
‘চক্কর ৩০২’ গল্পই যার নায়ক
চক্কর ৩০২; পরিচালক: শরাফ আহমেদ জীবন; অভিনয়ে: মোশারফ করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, তারিন জাহান, রওনক হাসান, মৌসুমী নাগ, শ্বাশত দত্ত, ইন্তেখাব দিনার, সুমন আনোয়ার।

রেড হেরিং নামে এক জাতের হেরিং মাছ আছে, অতীতে শিকারের প্রশিক্ষণে কুকুরের ঘ্রাণ বিভ্রান্ত করতে এর ধোঁয়া ব্যবহার করা হতো। কিন্তু হঠাৎ মাছের গল্প কেন? কারণ থ্রিলার জনরায় রেড হেরিং টার্মটা ব্যবহার করা হয় কোন বিভ্রান্তিকর ক্লু এনে মূল ঘটনা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া বোঝাতে। এবারের ঈদে মুক্তি পাওয়া থ্রিলার ঘরানার সিনেমা চক্করকে নিয়ে কথা বলার জন্যই হঠাৎ রেড হেরিং মাছের গপ্পো ফাঁদা।
সাদমান নামের এক যুবক হত্যার ঘটনাকে ঘিরে চক্করের গল্প। এই খুনের প্রধান সাসপেক্ট তারই বন্ধু রায়ানকে গ্রেফতার করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না পুলিশের। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতও অপরাধস্থলে রায়ানের উপস্থিতিকে ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু কোথায় যেন এক খটকা? ইনস্পেকটর মাঈনুলের মনের খটকার দ্বার ধরে প্রতি চক্করে বেরিয়ে আসে আমাদের বর্তমান সমাজের ডার্কসাইড আর সেই সাথে বাড়তে থাকে একজন করে সাসপেক্ট। চক্করের গল্প কি কেঁচো খুঁজতে গিয়ে সাপ বের করার নাকি অন্ধকার ঘরে অনুপস্থিত কালো বিড়াল খোঁজার তার উত্তর প্রেক্ষাগৃহে।
এক্সট্রিম লং শটে গ্রামের কিশোরদের নদীতে গোসল করার শট ছিল চক্করের ওপেনিং শট। পরের শটগুলো মিলে একটা খুনের দৃশ্য। প্রথম দৃশ্য থ্রিলারের Hook হিসেবে যথাযথ, সিনেমার শুরু কয়েক মিনিটের মধ্যেই দর্শকের মনোযোগ ধরা হয়ে গেলো। দ্বিতীয় দৃশ্যে ইনস্পেকটর মঈনুল আর তার সহযোগী সজীবের কথোপকথন আর ঘটনা পরম্পরায় দর্শকদের চরিত্রদ্বয়ের পেশা এবং ডিটেকটিভ হিসেবে মঈনুল যে ব্যতিক্রম তা জানতে আমাদের বাকি থাকে না। থ্রিলারে সাধারণত চরিত্রের ডেভেলপমেন্টের স্পেস থাকে কম। সংলাপ, সেট ও কস্টিউমের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার করে পরিচালক এই স্পেসের অভাব মিটিয়েছেন। একটা থ্রিলারের স্ট্রাকচারের যা যা থাকে Hook থেকে Final Twist সবই ছিল চক্করে।
চক্করের প্রধান শক্তি এর চিত্রনাট্য আর সংলাপে। তবে চলচ্চিত্রের গল্পের উপস্থাপনা আরো একটু জোরদার হওয়ার সুযোগ ছিল। চলচ্চিত্রটিতে চরিত্রের সংখ্যা অনেক বেশি। সম্ভাবনা ছিল চরিত্রের ভারে গল্প ঝুঁকে পড়ার, কিন্তু শরাফ আহমেদ জীবন ভালোই সামলিয়েছেন। রেড হেরিং সৃষ্টির কাজ করেছেন চরিত্রগুলোর ব্যবহার্য জিনিসপত্র দিয়ে। কিন্তু, সমস্যা হলো সব সাসপেক্টের জোরালো মোটিভ তৈরি হয়নি। থ্রিলারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা থাকে থ্রিল। সিনেমার সেকেন্ড এক্টে পরিচালক কিছু সাবপ্লট তৈরি করে একটা ইমোশনাল অ্যাম্বিয়েন্স সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। মূল কনফ্লিক্ট শুরু হওয়ার আগে এই স্পেসটা খুব সম্ভবত কনফ্লিক্টকে জোরালো করার জন্যই করা, তবে আমার মনে হয়েছে অপ্রয়োজনীয় এই সংযোজন গল্পকে স্লো করে দিয়েছে। সিনেমাটির ক্লাইমেটিক কনফ্রন্টেশনটাও আরেকটু জোরালো হতে পারতো।

