অভিনয় ও গল্প নির্ভর সিনেমার ভক্তরা নির্দ্বিধায় চড়তে পারেন বনলতা এক্সপ্রেসে
বনলতা এক্সপ্রেসের কাস্টিংয়ে রয়েছে বেশ বড় বড় নাম। প্রায় প্রত্যেকেই নামের সঙ্গে সুবিচার করেছেন। তবে শ্যামল মাওলা আর শরিফুল রাজের নাম আলাদা ভাবে না নিয়ে পারছি না…
লুমিয়ার ভাইদের কল্যাণে “L’Arrivée d’un train en gare de La Ciotat” থেকে আধুনিক সিনেমার রিলের ফিতায় আটকে পড়েছে ট্রেন বারংবার। সেই ধারাবাহিকতায় তানিম নূরের “বনলতা এক্সপ্রেস” যেন এই মোটিফেরই এক সমকালীন রূপ, যা নির্মিত হয়েছে হুমায়ুন আহমেদের “কিছুক্ষণ” উপন্যাস অবলম্বনে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, মায়ের ভালোবাসায় অতিষ্ঠ ডাক্তার, গণিতের অধ্যাপক, মন্ত্রী ও তার পরিবার, এক বদরাগী মানুষ ও তার পরিবার আর কয়েকজন ভর্তি পরীক্ষার্থী – সবাই ওঠে এক ট্রেনে- আর এদের সওয়ারি করেই “বনলতা এক্সপ্রেস” এগিয়ে যায়। শুরুতে তাদের গল্প আলাদা মনে হলেও ট্রেনের গতির সাথে সাথে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংকটগুলো এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়। আবার যাত্রা শেষ হলে তারা ছড়িয়ে পড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে—যেন রেলওয়ে জংশনে ক্ষণিকের জন্য মিলিত হওয়া দুটি ট্রেন।
যেহেতু ছবিটা হাইপারলিংক সিনেমা, তাই আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন অনেকজনের গল্পকে এক সাথে জুড়ে দেওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। একটা ট্রেন জার্নিকে ঘিরে মাল্টি লেয়ার্ড স্টোরি টেলিং৷ তাই পরিচালক শুরুতেই সংক্ষিপ্তভাবে চরিত্রগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যা দর্শককে দ্রুত ন্যারেটিভে প্রবেশ করতে সাহায্য করে । এরপর পারস্পরিক সংলাপের মধ্য দিয়ে চরিত্রগুলোর গল্প, ব্যাথা, সম্পর্ক আর জীবনবোধ ফুটে ওঠে। দর্শকরা যেন এতে বিরক্ত না হোন তাই এ সময় স্ক্রিনপ্লেতে পপ কালচারের রেফারেন্স ও হিউমারের ব্যবহার করা হয়েছে।

টেকনিকালি ছবিটি বেশ ভালো। ছবিটি যেহেতু জার্নি ফিল্ম, তাই এর শুটিং প্রায় ৯০ শতাংশ ইনডোরে। এই ধরনের মুভিতে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে একঘেয়েমি এড়ানো ও এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রের গল্পে দৃশ্যান্তর। Z-cut (এক দৃশ্যের শব্দ পূর্ববর্তী দৃশ্যে চালিয়ে নেয়া), ভয়েসওভার এবং পূর্ববর্তী দৃশ্যের মাধ্যমে পরবর্তী দৃশ্যের ইঙ্গিত (foreshadowing) ব্যবহার করে দৃশ্যান্তরকে মসৃণ করেছেন পরিচালক। ছবির ক্লাইম্যাক্সের ইমোশনাল টেনশন ছিল বেশ intense and touchy. আর falling action এ থাকা রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে তিনটে আলাদা সিনের ক্রসকাটের সমন্বয় ছিল চোখ ধাঁধানো। সেটের ডিজাইন ও চরিত্রদের উপস্থাপনা গল্পের টাইমলাইন ২০০৫ সালের সঙ্গে মানানসই।
সিনেমার কাস্টিংয়ে রয়েছে বেশ বড় বড় নাম। প্রায় প্রত্যেকেই নামের সঙ্গে সুবিচার করেছেন। তবে শ্যামল মাওলা আর শরিফুল রাজের নাম আলাদা ভাবে না নিয়ে পারছি না। সাবিলা নূরের শেষ সিনেমার সঙ্গে তুলনা করলে “বনলতা এক্সপ্রেস”-এ তার পারফরম্যান্সের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী৷ শামীমা নাজনীন যেন পর্দায় হুমায়ুনীয় আবহ ফিরিয়ে এনেছেন। মোশারফ করিম এবং চঞ্চল চৌধুরীকে একসঙ্গে পর্দায় দেখে বেশ ভালো লেগেছে।

তবে সীমাবদ্ধতা সিনেমার লাইটিংয়ে। ভিজ্যুয়াল বৈচিত্র্যের অভাব বেশ খালি চোখেই ধরা পড়ে। দীর্ঘসময় High color tone সঙ্গে warm color চোখের জন্য ক্লান্তিকর। চিত্রনাট্যের বিন্যাস নিয়েও আরেকটু ভাবা যেতো। ক্লাইম্যাক্সের পর ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট অন্তত বোরিং লাগে। অনেকগুলো চরিত্র ছিল একমাত্রিক – যেমন চিত্রা বা মন্ত্রীর চরিত্র- যেখানে চাইলেও অভিনেতাদের খুব বেশি কিছু দেখানোর সুযোগ ছিল সীমিত।
“বনলতা এক্সপ্রেস” পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখা সম্ভব তেমন ছবি। তবে এমন ধীর গতির স্টোরি টেলিং মুভি সবার পছন্দের তালিকায় থাকবে না তাও ঠিক। যারা অভিনয় ও গল্প নির্ভর সিনেমার ভক্ত তারা নির্দ্বিধায় টিকিট কেটে চড়তে পারেন “বনলতা এক্সপ্রেসে”।






