Select Page

অন্যপাতা— চট্টগ্রামের আলো-হাওয়ায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি প্রেক্ষাগৃহে

অন্যপাতা— চট্টগ্রামের আলো-হাওয়ায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি প্রেক্ষাগৃহে

চট্টগ্রামের পরিচিত অলিগলি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শহরের ব্যস্ততা আর তরুণদের জীবনের নানা টানাপোড়েন নিয়ে বড় পর্দায় আসছে ‘অন্যপাতা’। চট্টগ্রামের একদল শিক্ষার্থীর উদ্যোগে নির্মিত সিনেমাটির বিশেষত্ব হলো, নির্মাণের প্রায় প্রতিটি ধাপই সম্পন্ন হয়েছে এই শহরে। দুই বছরের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা সিনেমাটি আগামীকাল (২৩ অক্টোবর) দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে। নির্মাতাদের কাছে এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, চট্টগ্রামকে গল্পের ভেতর দিয়ে নতুন করে তুলে ধরারও প্রয়াস।

চট্টগ্রামের গল্প, চট্টগ্রামের মানুষের সিনেমা

‘অন্যপাতা’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি চট্টগ্রামের একদল তরুণের সম্মিলিত সৃষ্টিশীলতার গল্প। সিনেমাটির প্রি-প্রোডাকশন থেকে শুরু করে শুটিং, পোস্ট-প্রোডাকশন, সংগীত—প্রায় সব কাজই হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে। নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশ মানুষও এই শহরের আলো-হাওয়ায় বেড়ে উঠেছেন। ফলে চট্টগ্রাম এখানে কেবল গল্পের পটভূমি নয়, বরং গল্পেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শহরের চকবাজার, বহদ্দারহাট, লালখান বাজার, এক্সেস রোড, সিআরবি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ মার্কেট কিংবা কালুরঘাট—চট্টগ্রামের পরিচিত নানা জায়গার সঙ্গে গল্পের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে নিবিড়ভাবে। এসব জায়গা যাঁদের চেনা, তাদের কাছে সিনেমাটি হয়ে উঠতে পারে স্মৃতির পথে ফিরে যাওয়ার উপলক্ষ। পরিচিত কোনো রাস্তা, কোনো স্থান কিংবা কোনো দৃশ্য হয়তো মনে করিয়ে দেবে জীবনের ফেলে আসা কোনো সময়কে। ব্যক্তিগত স্মৃতি আর অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সিনেমার গল্প মিশে তৈরি করতে পারে একধরনের নস্টালজিয়া।

গল্পের সঙ্গে স্থানের নিবিড় সম্পর্ক

নির্মাতারা বলেন, ‘অন্যপাতা’ চট্টগ্রামকে এমন একটি জায়গা হিসেবে তুলে ধরতে চায়, যেখানে শহরের পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত গল্প মিশে যায়। চট্টগ্রামের বাইরের দর্শকদের জন্য তাই সিনেমাটি হতে পারে শহরটিকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ। পরিচিত পর্যটনস্থানের বাইরেও একটি শহরের নিজস্ব জীবন, মানুষের সম্পর্ক ও স্মৃতির জগৎ যে কতটা সিনেমাটিক হতে পারে, সেটি দেখারও সুযোগ মিলবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের সিনেমা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী যুক্ত ছিলেন সিনেমাটি নির্মাণে। শুরুতে ছয়জনের দল থাকলেও কাজের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের অর্থ ও টিউশনির আয় দিয়ে তাঁরা এগিয়ে নিয়েছেন সিনেমার কাজ।

এসজেএ প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাহেজাহান এ্যানি। করোনার সময় একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা থেকে সিনেমা বানানোর আত্মবিশ্বাস পান তিনি। পরে চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজার পরামর্শে সিনেমা নিয়ে পড়াশোনাও করেন।

এ্যানির ভাষায়, ‘অন্যপাতা’ নির্মাণের অভিজ্ঞতা অনেকটাই ম্যাজিক্যাল। ছয়জনের দল ধীরে ধীরে ৪০ জনের হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর উপলব্ধি, সিনেমাটি নির্মাণ করতে গিয়ে তাঁরা যেমন একটি গল্প তৈরি করেছেন, তেমনি নিজেরাও বদলে গেছেন। তাঁর কথায়, ‘অন্যপাতাকে আমরা বানাইনি, অন্যপাতা আমাদের বানিয়েছে।’