মোশারফ করিমের অভিনয় নিয়ে কি সত্যিকার অর্থে নতুন করে কিছু বলার আর অবশিষ্ট আছে? খুব সম্ভবত না। দুর্দান্ত কমিক সেন্স, দর্শককে ইনটেন্স মুহূর্তে স্পেস দিয়ে পরবর্তী ধাক্কা সামলানোর সুযোগ দিয়েছে। ইন্টারোগেশন রুমে হাসতে হাসতে হঠাৎ মুড পরিবর্তনের দৃশ্যটার কথা না বললেই নয়। কখনো পাক্কা ফ্যামিলি ম্যান, কখনো প্রতিপক্ষ ত্যাদড় সন্ত্রাসীকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন নিজস্ব ঢংয়ে চরিত্রের দুটোই শেডই simultaneously দুর্দান্ত সামলিয়েছেন মোশারফ করিম। রিকিতা নন্দিনী শিমুর সাথে তার রসায়ন ভালোই জমেছে। থ্রিলারের মাঝেও বোরিংনেস আনেনি, বরং নতুন মাত্রা দিয়েছে। নতুন হোক বা পুরাতন জীবন প্রায় সবার থেকেই দুর্দান্ত অভিনয় বের করিয়ে এনেছেন। একমাত্র অভিনেতা হাসান চৌধুরীর চরিত্রে রওনক হাসানকেই যা একটু আড়ষ্ট মনে হয়েছে। গণ্ডার বাবুর চরিত্রে সুমন আনোয়ারের প্রশংসা না করলেই না। ইন্সপেক্টর মঈনুলকে টক্কর দেয়ার জন্য সেইম ধাঁচের আরেকটা চরিত্র ও অভিনেতা দরকার ছিল। সেই প্রয়োজন মিটিয়েছেন সুমন আনোয়ার, একই সাথে ধারণ করেছেন কমেডি আর নিষ্ঠুরতা। বাকিরা চরিত্র অনুযায়ী যথাযথ। একদম আনকোড়া তিনজন তরুণ-তরুণীও তাদের সেরাটা দিয়েছেন, তাদের জেনারেশনকে ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলেছেন।
চক্করে বেশ আকর্ষণীয় কিছু ড্রোন শট ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষত চেজিংয়পর দৃশ্যে এমন টপ শট সবসময় দারুন। কালার গ্রেডিং দৃষ্টিসুখকর। সিনেমা জুড়েই ন্যাচারাল লাইটকে খুব ভালোভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা একটা স্বাভাবিকত্ব ও ধারাবাহিকতা তৈরী করেছে। বেশকিছু হ্যান্ড হোল্ড শট দিয়ে ছবিতে সেন্স অফ রিয়েলিজম আনার চেষ্টা লক্ষণীয়, তবে ক্লোজ শটে ক্যামেরা শেকিনেসটা একটু বিরক্তিকরই। সম্পাদনার কাজ ছিমছাম। বিজিএম বেশ চওড়া। এই একটা জায়গায় আসলে অনুযোগের জায়গা অনেক। ইফেক্ট সাউন্ডকে অর্থবহ ব্যবহারের সুযোগ থাকে এ ধরণের চলচ্চিত্রে, পরিচালক সেই সুযোগ নেননি।
গল্পই চক্করের নায়ক। যারা গল্প নির্ভর একটা থ্রিলার সিনেমার ভক্ত “চক্কর” তাদের জন্যই। থ্রিলারের ব্যাকরণ মেনে বানানো চক্করের চরিত্রগুলো লার্জার দেন লাইফ না, বরং স্বাভাবিকতা চক্করের সম্বল। সিনেমার গল্পে ছিল দর্শকদের আকর্ষণ ও চ্যালেঞ্জ দুইয়েরই উপকরণ। বুদ্ধি কিন্তু বাদাম খাইলে বাড়ে না, বাড়ে উষ্ঠা খাইলে।