Select Page

সব অ্যাঙ্গেলে পাওয়ারপ্যাকড ‘বরবাদ’

সব অ্যাঙ্গেলে পাওয়ারপ্যাকড ‘বরবাদ’

নাটক থেকে চলচ্চিত্রে যে পরিচালকরা আসেন তাদের জন্য দর্শকের বড় একটি অংশই পরিচয় দেবার সময় নাক সিটকে বলে থাকে নাটকের পরিচালক। কমার্শিয়াল ছবিতে তাদের এন্ট্রি নেয়া আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে থাকে। এই বাস্তবতায় মেহেদী হাসান হৃদয় উদাহরণ তৈরি করেছেন প্রথম ছবিতেই। ‘বরবাদ’ তার নির্মিত পাওয়ারপ্যাকড অ্যাকশন ছবি যে ছবিতে তার কাজের নিজস্ব সিগনেচার তিনি তৈরি করতে পেরেছেন। এ যাত্রায় তাকে ফুল পাশ মার্ক দেয়া যায়।

‘বরবাদ’ এমনভাবে নির্মিত হয়েছে যে-কোনো অ্যাঙ্গেল থেকেই এটি পাওয়ারপ্যাকড অ্যাকশন ছবি হয়ে উঠেছে। নায়ক, নায়িকা, ভিলেন যেগুলো কমার্শিয়াল ছবির প্রধান উপাদান এর সবখানে মেহেদি হাসান হৃদয় পাওয়ারপ্যাকড পারফরম্যান্স দিয়ে তার কাজকে আদায় করতে পেরেছেন।

ছবির বাজেট সম্পর্কে বড় বাজেটের একটি কথা মুক্তির প্রথম থেকেই শোনা গিয়েছে। ছবির অ্যারেঞ্জমেন্টে সেটা ভালোভাবেই পরিষ্কার। আর্টিস্টদের গেটাপ, কস্টিউম, লোকেশন, লজিস্টিক সাপোর্ট সবকিছু মিলিয়েই বিগবাজেটের ছবির প্রমাণ ‘বরবাদ’-এ আছে। বাজেটের জন্যই ছবিটি ওয়েলমেইড হয়ে উঠেছে। আমরা বর্তমান সময়ের চাহিদায় এমন ছবিই বেশি প্রত্যাশা করে থাকি।

শাকিব খানের ছবিতে গত এক দশক ধরে যা ঘটে তা হলো তার ছবিতে তারই আধিপত্যই আগাগোড়া ঘটে থাকে। ‘বরবাদ’-এ তার আধিপত্য অবশ্যই অনেক তবে পরিচালক ছবিটিকে নায়কসর্বস্ব করে তোলেননি তারপরও। এ দিকটি পরিচালকের জন্য প্রশংসনীয়। তিনি পরিমিতভাবে বাকি চরিত্রদের সাথে নায়কের আধিপত্যকে ভাগ করতে পেরেছেন। নায়ক-নায়িকার দ্বন্দ্ব, নায়ক-ভিলেনের দ্বন্দ্ব এমনকি নায়কের সাথে গল্পের প্রয়োজনে আরো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের দ্বন্দ্ব এভাবে পরিচালক ভাগ করে দিয়েছেন দ্বান্দ্বিক আবহকে। এভাবে ছবিটি ওভারঅল পাওয়ারপ্যাকড হয়ে উঠেছে।

শাকিব খানের পারফরম্যান্স এককথায় বুলেট টাইপের। যেদিক দিয়ে যাবে সব ভেদ করে নিজেকে চিনিয়ে দিয়ে যাবে। নায়িকার জন্য যে সবকিছু করতে পারে। নিজের ওপর কন্ট্রোল তার নেই আবার কন্ট্রোল আসলেও কতক্ষণ থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ছবির প্রথমার্ধের সাথে মাঝখানের শাকিব খানের পারফরম্যান্স একটা নির্দিষ্ট টোনে চলে কিন্তু ক্লাইমেক্সে ফাইনাল অপারেশনের সময়ের শাকিব টোটালি আলাদা। ওটা পরিপূর্ণভাবে বলিউড বা দক্ষিণী ছবির ফুলটাইম হিরোইজমের চূড়ান্ত সোয়াগকে তুলে ধরেছে। সেখানে তার দাড়িযুক্ত গেটাপ, হেলিকপ্টার থেকে বের হওয়ার অ্যাটিটিউড, মিনি গান দিয়ে গুলি করার ভয়ঙ্কর মুহূর্ত এবং পাঞ্চিং-এর মুহূর্তগুলো ছিল চোখের শান্তি। একজন শাকিব খানের কাছে বর্তমানে এমন কাজই সমালোচক বা সচেতন দর্শকরা প্রত্যাশা করে। কারণ তার ক্যারিয়ার এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে তার পাওয়ারফুল পারফরম্যান্স ছাড়া ভিন্ন অপশন নেই। এদিক দিয়ে শাকিব এ ছবিতে লাজবাব।

