Select Page

ঢালিউডে এক সিনেমার ঝলক নাকি দীর্ঘ দৌড়? বড় পরীক্ষায় নির্মাতারা

ঢালিউডে এক সিনেমার ঝলক নাকি দীর্ঘ দৌড়? বড় পরীক্ষায়  নির্মাতারা

বাংলাদেশি সিনেমায় ২০০০-পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ গত দুই দশকে কয়েকটি মুহূর্ত এসেছে, যেগুলো শুধু একটি চলচ্চিত্রের সাফল্য নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রির দিক বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত ছিল। নতুন প্রজন্মের কয়েকজন নির্মাতা তাদের প্রথম বা প্রথমদিকের কাজ দিয়ে দর্শককে বুঝিয়েছিলেন—দেশীয় সিনেমাও গল্প, নির্মাণশৈলী ও কারিগরি মানে নতুন উচ্চতায় যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সম্ভাবনা কতজন ধরে রাখতে পেরেছেন?

এমন প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় উদাহরণ গিয়াসউদ্দিন সেলিম। ২০০৯ সালে তার ‘মনপুরা’ মুক্তির পর অনেকেই বলেছিলেন, বাংলা সিনেমা নতুন ভাষা পেয়েছে। লোকজ আবহ, সংগীত, প্রেম ও ট্র্যাজেডিকে যেভাবে তিনি মিশিয়েছিলেন, তা দীর্ঘদিন দর্শকের মনে ছিল। একইভাবে অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ‘আয়নাবাজি’ (২০১৬) নগরজীবনের মনস্তত্ত্ব, অভিনয় ও চিত্রভাষার কারণে এক ধরনের কাল্ট মর্যাদা পায়। আর দীপঙ্কর দীপনের ‘ঢাকা অ্যাটাক’ (২০১৭) প্রমাণ করে, বাংলাদেশেও বড় স্কেলের অ্যাকশন-থ্রিলার বানানো সম্ভব।

অমিতাভ রেজা চৌধুরী, মেজবাউর রহমান সুমন, গিয়াসউদ্দিন সেলিম ও দীপংকর দীপন

দীপঙ্কর দীপন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে চেয়েছিলেন ‘যা বড় পর্দা ছাড়া উপভোগ করা যাবে না।’ একইসঙ্গে তিনি গল্পকে ‘অপ্রত্যাশিত’ রাখার ওপর জোর দিয়েছিলেন।এই দর্শনই ‘ঢাকা অ্যাটাক’কে শুধু পুলিশি অ্যাকশন সিনেমা না রেখে এক ধরনের ইভেন্টে পরিণত করেছিল।

এ চলচ্চিত্রগুলো শুধু ব্যবসাসফল হয়নি; এগুলো নতুন দর্শকও তৈরি করেছিল। মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি, তরুণ দর্শকের আগ্রহ, সোশ্যাল মিডিয়ায় সিনেমা নিয়ে আলোচনা—সবকিছুর সঙ্গে এ নির্মাতাদের কাজ জড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রথম সাফল্যের পর সেই ধারাবাহিকতা আর খুব বেশি দেখা যায়নি।

গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরবর্তীতে ‘স্বপ্নজাল’ দিয়ে প্রশংসা পেলেও ‘মনপুরা’র মতো সাংস্কৃতিক অভিঘাত তৈরি করতে পারেননি। অমিতাভ রেজার পরবর্তী চলচ্চিত্র বা ওয়েব কাজ নিয়ে আলোচনা হলেও ‘আয়নাবাজি’র মতো সর্বজনীন উন্মাদনা আর দেখা যায়নি। তার ‘রিকশা গার্ল’ একদমই আলোচনায় ছিল না। দীপঙ্কর দীপনও ‘অপারেশন সুন্দরবন’ বা ‘অন্তর্জাল’ নির্মাণ করলেও ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর প্রত্যাশা ছুঁতে পারেনি। অর্থাৎ, একটি যুগান্তকারী প্রথম সিনেমা নির্মাতাকে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবশালী করে তুলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বিনিয়োগের অভাব, শক্তিশালী স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট সংস্কৃতি না থাকা, সীমিত প্রেক্ষাগৃহ এবং দর্শকের অনিশ্চিত রুচি—সব মিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে মানসম্পন্ন কাজ করে যাওয়া কঠিন। ফলে অনেক নির্মাতা প্রথম সাফল্যের পরই প্রত্যাশার ভারে আটকে যান।

