আফজাল হোসেনের শ্রদ্ধাঞ্জলিবাচ্চু ভাই স্ক্রিপ্ট দেখে বললেন, তুমি তো ছবি বানিয়েই ফেলেছো
(সদ্য প্রয়াত নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক আব্দুল লতিফ বাচ্চুকে স্মরণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন অভিনেতা ও নির্মাতা আফজাল হোসেন)
চলচ্চিত্র জগতের ঝলমলে কালের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেলো। আব্দুল লতিফ বাচ্চু, বাচ্চু ভাই ছিলেন চিত্রগ্রহক, চিত্র পরিকল্পক ও পরিচালক। তিনি ছিলেন দেশের বিশেষ এবং আমাদের ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান মাত্রার অতি কাছের মানুষ, বিশেষজন।

আমরা, আমি আর সানাউল আরেফিন ১৯৮৪ তে একটা স্বপ্ন নিয়ে মাত্রা শুরু করি। স্বপ্নটা ছিল, বিজ্ঞাপনে নতুন ধারণা যোগ করে ক্ষেত্রটা পাল্টে দেবার। তরুণকালে এমন সাহসই থাকে।
সে সময়টা ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। কোনো স্বপ্ন দেখার সাহস করলে তা পূরণের জন্য চারপাশের মানুষদের কেউ না কেউ আপন হয়ে পাশে এসে দাঁড়াতো। সে জন্যেই বলা শ্রেষ্ঠ সময়। নিজেদের জীবনের নয়, দেশের শ্রেষ্ঠ সময়।
একটা নতুন পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান পিয়ারসন্স সেই ৮৪ তে যাত্রা লগ্নে ভাবলো বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মান করবে। আমরা তখন কেবল একটা ছোট অফিস নিয়ে বসেছি। বসেছি মানে, সকালে অফিসে যাওয়া অভ্যাস করি। যাই, বসি। চা খেতে খেতে ভাবি, কোথায়, কার কাছে গিয়ে বলবো, আমরা কাজ করতে চাই। চা শেষ করে বুকে মনে আশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
একদিন গেলাম পিয়ারসন্সের প্রধান আব্দুল হালিম গজনবীর কাছে। ইচ্ছার কথা জানালাম, তিনি শুনলেন। বলা শেষ হলে তিনি প্রশ্ন করলেন না, বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মানের অভিজ্ঞতা আছে কি না! সে প্রশ্নটা করলে সেদিন, সেখানেই নতুন দেখা স্বপ্নটা হয়তো হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতো।
তিনি বলেছিলেন, পিয়ারসন্স নতুন, আপনারাও নতুন, দেখা যাক দুই নতুনে মিলে আলাদা কি হয়। জীবনের প্রথম চেষ্টা বৃথা গেলো না। মনে হয়েছিল আমাদের সামনে কারুকার্য খচিত সোনালী রঙের একটা সিংহদুয়ার খুলে গেলো। খোলা দরজার ওপারে দেখতে পাই টকটকে লাল রঙের একটা সূর্যের উদয় হচ্ছে।
রাতে ঘুম আসে না, আনন্দে এবং একইসাথে দুশ্চিন্তাতেও। দুশ্চিন্তা হচ্ছে, বিজ্ঞাপনচিত্রটা কিভাবে, কেমন করে হবে? মনে মনে অনেক ভেবে কাগজে ছবি এঁকে রেখেছি। মনে মনে নির্মিত হওয়া ছবিটা দেখতেও পাই কিন্তু কিভাবে সেটা নির্মান করা যাবে, সহজ না কঠিন হবে বুঝতে পারছি না।
মনে চাপ তৈরি হয়। চাপ বাড়ে। ধারণা করা আছে, পদ্ধতিও আবছা আবছা জানা কিন্তু সে ধারণা তো খুব আরাম দেয়া, স্বস্তি পাওয়ার মতো নয়।
পরদিন বাচ্চু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। মনে পড়তে ভয় গেলো পালিয়ে। মনে এসে গেলো স্বস্তি।
আব্দুল লতিফ বাচ্চু, বাচ্চু ভাইকে ফোন করে বিস্তারিত বললাম। বাচ্চু ভাই বললেন, সন্ধ্যাবলায় এসে চা খাও, শুনি বুঝি বিজ্ঞাপন জিনিসটা কি। আমি তো সিনেমার মানুষ, বিজ্ঞাপনচিত্র আর ফিল্মের পার্থক্য কি আগে সেটা বুঝে নেই।
স্ক্রিপ্ট নিয়ে বাসায় যেতে বলেন। আমি আর সানা গেলাম সন্ধ্যায়। স্ক্রিপ্ট বলতে পাঁচটা পৃষ্ঠায় কেমন কেমন দৃশ্য গ্রহন করা হবে, অনেকগুলো ছবি এঁকে বিস্তারিত বর্ণনা লিখে রাখা ছিল, দিলাম তাঁর হাতে।
বাচ্চু ভাই স্ক্রিপ্ট দেখে বললেন, তুমি তো ছবি বানিয়েই ফেলেছো, আমি শুধু এই আঁকা ছবিগুলো দেখে ক্যামেরায় ছবি তুলে দিলেই হলো। স্ক্রিপ্টটা বারবার তিনি নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে বলছিলেন, এতবছর সিনেমার সাথে যুক্ত রয়েছি, এইভাবে চলচ্চিত্রের স্ক্রীপ্ট লেখা যেতে পারে, জীবনে এই প্রথম দেখলাম।
একজন অভিজ্ঞ মানুষের দেয়া এই সাহস, অনুপ্রেরণায় জীবনের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল। এ জীবনকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পেরেছিলাম। জানতে পেরেছিলাম, মানুষের পাশে মানুষ থাকলে জীবন আনন্দের হয়, মধুর ও সহজ হয়।
মানুষটা চলে গেলেন, মানুষদের যেতেই হয়। সে দুঃখের চেয়ে অনেক বেশী কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে, সূবর্ণযুগের অসাধারণ মানুষগুলো একে একে জগত থেকে প্রস্থান করছেন। এভাবেই তো নেই হয়ে যাচ্ছে ভরসা, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা। সম্পর্কে থাকছে না সম্মান, মুছে যাচ্ছে জীবনের নানা গৌরবময় অধ্যায়।
অকৃতজ্ঞ, অসন্তুষ্টচিত্তের এই আমরা কিছুদিন সাহস, অনুপ্রেরণাদান করা, চলে যাওয়া মানুষদের মনে রাখবো তারপর একদিন বেমালুম সবাইকে ভুলে নিজেদের উষ্ণতাহীন জীবন উপভোগ করে যাবো।
আমাদের এই অস্তিত্ব টিকে থাকবে ফাঁকা বুলি, গালি, একে অপরের কুৎসা গেয়ে আর অযথা হালুম হুলুমে।






