আশির দশকের ঈদের সিনেমা
আশির দশকের শুরুতে ঢাকাই সিনেমার ব্যবসা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। দশকের শুরুতে ৪০/৫০টি ছবি মুক্তি পেলেও দশক শেষ হতে হতে এই সংখ্যা ৬০/৭০টিতে গিয়ে ঠেকে। আগে ঈদে যেখানে দুটি ছবি মুক্তি পেতো, সেখানে এখন ৪-৫টি করে ছবি মুক্তি পেতে থাকে। কখনও কখনও এই সংখ্যাও ছাড়িয়ে যায়। ফলে লটারি করা ছাড়া আর উপায় থাকে না। একাধিক ছবির মধ্য থেকে প্রযোজক-পরিবেশক সমিতি ৪টি বা ৫টি ছবিকে মুক্তির অনুমোদন দিতো।
আরো পড়ুন: নব্বই দশকের ঈদের সিনেমা

তবে এর মধ্যেও কায়দা করে বড় বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলো ঈদে ছবি মুক্তির মিছিলে ঢুকে যেত। যথাযথ প্রস্তুতি আর সমিতিতে প্রভাবের কারণে গুটিকয় প্রোডাকশন হাউজকে কখনোই ঈদ উৎসবের বাইরে রাখা যেত না। এখান থেকেই ঈদ সিনেমা শিল্পে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ঈদে কেবল ব্যয়বহুল ছবি মুক্তি পেতে শুরু করে। তারকাখচিত ছবিই কেবল উৎসবে ঠাঁই পেতে থাকে। ঈদ হয়ে ওঠে নির্মাতাদের সম্মানের লড়াই।
আলমগীর পিকচার্স, মাসুদ কথাচিত্র, পারভেজ ফিল্মস, এসএস প্রডাকশন্স, মধুমিতা মুভিজের দাপট দেখা গেছে আশির দশকজুড়ে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছরই ঈদে ছবি নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছে। দর্শক-প্রদর্শকদেরও প্রতীক্ষা থাকতো এই ব্যানারগুলোর ছবির জন্য। মধুমিতা মুভিজ একাই ‘মাসুম’, ‘ঈদ মোবারক’, ‘বাগদাদের চোর’, ‘দূরদেশ’-এর মতো ছবি ধারাবাহিকভাবে মুক্তি দিয়ে আশির দশকের ঈদ উৎসবগুলোকে ঝলমলে করেছে।
আর তারকাদের তো জবাবই নেই। তাদের টানেই বছরের দুই ঈদে ঢল নামতো সিনেমা হলে। রাজ্জাক, শাবানা, সোহেল রানা, রোজিনা, আলমগীর, অঞ্জু, ওয়াসীম, জসীম, অঞ্জনা—বলতে গেলে প্রথম সারির সব তারকার ছবিই থাকতো ঈদে। তারকাদের উচ্চতা মাপার একটা মাপকাঠিও হয়ে দাঁড়ায় ঈদ। ঈদে যার ছবি মুক্তি পেতো এবং ভালো চলতো, তারকা দৌড়ে সেই এগিয়ে যেতেন।
পরিচালকদের মধ্যে ঈদে সবচেয়ে বেশি ছবি মুক্তি পায় ইবনে মিজান ও এফ কবির চৌধুরীর। আশির দশকে সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকে নিঃসন্দেহে প্রথম দুটি আসন ফোক-ফ্যান্টাসি সিনেমার এই দুই ম্যাজিশিয়ানের। সামাজিক ছবির পরিচালকদের মধ্যে কামাল আহমেদের নাম না বললেই নয়। আর অ্যাকশন সিনেমার পরিচালক হিসেবে মাসুদ পারভেজ ও শহীদুল ইসলাম খোকনের নাম না নিলে অন্যায় হবে।
আশির দশকে ঈদে মুক্তি পেয়ে ব্যবসা করে চমকে দেয়, এমন ছবিগুলোর নাম বলতে গেলে বলতে হবে দীলিপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘অস্বীকার’, শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘লড়াকু’, ‘বীর পুরুষ’, গাজী মাজহারুল আনোয়ার পরিচালিত ‘সন্ধি’, মতিন রহমান পরিচালিত ‘রাঙা-ভাবী’, সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘স্বামী-স্ত্রী’, নায়করাজ পরিচালিত ‘চাপাডাঙার বউ’, কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘ভাঙাগড়া’, মিতা পরিচালিত ‘সাহেব’, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ‘অমর’, অশোক ঘোষ পরিচালিত ‘হিম্মতওয়ালী’, এ জে মিনটু পরিচালিত ‘লালু মাস্তান’ ইত্যাদির কথা।
ছবির ধরনের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, ফোক-ফ্যান্টাসি ছবি পুরো দশকজুড়ে দাপট দেখিয়েছে। সামাজিক ছবিও ভালো ব্যবসা করেছে। অ্যাকশন ছবিরও বাজার ধরতে অসুবিধা হয়নি। এমনকি সাহিত্যভিত্তিক ছবিও ঈদে চলেছে। বিচিত্র স্বাদের ছবি দর্শকরা ঈদে দেখেছেন। কখনও তলোয়ারবাজি জিতেছে, কখনও মার্শাল আর্ট জিতেছে। কখনও আবার দর্শক সিনেমা হলে হু হু করে কেঁদেছেন। বিনোদনের সমস্ত আয়োজন নিয়ে ভরপুর ছিল আশির দশকের ঈদ।






