Select Page

ডিএফপিতে তথ্যচিত্রের বিল আনতে গিয়ে হামলার শিকার নির্মাতারা

ডিএফপিতে তথ্যচিত্রের বিল আনতে গিয়ে হামলার শিকার নির্মাতারা

চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (ডিএফপি) জুলাই আন্দোলন নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের বকেয়া বিল আনতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন নির্মাতারা। এ ঘটনায় আহতদের মধ্যে রয়েছেন মানবাধিকার কর্মী ও ‘মায়ের ডাক’-এর সদস্য মুশফিকুর রহমান জোহানসহ কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতা।

গত সোমবার (৩০ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ডিএফপির মহাপরিচালক খালেদা বেগমের কক্ষে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ডিএফপির চিত্রগ্রাহক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে স্থানীয় ছাত্রদলের ৩০-৪০ জন নেতাকর্মী তাদের ওপর হামলা চালায়।

এতে মুশফিকুর রহমান জোহানসহ চারজন নির্মাতা আহত হন, যাদের মধ্যে দুজনের মাথায় আঘাত লাগে। ঘটনার পর রাতেই মুশফিকুর রহমান জোহান রাজধানীর রমনা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগে বলা হয়, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই আন্দোলনবিষয়ক একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ তিনি সম্পন্ন করে জমা দিলেও এখনো বকেয়া বিল পরিশোধ করা হয়নি। ঘটনার দিন দুপুর ২টায় ডাকা হলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

পরে মহাপরিচালক উপস্থিত হলে আলোচনা শুরু হয়। এ সময় মো. মশিউর রহমান তাদের হুমকি দেন এবং প্রাপ্য অর্থ না দিতে চাপ সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ। মুশফিকুর রহমান জোহান জানান, তাদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয় এবং অস্বীকৃতি জানালে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়। পরে বাইরে থেকে লোক এনে হামলা চালানো হয়।
এতে গোলাপ শাহ ও আব্দুর রহমানসহ কয়েকজন আহত হন। এ ছাড়া কক্ষের সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মাজহারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে জোহান ফেসবুকে লেখেন, “

দীর্ঘদিন ধরে আমি বাংলাদেশের মানবাধিকার ইস্যু—গুম, খুন, নির্যাতনসহ নানা গুরুতর লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছি। আমি মায়ের ডাকের সদস্য । ফ্যাসিবাদী সময়ে খুব অল্পসংখ্যক মানুষের একজন হিসেবে আমি ধারাবাহিকভাবে এই লড়াইয়ে যুক্ত থেকেছি, চেষ্টা করেছি এবং সবসময় বিশ্বাস করেছি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো জরুরি।

এই কাজের অংশ হিসেবেই তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) জন্য জুলাই বিষয়ক একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণের দায়িত্ব পাই। আমি পরিচালক হিসেবে কাজটি সম্পন্ন করে অনেক আগেই জমা দিয়েছিলাম। সম্প্রতি, সেই কাজের বকেয়া বিল গ্রহণের জন্য আমরা ডিএফপিতে যাই।

দুপুর দুইটায় ডাকা হলেও সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। পরে মহাপরিচালক (ডিজি) উপস্থিত হলে আলোচনা শুরু হয়। এ সময়, ডিএফপির একজন কর্মকর্তা—মশিউর রহমান—কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই ডিজির সামনেই আমাদের সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন।

এর কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই কর্মকর্তা বাইরে থেকে সন্ত্রাসী ডেকে আনেন। ৩০–৪০ জনের একটি দল, যারা নিজেদের ছাত্রদলের পরিচয় দেয়, ডিএফপিতে প্রবেশ করে সরাসরি ডিজির কক্ষে ঢুকে আমাদের ওপর হামলা চালায়। ফিল্ম ডিরেক্টরদের এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। অনেকে গুরুতর আহত হন—গোলাপ ভাইয়ের মাথা ফেটে যায়, কারও মুখে গভীর ক্ষত তৈরি হয়।

আমি যখন বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকি, হঠাৎ করেই ২০-৩০ জন আমার দিকে ছুটে এসে কোনো কিছু বোঝার আগেই আমাকে মারতে শুরু করে। তারা অশ্রাব্য গালাগালি করছিল এবং নিজেদের ছাত্রদল পরিচয় দিচ্ছিল।আমার মুখ থেকে রক্ত ঝরছিল ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—যখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছিল, তখন ডিএফপির মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমাদের দুইজন পরিচালক বাইরে আটকা পড়ে যান। অথচ, হামলাকারীরা আসার সময় গেট খুলে দেওয়া হয়। তারা নির্বিঘ্নে ঢুকে হামলা চালায়, এবং পরে আবার সবার সামনে দিয়েই বের হয়ে যায়। ডিএফপির বহু কর্মকর্তা বিভিন্ন ফ্লোর থেকে দাঁড়িয়ে এই হামলা প্রত্যক্ষ করেন, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি।

পরে জানতে পারি, মশিউর রহমান একজন সাধারণ ক্যামেরাম্যান হলেও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তার প্রভাব অত্যন্ত বেশি—বাজেট ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায়ও তিনি হস্তক্ষেপ করেন। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন ক্ষমতার অপব্যবহার গভীরভাবে উদ্বেগজনক।আমাদের মারার সকল সিসিটিভ ফুটেজ ডিলেট করে দেয়। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান যেখান থেকে তারা সিসিটিভি ফুটেজ সরায় ফেলে ।

এই হামলায় সরাসরি জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন:
• মোঃ মশিউর রহমান (ক্যামেরাম্যান, ডিএফপি)
• আতিকুর রহমান
• আব্দুল হান্নান মজুমদার
• মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
• দিদারুল ইসলাম দিদার
• আসাদুল ইসলাম
• জীবন আহমেদ
এদের অধিকাংশই হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের ছাত্রদলের কর্মী বলে জানা যায়, পাশাপাশি আরও ৩০–৪০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি এতে অংশ নেয়।

পরে স্থানীয় থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। বিষয়টি জানার পর তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফোন করেন, বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিনিধি আসেন, এবং অনেকেই খোঁজখবর নেন। যারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ।

কিন্তু ছাত্রদলের নেতাকর্মীর এই ধরনের সংগঠিত সহিংসতা একটা অন্ধকার সময়ের পূর্বাভাস। ছাত্রদলকে ছাত্রলীগ হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে। ছাত্রদলের কর্মীদের উপর হওয়া অত্যাচার এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা আমার পক্ষে এই ধরনের আচরণ দেখা দুর্বিষহ।

আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ন্যায়বিচার চাই। শুধু আমার জন্য নয়—এই দেশের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য।”

এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধনের অংশ নেন চলচ্চিত্র কর্মীরা।


Leave a reply