শাকিব খানের পরেই নায়িকা ইধিকা পালের কথা আসে। নায়িকার কথা আসলেই চট করে শাকিব খান-শাবনূর জুটির ‘কঠিন প্রেম’ ছবির কথা টাইম ট্রাভেলে মনে আসে। সে ছবিতে বিরতির আগে শাবনূরের খেলা আর বিরতির পরে শাকিবের খেলা চলে। ‘বরবাদ’-এ নায়ক-নায়িকার খেলাটাও পাওয়ারফুল, কী কারণে বা কোন পরিস্থিতিতে এটা হয় সেটা ছবি দেখে জানতে হবে। ইধিকা অল্প সময়েই ক্যারিয়ারে ভালো অবস্থানে চলে আসার কারণটা সম্ভবত তার অভিনয়ের মনোযোগ। শাকিবের চোখে চোখ রেখে দ্বন্দ্বের মুহূর্তগুলোতে ইধিকা চমৎকার অভিনয় করেছে। ছবির বিরতির পরে ইধিকা অনেকটাই দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি নায়ক-ভিলেনের দ্বন্দ্বও এ ছবিতে পাওয়ারফুল ছিল। যীশু সেনগুপ্তের নায়কের মতোই ড্যাশিং এন্ট্রি ছিল। পরিচালক যে ভিলেনকেও দর্শকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে তুলে ধরতে চেয়েছেন যীশুর এন্ট্রিতে পরিষ্কার। মিশা সওদাগরের চরিত্রে স্নেহ, জিঘাংসা, অপরাধবোধের এমন সংমিশ্রণ কম ঘটেছে অন্য ছবির তুলনায়। মানব সাচদেব ‘তুফান’ ছবি থেকে দর্শকের কাছে ভালো পরিচিতি পেয়েছে। তবে এ ছবিতে তাকে চিৎকারসর্বস্ব মনে হয়েছে, অভিনয়ে সিরিয়াসনেস ফুটে ওঠেনি। লুক যত স্মার্ট ডায়লগ ডেলিভারি তত স্বতঃস্ফূর্ত না। ইন্তেখাব দিনারের চরিত্র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং তার অভিনয় নিজস্ব স্টাইলেই দারুণ ছিল।

ছবির সংলাপের মধ্যে ‘এই জিল্লু মাল দে’ এবং ‘তোকে ভালোবাসতে আমার এক সেকেন্ড লেগেছে তোরে ভুলতে আমার সময় লাগবে ন্যানো সেকেন্ড’ সবচেয়ে ভালো ছিল। গানের মধ্যে আইটেম সং ‘চাঁদমামা’ জাঁকজমকপূর্ণ ছিল, ‘নিঃশ্বাস’ শোনার ও ফিল করার জন্য বেস্ট, ‘মায়াবী’ গানটি লোকেশনে সুন্দর শুনতে অতটা নয়। ছবির বিজিএম টচনচ ছিল বিশেষ করে ক্লাইমেক্সের লং অপারেশনে।

ছবির নেগেটিভ দিক মোটাদাগে বলতে গেলে সেভাবে নেই।

ব্যালেন্সড একটা কম্বিনেশনে পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয় ‘বরবাদ’-কে পাওয়ারপ্যাকড অ্যাকশন ছবি করেছেন সবদিক থেকেই। শাকিব খানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অ্যাকশন ছবির পাশাপাশি ‘বরবাদ’ পরিচালকের জন্য ইন্ডাস্ট্রিতে লম্বা রেসের ঘোড়া হিসেবে নিজেকে আবির্ভূত করাটাই বেশি চোখে লেগে থাকবে।

রেটিং – ৮.৫/১০


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply