Select Page

নফস ও রুহের দ্বন্দ্ব ‘চক্র ২’

নফস ও রুহের দ্বন্দ্ব ‘চক্র ২’

ভিকি জাহেদ ওটিটি ইন্ডাস্ট্রির নির্ভরযোগ্য নাম। তাঁর কাজের যে স্বকীয়তা সেটাই তাঁকে সহজে বাকি নির্মাতাদের থেকে আলাদা করেছে। মানসম্মত কাজের ধারাবাহিকতা থেকেই ‘চক্র’ সিরিজের দ্বিতীয় সিজন তাঁর পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছে।

‘চক্র ২’ যদি কেউ নতুন দর্শক হিসেবে দেখতে চায় তাহলে তাকে প্রথম সিজনটা দেখে নিতে হবে তাহলে গল্পের সাথে নিজেকে কানেক্ট করতে পারবে। প্রথম সিজনে ট্রু ইভেন্টের গল্প ছিল। ময়মনসিংহে একই পরিবারের নয় সদস্যের আত্মহত্যার ঘটনায় দেশে যে আলোড়ন বয়ে গিয়েছিল সেই ঘটনার অনুপ্রাণিত শিল্পরূপ ছিল ‘চক্র’-র প্রথম সিজন। দ্বিতীয় সিজনে সেই গল্পের জিস্ট থেকে এক্সটেন্ডেড ডার্ক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে ‘চক্র ২’ নির্মিত হয়েছে।

ভিকি জাহেদের স্বকীয়তা অনুযায়ী তাঁর এক্সপেরিমেন্টাল দিকগুলো খুব সূক্ষ্মভাবেই এ সিজনে এসেছে। গল্পের দার্শনিক দিকটিতে রিলিজিয়াস টোনই প্রধান যেখানে ‘নফস’ বা কুপ্রবৃত্তি যাকে ইবলিশ শয়তানের রূপে এবং ‘রূহ’ বা মাটির মানুষের দৈহিক আত্মার বৈপরীত্যকে দেখানো হয়েছে। পাপ ও প্রায়শ্চিত্তের অবধারিত বাস্তবতার মাঝে অনুঘটক হিসেবে শয়তান ও বিশ্বাসী মানবসন্তানের দার্শনিক দ্বন্দ্বই এখানে থ্রিলার তুলে ধরে। কে দাসত্ব করে আর কে করে না এর মাধ্যমে নির্ধারণ হচ্ছে সমস্ত আয়োজন।

গল্পের এই রহস্যময়তায় সেন্টার পয়েন্ট হিসেবে তৌসিফ মাহবুবের তৈরি করা জালচক্রে একের পর এক শিকার আসতে থাকে। তার জয়রথ কতদূর পর্যন্ত গড়াবে, তার অনুগত দাসরা কতটুকু পথ পৌঁছাতে পারবে সেটাই সিজন ২-এর লক্ষ্যবস্তু।

রক্ত, মার্ডার ওয়েপন, নৃশংসতা, লাল রং-এর আধিক্য এগুলো নফসের উপাদান হিসেবে এবং এর বিপরীতে সাদা রঙের দেয়ালে আরবি আয়াত, খাটিয়া, মৃতের সাথে কাল্পনিক কথোপকথনে ইবাদত সংক্রান্ত বিষয় ভিজ্যুয়ালাইজ করা হয়েছে। ভিজ্যুয়ালাইজেশনের এ পার্থক্যের মধ্য দিয়েই পরিচালক তাঁর বক্তব্যকে পরিষ্কার করেছেন। সেট ডিজাইনের ভেতর এর সবগুলোই উঠে এসেছে আর্টিস্টিক ওয়েতে।

মানবচরিত্রের চেয়ে ‘হিচ’ চরিত্রটি বেশি গভীর এবং মানুষের ভেতর ও বাইরের চালাকি ধরিয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে যা একটা পাপেট শোর মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছে। পাপেট শো-র মাধ্যমে যেন গভীরভাবে এটাও নির্মাতা বলতে চেয়েছেন আমরা সবাই পাপেট শো-র মতোই পুতুল যেন শুধু খেলার শিকার হচ্ছি কোনো এক শক্তিবলে। ‘হিচ’-এর নামকরণের মধ্যে বিখ্যাত পরিচালক আলফ্রেড হিচককের নামের সাদৃশ্য লক্ষণীয় কারণ তার নির্মিত ফিল্মগুলোও এমন এক্সপেরিমেন্টাল ছিল।

তৌসিফ মাহবুবের অভিনয় নাটকে খুব কমই দৃষ্টি আকর্ষণ করে তবে এ সিজনে নির্মাতা তাকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিয়েছেন, তার ন্যাচারাল অভিনয় করার চেষ্টা প্রশংসনীয়। আজমেরি হক বাঁধনের চরিত্রটি জটিল এবং তার অভিনয় ছিল দেখার মতো। মেঘলা মুক্তা ইম্প্রেসিভ। মৌসুমী মৌ-কে দিয়েও ভিন্নধর্মী কাজ করিয়ে নিয়েছেন যা তাকে আগে করতে দেখা যায়নি। দিলরুবা দোয়েল, নাদের চৌধুরী, মোমেনা চৌধুরী, শাহেদ আলী যার যার জায়গায় চমৎকার। এ কে আজাদ সেতুর এক্সপ্রেশনগুলো ভালো লাগার মতো।

লক্ষণীয় বিষয় নারী চরিত্রগুলোর এস্টাব্লিশমেন্ট এ সিজনে শক্তিশালীভাবে এসেছে।

ইতোমধ্যে সিজন তিনের আভাস দেয়া হয়েছে। ভিকি জাহেদের এক্সপেরিমেন্ট যে হাই থটের দিকে এগিয়েছে তৃতীয় সিজনে সেটার পূর্ণতা আসবে এ প্রত্যাশা থাকল।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply