দম : শ্বাস ও আশ
প্রবাদে আছে ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ’..
‘দম’ এই শ্বাস ধরে রেখে আশা না হারানোর ছবি। যত প্রতিকূলতা থাক না কেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা ধরে রেখে প্রতিকূল থেকে অনুকূল পরিবেশে আসার দৈহিক ও মানসিক শক্তির ছবি।

ট্রু ইভেন্টের ছবি ‘দম’, সেদিক থেকে বাস্তবসম্মত। সত্য ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ছবির শেষে সেই ব্যক্তির পরিচিতি যোগ করা হয়েছে এটা নির্মাতা রেদওয়ান রনি-র সততার প্রমাণ ছিল।
ছবির গল্পটা সহজ। শাহজাহান ইসলাম নূর বা নিশো যে এ ছবির প্রধান চরিত্র। সংসারী একজন মানুষ যার এনজিও কর্মী হিসেবে সাংসারিক উন্নতির জন্য আফগানিস্তানে যায় এবং সেখানে গিয়ে তার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। তারপর শুরু হয় তার বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে নিশো শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবে কিনা সেটাই ছবির গল্পের শীর্ষবিন্দু।
প্রধান চরিত্রের সাথে তার আপনজনের দূরত্ব ও যোগাযোগ বোঝানোর জন্য যে সাইনগুলো ব্যবহার করা হয়েছে ছবিতে সেগুলো ছিল দারুণ। প্রাচীনকালে মানুষ নাকি পায়রা দিয়ে খবর পাঠাত ‘দম’ ছবিতে সেই পায়রার কাল্পনিক যোগাযোগ ভৌগোলিক দূরত্বকে ছাপিয়ে আত্মিক যোগাযোগে পরিণত করেছে। ছবির অন্যতম সুন্দর দৃশ্যায়ন ছিল এটি।
সারভাইভাল ইস্যু থাকার কারণে নিশোর চরিত্রের ব্যাপ্তি ও অভিনয়ের জায়গাও ছিল বেশি। তার চরিত্রে একইসাথে অস্তিত্ব রক্ষা, জাতিগত গর্ববোধ ও রাজনৈতিক শিকার এ ত্রিভুজ বৈশিষ্ট্য যোগ হয়েছে। আফগানিস্তানের সেই অঞ্চলের স্থানীয় প্রশাসনিক জটিলতায় নিশো একজন বন্দী যে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অস্তিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে কখনো সুযোগ সামনে এলেও নৈতিকতার কারণে তা কাজে লাগাচ্ছে না। নিশোর চরিত্রে এভাবে সততার গভীরতা প্রকাশিত হয়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার মুখ থেকে বের হয়ে আসা ‘আমি শাহজাহান ইসলাম নূর, বাংলাদেশী মুসলমান’ বলার মধ্য দিয়ে জাতিগত গর্ববোধ অসাধারণভাবে প্রকাশ পায় এবং তার অভিনয়ের শক্তিও এতে পরিপূর্ণভাবে বোঝা যায়। আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের যে অতীত ইতিহাস আমরা দেখি তারও প্রাসঙ্গিক উপস্থাপন দেখতে পাই। নূরের মুক্তির যে প্রসেস দেখানো হয় সেখানেও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের একটা সূক্ষ্ম উপস্থাপন আছে। এই পয়েন্টগুলোতে ‘দম’ টিম স্ট্রংলি কাজ করেছে।

কিন্তু?
কিন্তু ‘দম’ ছবির স্লো স্টোরি টেলিং অনুযায়ী এর রানটাইম আরো দরকার ছিল। রানটাইম যদি আরো কিছুটা হত তাহলে ডিটেইলিং-এ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগ করা যেত যেটা ছবিটির গল্পকে আরো বৈচিত্র্য দিত। কি যেন আরো নেই এরকম একটা অনুভূতি কাজ করে তাই ডিটেইলিং কিছুটা জরুরি ছিল। এসূত্রে অমিতাভ বচ্চন ও অক্ষয় খান্নার ‘Dewaar’ মুভির রেফারেন্স টানা যায়। এ মুভিতে দেখানো হয়েছে পাকিস্তানের দুর্গম অঞ্চলে তারা বন্দী হিসেবে থাকে এবং মুক্ত হবার জন্য তাদের নিজেদের যে সংঘবদ্ধ পরিকল্পনা এটা ছিল মুভির দুর্দান্ত একটা পার্ট তার সাথে তাদেরকে মুক্ত করার জন্য মুভির অন্যান্য চরিত্রের যে তৎপরতা সেখানে অনেক ডিটেইল কাজ আছে। ‘দম’-এ এরকম কিছুর প্রয়োজন ছিল।
অভিনয়, দৃশ্যায়ন, গান এ দিকগুলোতে ছবির কোনো কমতি নেই। নিশোর ডেডিকেশন তার শাহজাহান ইসলাম নূর চরিত্র হয়ে ওঠার মধ্যেই প্রমমাণিত। ‘আমি নূর মুসলমানকা বাচ্চা’ সংলাপের যে গুজবাম্প ফিল হয় সেটা নিশোর অভিনয়শক্তিকে তুলে ধরে। দ্বিতীয় অবস্থান নিঃসন্দেহে পূজা চেরী-র। পূজাও তার চরিত্রে নিখুঁতভাবে ডুবে গিয়ে অভিনয়টা করেছে। আপনজনকে খুঁজে পেতে যে টেনশন, চেষ্টা, শরীরে তার প্রভাব সবকিছু তার চরিত্রে বিদ্যমান। নিশোর সাথে কাল্পনিক যোগাযোগের দৃশ্যগুলোতে পূজার উপস্থিতি ছিল শৈল্পিক। আবুল হায়াতের মতো কিংবদন্তি অভিনেতার সামনে পূজার অসাধারণ অভিনয় তার ভবিষ্যতের বড় অভিনেত্রী হবার ইঙ্গিত দেয়। ডলি জহুর নিশোর মায়ের চরিত্রে ওল্ড ইজ গোল্ডের মতো। চঞ্চল চৌধুরীর চরিত্রটি ছিল অক্সিজেনের মতো যার কাজ ছিল প্রধান চরিত্রকে বাঁচিয়ে রাখা এবং যথারীতি অসাধারণ অভিনয়। সেওতি স্বল্প চরিত্রে ন্যাচারাল। আফগানিস্তানের লোকাল অংশে সেখানকার অভিনয়শিল্পীদের অভিনয়ও ন্যাচারাল ছিল বিশেষ করে নিশোর সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা চরিত্রটি বাঙালির মতোই ছিল।
ছবির দৃশ্যায়নে বেশকিছু অর্থবহ দৃশ্য ছিল এবং শেষের মরুভূমির দৃশ্যটি ছিল সেরা। ‘কোথায় পাবো তাহারে’ নিঃসন্দেহে ছবির সেরা গান এবং বিশেষ গান ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’ কবিতা থেকে নির্মিত গানটি। নজরুলের বাণীর সাথে শিল্পীর দরাজ কণ্ঠ গুজবাম্প ফিল করায় যা অসাধারণ ছিল।
যেতে যেতে এ কথা বলতে হয় কমার্শিয়াল ছবিতে পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি তার অন্যতম একটি পদক্ষেপ হয়ে থাকবে ‘দম’ ছবি।
বি: দ্র :মনে রাখতে হবে : দম থাকলে ঠেকায় কে?
রেটিং ৭.৫/১০