এ জায়গায় মেজবাউর রহমান সুমনের নাম আলাদা করে আসে। ‘হাওয়া’ (২০২২) শুধু একটি হিট সিনেমা নয়; এটি বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করেছিল। লোকজ মিথ, সাগরজীবন, মনস্তাত্ত্বিক রহস্য এবং আধুনিক নির্মাণভাষার মিশ্রণে সিনেমাটি এমন এক দর্শকশ্রেণি তৈরি করে, যারা আগে নিয়মিত বাংলা সিনেমা দেখত না। ‘হাওয়া’র পর ইন্ডাস্ট্রিতে কনটেন্টনির্ভর ও ভিজ্যুয়ালি শক্তিশালী চলচ্চিত্র নিয়ে নতুন আগ্রহ দেখা যায়।

সিনেমাটি মুক্তির পর প্রতিক্রিয়ায় সুমন বলেছিলেন, তিনি এমন গল্প বলতে চান, যা বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের ভেতর থেকেই উঠে আসে। এই বক্তব্যই আসলে ‘হাওয়া’র শক্তি—এটি আন্তর্জাতিক প্রভাবের অনুকরণ নয়, বরং স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে আধুনিক সিনেমা ভাষায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা।

এখন তাই তার নতুন চলচ্চিত্র ‘রইদ’কে ঘিরে প্রত্যাশা শুধু একটি সিনেমা নিয়ে নয়; বরং এটি এক ধরনের পরীক্ষাও। সুমন যদি দ্বিতীয় কাজেও শিল্পমান ও দর্শকপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেন, তবে বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাবে—এখানে একবারের বিস্ময় নয়, ধারাবাহিক নির্মাতাও তৈরি হতে পারে।

অবশ্য মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে বাদ দিয়ে এ আলোচনা করা যাবে না। ২০০৪ সালের ‘ব্যাচেলর’-এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি। প্রথম সিনেমার মতো পরেরটি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ততটা জনপ্রিয়তা না পেলেও পরবর্তীতে ‘টেলিভিশন’-এর মতো হিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন। তবে তার সাফল্য উপরে উল্লেখিত নির্মাতাদের সঙ্গে মেলানো যাবে না। এছাড়া সাম্প্রতিক বাংলা সিনেমায় উজ্জ্বল একটি নাম আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ ও ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ নিজের প্রথম দুই সিনেমায় দারুণ স্বকীয় বজায় রেখেছেন। ছবিগুলো বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলেও ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে পেয়েছে সমাদর।

এছাড়া আগে প্রথম সিনেমায় বাজিমাত করেছিলেন সালাহউদ্দিন লাভলু (মোল্লাবাড়ির বউ), এসএ অলিক (হৃদয়ের কথা) বা সৈকত নাসির (দেশা দ্য লিডার)। এর মধ্যে লাভলু আর সিনেমা করেননি। বাকি দুজনের সিনেমা সাময়িক প্রশংসা পেলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো ফল যোগ করেনি ইন্ডাস্ট্রিতে।

অন্যদিকে, ব্যর্থতা থেকে ফিরে আসার গল্পও আছে। হিমেল আশরাফের প্রথম চলচ্চিত্র ‘সুলতানা বিবিয়ানা’ প্রশংসিত হলেও সাড়া ফেলতে পারেনি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর ‘প্রিয়তমা’ দিয়ে তিনি বাণিজ্যিকভাবে বড় প্রত্যাবর্তন করেন। অবশ্য এর পরের ‘রাজকুমার’ তাকে ব্যর্থতার স্বাদ এনে দেয়। একইভাবে তানিম নূরের প্রথম ছবি ‘ফিরে এসো বেহুলা’ সীমিত দর্শকের মধ্যে প্রশংসিত হলেও পরে তিনি গল্প বলার ধরন ও দর্শকসংযোগ—দুই ক্ষেত্রেই পরিণত নির্মাতা হিসেবে জায়গা করে নেন। পরপর দুটি হিট সিনেমা ‘উৎসব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ উপহার দিয়েছেন সম্প্রতি।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, একজন নির্মাতার ক্যারিয়ার শুধু প্রথম চলচ্চিত্র দিয়ে বিচার করা যায় না। কেউ প্রথম সিনেমাতেই ইতিহাস গড়েন কিন্তু পরে হারিয়ে যান; আবার কেউ ধীরে ধীরে নিজের ভাষা খুঁজে পান। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো ধারাবাহিকতা। কারণ একটি আলোচিত সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে সাময়িক উত্তেজনা দিতে পারে, কিন্তু কয়েকজন নির্মাতার দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা পুরো শিল্পকে বদলে দিতে পারে।


Leave a reply