ছবি সেখানে ধারবাহিককভাবে ভাল ব্যবসা করেনি। কালেভদ্রে ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’, ‘দেবী’র মতো ছবিগুলো ব্যবসা করলেও এদের ভরসায় সিনেমা শিল্পের হৃদপিণ্ডে কোনো প্রাণের সঞ্চার হয়নি।
বাংলা ছবির আদি ও অকৃত্রিম বন্ধু বরাবরই সিনেমা হল। দেশজুড়ে প্রায় ১২০০ মতান্তরে ১৪০০ সিনেমা হল ছিল নব্বই দশকে। ঢাকাতেই প্রেক্ষাগৃহ ছিল ৩৬টার মতো। প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে ৭/৮টি সিনেমা হল ছিল। প্রতিটি জেলা শহরে ৫/৬টি সিনেমা হল ছিল। এখন একেকটি বিভাগীয় শহরে একটি/দুটি প্রেক্ষাগৃহ টিম টিম করে জ্বলছে। অন্তত বিশটি জেলা শহরে কোনো সিনেমা হল নেই।
ফেনী, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, পঞ্চগড়, সিরাজগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বরগুনা, নড়াইল, সুনামগঞ্জ, চাঁদপুর, ঝালকাঠি জেলা শহরে কোনো সিনেমা হল নেই। আরো অন্তত বিশটি জেলা শহরে সিনেমা হল আছে নামকাওয়াস্তে—কিন্তু এগুলো সারা বছর বন্ধ থাকে। দুই ঈদের দিন খোলে, দু/তিন সপ্তাহ পর ফের বন্ধ হয়ে যায়।
কয়েক বছর ধরে প্রতি ঈদে সিনেমা হলে দর্শকের যে ঢল দেখা যায়, তার পুরোটাই রাজধানী তথা বিশেষ অঞ্চলকেন্দ্রিক। দেশের বহু জেলার, উপজেলার দর্শক থাকেন চলচ্চিত্র-বিনোদন থেকে বঞ্চিত। সেলুলয়েডের সোনালি যুগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দর্শকও মুক্তির কিছুদিনের মধ্যে একটি হিট ছবির স্বাদ নিতে পারতেন। এখন দর্শককে অপেক্ষা করতে হয় ছবিটি ওটিটিতে কিংবা ইউটিউবে মুক্তি পর্যন্ত।
শেষ করা যাক শাকিব খানকে দিয়েই। তার ছবি একটা সময় দেশের যে উপজেলাতেই সিনেমা হল ছিল—সেখানেই পৌঁছাত। এখন অন্তত বিশটি জেলা শহরে তার ছবি পৌঁছাতেই পারে না। তার ছবি এখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, ইউরোপে চলে। কিন্তু দেশের অনেক উপজেলায়, কিছু জেলায় তার ছবি যেতে পারে না; কেননা সেখানে আর সিনেমা হলের কোনো অস্তিত্ব নেই। তার ছবি মুক্তি পেলে এখন সিনেপ্লেক্সে টিকেটের জন্য হাহাকার লেগে যায়। আবার তারই ছবি মুক্তির পর পত্রিকার শিরোনাম হয়—’সিনেমা হলে আসন ১৩০০, দর্শক ১০০’!