ভর্তি, ভালোবাসা ও তারুণ্যের টানাপড়েন

সিনেমাটির গল্পে উঠে এসেছে তরুণদের পরিচিত জীবনের নানা দিক। পরিবারের প্রত্যাশার চাপ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, ভালোবাসা, পরিচয়ের সংকট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াই—এসব বিষয় নিয়েই ‘অন্যপাতা’র কাহিনী। নির্মাতাদের মতে, এটি কোনো পরীক্ষামূলক গল্প নয়; বরং তরুণদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা অভিজ্ঞতারই চলচ্চিত্ররূপ।

প্রযোজক অংকন দে অনিমেষের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে প্রায় সবাইকে যেতে হয়, অথচ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি। তাই এ গল্প পর্দায় নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন তাঁরা। দর্শক সিনেমাটিতে দুষ্টু-মিষ্টি কমেডির স্বাদও পাবেন বলে আশা তাঁর।

সিনেমার প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়া শাকিল ও প্রত্যাশা পাল। শাকিলের এটি প্রথম সিনেমা। অন্যদিকে, গল্পটি প্রথম শোনার পর থেকেই এতে অভিনয় করাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যাশা। নির্মাতাদের আশা, গল্পের পরিচিত অভিজ্ঞতা ও চরিত্রগুলোর সঙ্গে দর্শক সহজেই সংযোগ তৈরি করতে পারবেন।

নিজেদের সামর্থ্যেই নির্মাণ, পথে ছিল বাধাও

সিনেমা নির্মাণের অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রযোজনার নানা আনুষ্ঠানিকতা সামলাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। প্রযোজক অনিমেষ জানিয়েছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল সীমিত। এফডিসিসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রয়োজনীয় কাজ করতে গিয়ে কীভাবে এগোতে হবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—এসব বুঝতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এ সুযোগে কয়েক জায়গায় প্রতারণার শিকার হয়ে তাদের প্রায় লাখ টাকা লোকসানও হয়েছে।

সিনেমার মোট বাজেট এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না নির্মাতারা। তবে কারিগরি মানের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো ছাড় দেননি বলে জানিয়েছেন। প্রযোজনার পাশাপাশি সহকারী পরিচালনার দায়িত্ব সামলেছেন অনিমেষ। শুরুতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের কথা থাকলেও পরে সেটির পরিধি বেড়ে যায়, চরিত্রটি পায় নিজস্ব গল্প ও আলাদা গুরুত্ব।

আরেক প্রযোজক বুয়েটের শিক্ষার্থী আবতাহী শামসের কাছে ‘অন্যপাতা’ একটি স্বপ্ন পূরণের গল্প। তাঁর মতে, এত মানুষের বিশ্বাস ও পরিশ্রমকে একসঙ্গে একটি গল্পে রূপ দিতে পারাটাই এ কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এখন সিনেমাটি দর্শকের হাতে তুলে দিয়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন নির্মাতারা।

ছয়টি মৌলিক গান, চট্টগ্রামের দৃশ্যপট

১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের সিনেমাটিতে রয়েছে ছয়টি মৌলিক গান ও আবহসংগীত। চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নৈসর্গিক ও প্রাকৃতিক দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। গল্প ও সংলাপে সমকালীন তরুণদের ভাষা, অভ্যাস ও জীবনযাপনের ছাপ রাখার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা।

সিনেমাটির কালার গ্রেডিং ও পোস্ট-প্রোডাকশনের পুরো কাজ করেছেন চুয়েটের তানভীর জানি। চিত্রগ্রহণে ছিলেন ইব্রাহিম বিন আনছারী। ছয়টি মৌলিক গানের সংগীত পরিচালনা করেছেন ফাহরিয়াজ তাসজিম, আবহসংগীত করেছেন আইনান। কাস্টিং ডিরেক্টর ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নোমান আহমেদ। কারিগরি ও শিল্পনির্দেশনায় ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দ্র নীল। থ্রি-ডি অ্যানিমেশন আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন বুয়েটের মাশরাফি ইসলাম। আর লাইন প্রডিউসারের দায়িত্ব সামলেছেন সদ্য এসএসসি পেরোনো সুদীপ্ত পাল।

[প্রথম আলোর প্রতিবেদন ও ‘বাহাছ’ সম্পাদক জুবায়রুল আরিফের ফেসবুক অবলম্বনে]


Leave a reply