তবুও দেখবার মতো সিনেমা ‘দম’
‘ঈদের ছবি’ বলে আমাদের এখানে একটা জুজু আছে। এই বস্তু বানাতে হলে তাতে কয়টা গান, কয়টা ফাইট আর কয়টা কান্নাকাটি থাকতে হবে, সেসব নিয়েও বিস্তর আলাপ আছে। তবে ঈদ অনেক মানুষের হলে এসে সিনেমা দেখার ও অনেকের কাছে পৌছানোরও একটা সময়, এইটা অনেকেই ভুলে যাই। রেদওয়ান রনি তার ডিরেকশনে কামব্যাক করলেন বোধহয় সেইটা মনে করাতে। ‘দম’ অনেকের আলাপে ঈদের ছবি না একেবারেই, অনেকের জন্য আবার ভাল ট্রিট হতে পারে। কিছু লুপহোল, কিছু ক্রিয়েটিভ কনফ্লিক্ট আর ফ্ল্যাট রিদমের স্ক্রিনপ্লে আলাদা সরিয়ে রাখলে ‘দম’ বেশ ভাল সিনেমা।

প্রথম দৃশ্যতে আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকা। সেখানে তালিবানরা গাড়িতে করে মৃতপ্রায় দুজনকে নিয়ে যাচ্ছে। পথিমধ্যে গাড়ি থামিয়ে একজনকে মৃতও পেলে তারা ফেলে দেয়, বেচারি মহিলা সাংবাদিক। বাকি যে একজন দমের খেলায় জান জিইয়ে রাখলো – সেই শাহজাহান ইসলাম নূরকে নিয়েই এই গল্প। রেদওয়ান রনি এই গল্প পেয়েছিলেন প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায়, সাইফুল্লাহ রিয়াদের লেখনীতে।
নেস্ট নামে একটা এনজিওতে কাজ করতো নূর। বাড়িতে আদুরে, সুন্দরী বউ রাণীকে রেখে একটু ভাল থাকতে পাড়ি জমায় যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে। সেখানে তালিবানদের হাতে জিম্মি হয়ে কীভাবে সে দমের খেলা দেখালো, সেটাই বাকি কাহিনী।
দমের খেলা নূর আগে থেকেই ভাল দেখায়। গ্রামের কাবাডি খেলার ব্যাকড্রপে সেটা এস্টাবলিশ হয়েছে। তবে কীভাবে নূর তালিবানের হাতে গেলো, তা দেখানো হয় নাই। বিরতির পয়েন্টে একটা ক্রুশাল মোমেন্ট আছে, যেখানে ধর্মবিশ্বাস দারুণভাবে নূরকে সাহায্য করে, যা ডিরেক্টরকেও প্রভাবিত করেছিলো। সিনটা ভালো। রনি জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি কিংবা ইসলামিক সলিডারিটিতে যুদ্ধকে কীভাবে জিইয়ে রাখা হচ্ছে তা পাশ কাটিয়ে যান নাই। একজন নূরের ফাইটের সাথে দেখানো হয়েছে আফগানি বাল্যবিয়ে, আমেরিকার প্রতি তাদের ঘৃণা ও ক্ষেত্রবিশেষে ধর্মের প্রতি ভালোবাসাও। তবে মিসিং ছিল সাবপ্লট। রনি কোন বায়োপিক বানান নাই, আবার সেই ফরম্যাট থেকে খুব বেশি দূরে দূরেও থাকেন নাই।

সার্ভাইভাল জনরায় আমরা ‘ছুটির ঘন্টা’ দেখেছি, ইভেন হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ও তাই। বাংলাদেশিরা প্রতিদিন সার্ভাইভ করতে লড়াই করে, তাই পর্দায় সেটা খুব বেশি কানেক্টেবল। কিন্তু সাবপ্লট ও অন্যান্য ক্যারেক্টর খুব বেশি ফোকাসে না আসায় নূরের কষ্টে আমাদের সবসময় কষ্ট লাগবে না, তার কান্নায় আমরা নিছকই তাকিয়ে দেখব। এনজিও অফিস, গ্রাম আর মন্ত্রণালয় মিলে একটা এসেন্স ছিল। তবে সেটা বিচ্ছিন্ন। এমনকি সর্বশেষ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ফোনকলটাও যেন আরোপিত মনে হলো।
নিশোর টার্গেট হুমায়ূন ফরীদি, তিনি সেই পথেই আগাচ্ছেন। তবে বছরে একটা সিনেমা খুব কমই হয়ে যায়। ‘দম’র প্রাণ নিশো। শাহজাহান ইসলাম নূর পুরো সিনেমাজুড়ে তার ধর্ম, পরিবার আর ভ্রাতৃত্বকে রিপ্রেজেন্ট করেছে। আরেকটা জাতীয় পুরস্কার পেলে অবাক হব না। তবে অবাক করেছে পূজা চেরি। এই সিনেমায় তাকে নেয়া বা তার এই সিনেমাটা বেছে নেয়া বেশ ভাল সিদ্ধান্ত ছিল, অভিনয়ও খুব খুব ভালো। চঞ্চল চৌধুরী কমিক রিলিফ হিসেবে ভালো। তবে বড় হাউস ও কাজাখস্তান ঘুরে আসার লোভ কাটাতে পারলে তার জন্য ভালো হতো, এই চরিত্র তার জন্য খুব হালকা। ডলি জহুরকে চোখে সর্ষেফুল দেখিয়ে ওয়েস্ট করা হয়েছে। বাকিদের কাউকে ওভাবে মনেও নাই। বিদেশি শিল্পীদের ভাষাগত সমস্যা ও এক্সপ্রেশন ম্যাচ না করায় মোটামুটি চালিয়ে নেয়ার মতো হয়েছে।

সবচেয়ে ভালো ছিল সিনেমাটোগ্রাফি। মাইকেল সিরিয়ানভ নিজের দেশকে যেভাবে পর্দায় এনেছে তা অসাধারণ। ল্যান্ডস্কেপ, ওয়াইড শট সবখানেই আন্তর্জাতিক মানের ছাপ। গানগুলো ভালো তবে আহামরি না। সাবিনা ইয়াসমিনকে ফিরিয়ে আনাটা ভালো তবে আরো দুটো লাইন গাওয়াতে পারলে আরো ভালো লাগতো হলে। শেষের ক্লাইম্যাক্স ফাইটটা জমে নাই, অনেকক্ষেত্রে হাস্যকর ও সেট পিসের মত।
তবুও ‘দম’ দেখবার মতো সিনেমা। নিশো আরেকধাপ এগোলেন। রনিও বাজেটের ভালো ব্যবহার করলেন। গালফ কান্ট্রিতেও সিনেমাটা ভালো চলার কথা। রাইটারদের জন্য শুভকামনা।
রেটিং : ৭/১০






