Select Page

শাকিব খান ও দর্শক আস্থার মাঝে দেয়াল তুলে দিয়েছে ‘প্রিন্স’

শাকিব খান ও দর্শক আস্থার মাঝে দেয়াল তুলে দিয়েছে ‘প্রিন্স’

নব্বই দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডকে কেন্দ্র করে বানানো ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ শুরু থেকেই একটা বড় স্কেলের গ্যাংস্টার ড্রামা হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। শুরুটা খানিকটা রহস্যঘেরা হলেও খুব দ্রুতই সেই আবহ ভেঙে প্রিন্স চরিত্রকে সামনে আনা হয়, আর গল্প ঢুকে পড়ে তার উত্থানের পথে। নন-লিনিয়ার স্টাইল ব্যবহার করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটার ভেতরে কোনো আলাদা চমক তৈরি হয়নি। বরং পুরো বিষয়টা অনেক সময় সোজাসাপ্টা ধারায় এগিয়ে যেতে পারত বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু তারপরও সাসপেন্স তৈরি করতে ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে। 

প্রথমার্ধে গল্প ধীরে ধীরে এগোয়। এমন ধীরগতির গল্প বলায় সমস্যা নেই, যদি সেটার ভেতরে টেনশন বা আগ্রহ তৈরি করা যায়। এখানে সেই জায়গাটাই একটু বেশ দুর্বল এই ছবি। প্রিন্স কীভাবে বড় হচ্ছে, কীভাবে তার চারপাশে একটা দুনিয়া তৈরি হচ্ছে; এসব দেখানো হলেও তা খুব বেশি ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে পারে না। গ্যাংস্টার জার্নির কিছু পরিচিত ট্রোপ বারবার ফিরে আসে, যেগুলো নতুনভাবে উপস্থাপন না হওয়ায় আলাদা করে মনে দাগ কাটতে পারে না। আপনার বারবার মনে হবে, এমন গ্যাংস্টার গল্পের ছবি বহু দেখা হয়েছে!

অ্যাকশন বা গুলির দৃশ্যগুলো মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু সেগুলো গল্পের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে না এসে অনেক সময় আলাদা করে বসানো মনে হয়। ফলে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন তৈরি হয়, কিছুক্ষণ গল্প, তারপর হঠাৎ অ্যাকশন। বিরতির আগে একটা শক্তিশালী মুহূর্ত তৈরি হলেও সেটার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। বরং দ্বিতীয়ার্ধে এসে সেই গতি হঠাৎ করেই নেমে যায় একদম।

দ্বিতীয়ার্ধে গল্প যখন প্রিন্সের সাম্রাজ্য আর তার নিয়ন্ত্রণের দিকে যায়, তখন চিত্রনাট্য অনেকটাই ছড়ানো ছিটানো হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ঘটনাকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা আছে, কিন্তু সেগুলো খুব স্বাভাবিকভাবে মেলে না। ক্লাইম্যাক্সে এসে কিছুটা গুছানোর চেষ্টা করা হলেও ততক্ষণে গল্পের গভীরতা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। পুরো যাত্রাটা শেষ পর্যন্ত তেমন একটা সন্তুষ্টি দিতে পারে না।

অভিনয়ের জায়গায় শাকিব খানই সিনেমার মূল ভরসা। তার স্ক্রিন প্রেজেন্স, স্টাইল, সব মিলিয়ে তিনি চরিত্রটিকে যতটা সম্ভব টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কস্টিউম ও লুকেও তাকে মানিয়েছে ভালো। তবে নারী চরিত্রগুলো এখানে বড় এক মিসড সুযোগ। তাদের গল্পে রাখার মতো যথেষ্ট কারণ বা গভীরতা নেই। ফলে তারা থাকলেও কিংবা না থাকলেও গল্পে তেমন পার্থক্য পড়তো না, এমন একটা অনুভূতি তৈরি হয়।

তাসনিয়া ফারিণ অল্প সময় পেয়েও ঠিকঠাক অভিনয় করেছেন, কিন্তু তার চরিত্রের ভেতরে ঢোকার মতো জায়গা তৈরি হয়নি। জ্যোতির্ময়ী কুন্ডুর চরিত্রে কিছুটা উপস্থিতি থাকলেও তার সাথে প্রিন্সের সম্পর্কটা আরও সময় নিয়ে গড়ে তোলা যেত। তাদের প্রেমের দৃশ্যগুলো আরোপিত লাগছিল অনেক। পার্শ্ব চরিত্রদের মধ্যে কয়েকজন ভালো কাজ করলেও তারা গল্পের ভিড়ে হারিয়ে গেছে।

গান ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের মধ্যে কিছু জায়গায় ভালো লাগার উপাদান আছে, কিন্তু সেগুলো পুরো সিনেমাকে আলাদা কোনো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেনি। বিশেষ করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এমন ধরনের গল্পে বড় ভূমিকা রাখতে পারত, কিন্তু এখানে সেটা একটা এভারেজ পর্যায়ে থেকে গেছে। হ্যাঁ, কিছু অংশে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ভালো কিন্তু রিপেটেটিভ মনে হয়।

টেকনিক্যাল দিক থেকে সিনেমাটি সবচেয়ে বেশি দুর্বল। সময়কাল অনুযায়ী সেট বা প্রপসের ব্যবহার অনেক জায়গাতেই বিশ্বাসযোগ্য লাগে না। ভিএফএক্স দুর্বল, গ্রিন স্ক্রিনের ব্যবহার চোখে লাগে, আর কিছু দৃশ্যে বাস্তবতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। এমনকি সিনেমাটোগ্রাফিও খুব একটা ভালো হয়ে ওঠেনি, যেটা এই ঘরানার সিনেমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুনেছিলাম বোম্বের সিনেমাটোগ্রাফাররা কাজ করেছে, কিন্তু সত্য বলতে বাংলাদেশের তরুণ সিনেমাটোগ্রাফাররাও এর থেকে ভালো আউটপুট দিতে পারতো। 

শেষে একটা দৃশ্যের মাধ্যমে প্রিন্স-টু আসার একটা আভাস দিয়েছে। তবে সেটা খুবই জঘন্য লেগেছে। রাজস্থানের মরুভূমিতে শাকিব খান দক্ষিণ ভারতের ড্রেসআপে তামিলে সংলাপের সঙ্গে অ্যাকশন দিচ্ছে! বিষয়টা উইয়ার্ড লেগেছে। রাজস্থানে সাউথের পোশাক ট্র্যাডিশনাল পোশাক পড়ে তামিল ভাষায় কথা বলতেছে। এটা কিছু হলো?

সবমিলিয়ে, ‘প্রিন্স’ এমন একটি কাজ যেটার ভেতরে সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। গল্পের গভীরতা, চিত্রনাট্যের ধার আর টেকনিক্যাল নিখুঁততা; এই তিন জায়গায় আরও যত্ন থাকলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। তুফান, বরবাদ এবং তান্ডবের মতো ব্যাক টু ব্যাক কিছু লার্জ স্কেলের ভালো সিনেমা করার পর দর্শকদের শাকিব খানের প্রতি একটা আস্থা তৈরি হয়েছিল। তবে ‘প্রিন্স’ দর্শকের সেই আস্থার মধ্যে একটা দেয়াল তৈরি করে দিয়েছে আমার মনে হয়।


About The Author

Leave a reply