Select Page

যেমন দেখলাম ‘রইদ’!

যেমন দেখলাম ‘রইদ’!

ঈদের দিন পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন, অভিনেত্রী নাজিফা তুষি ও কলা-কুশলীদের পেছনের সারিতে বসে কোক খেতে খেতে আমিও দেখে ফেললাম ‘রইদ’। সিনেমাটি মূলত কয়েক কোটি বছর পুরোনো একটি আখ্যানকে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে।

শুরু হয় একটি লম্বা শটের মাধ্যমে। যেখানে সাদু চরিত্রের মোস্তাফিজুর নূর ইমরানকে গরু চড়াতে দেখা যায়। আমরা পুরো ছবিজুড়েই বিভিন্ন সময়ে এরকম লম্বা ও বেশ কমপ্লিকেটেড শট দেখতে পাই। যেগুলো ছবিটিকে চিত্রগ্রহণের জায়গা থেকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেছে।

‘রইদ’ মূলত আদম ও হাওয়া ঘটনাটিকে এ সময়ের অনুভূতির মধ্যে দেখানো হয়েছে। গন্ধম ফলের কনসেপ্টটি রূপান্তরিত হয়েছে এই অঞ্চলের অতি পরিচিত ‘তাল’ ফলের মাধ্যমে। ছবিটির শুরুতে তালকে অনেক গুরুত্বহীন একটি এলিমেন্ট মনে হলেও ধীরে ধীরে তাল হয়ে ওঠে ছবিটির চূড়ান্ত ক্লাইমেক্সের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ টুল। যা ছবিটিকে এ অঞ্চলের মানুষের গল্প হয়ে উঠতে সাহায্য করে।

রাইটিং

মেজবাউর রহমান সুমনের প্রথম ছবি ‘হাওয়া’ আরো তিন বছর আগে একই রকম একটি মিথকে নিয়ে লেখা হয়েছিল। তবে ‘হাওয়া’ সিনেমার সাথে ‘রইদ’ এর গল্পের পার্থক্য হলো, ‘রইদ’ অনেক বেশি লোকালাইজড। তাই আদম-হাওয়া’র মতো জনপ্রিয় একটি ধারণাকে এই দেশের পরিবেশের সঙ্গে অ্যাডাপ্ট করার জন্য এমন একটি জগত তৈরি করতে হয়েছে, যা গল্পকে মিথের বেড়াজাল ভেঙে একটি বাস্তব গ্রাম হিসেবে কল্পনা করা যাবে।

‘রইদ’ সিনেমায় গল্প অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ না। শেষের দিকে চূড়ান্ত ক্লাইমেক্স ছাড়া ছবিটিতে খুব বড় টুইস্টের দেখাও পাওয়া যায় না। কিন্তু অতিরিক্ত শান্ত ঘরানাই গল্পটির ভেতর একটি চাপা টেনশনের জন্ম দেয়। যা এই ছবির চিত্রনাট্যের একটি বড় সফলতা।

অভিনয়

পুরো ছবির আশিভাগ জুড়েই সাদু ও তার পাগল স্ত্রীকে দেখানো হয়। সে হিসেবে স্ক্রিনের প্রায় পুরো অংশজুড়েই ছিলেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি। পাগল স্ত্রী হিসেবে নাজিফা তুষির সাবলীল অভিনয় ছবিটিকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মান। লম্বা লম্বা শটগুলোতে প্রায় মঞ্চনাটকের মতো টানা বিশ্বস্ত অভিনয়ের ক্ষেত্রে ছবিটিতে প্রাণ এনে দিয়েছেন তুষি। পৃথিবীর যেকোনো সিনেমাতেই ‘পাগল’ বা ‘সাইকো’ টাইপ চরিত্রে অভিনয় করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। বাংলা ছবিতে পাগল হিসেবে দেখানো হয় চিৎকার চেচামেচিকে। কিন্তু নাজিফা তুষির মুখভঙ্গি আর নিচু স্বরের পাগলাটে অভিনয় ছবিতে এক ধরনের চাপা উত্তেজনার জন্ম দেয়। যেমনটা ‘সাইলেন্স অফ দ্য ল্যাম্ব’ ছবিতে মানুষখেকো হ্যানিবাল চরিত্রের নিস্তব্ধতা বুক কাঁপিয়ে দিতো।

এই ছবিতে মানুষের বাইরেও চরিত্র হয়ে উঠেছে প্রচুর অ্যানিমেল। কুলছুম নামের একটি ছাগল পুরো ছবিজুড়েই কেন্দ্রীয় চরিত্রের আশপাশে ছিল, যা দর্শককে ছবির ভেতর ঢুকিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। এছাড়া আশপাশের পরিবেশ, অন্যান্য প্রাণী এবং সহচরিত্রগুলোর সাবলীল অভিনয় সিনেমাটিকে একদমই বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে গেছে।

সিনেমাটোগ্রাফি

এই ছবির প্রাণ সিনেমাটোগ্রাফি। ‘রইদ’ থেকে সবগুলো সংলাপ সরিয়ে শুধুমাত্র ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড দিয়ে ছবিটি দেখা সম্ভব। এর কারণ ভয়াবহ লেভেলের নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপ তুলে ধরা হয়েছে সিনেমাটিতে। চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো কাশবন, নদী, বৃষ্টি, গরুর পাল, এমনকি গাছ থেকে পরতে থাকা তালের স্তূপ দেখলেও মনে হবে মিউজিয়ামে ঝোলানো কোনো পেইন্টিং।

জয়নুল আবেদীনের আঁকা গ্রাম বাংলার পোট্রেটগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে ‘রইদ’ সিনেমায়। লো লাইটিংয়ে রঙের ব্যবহার এবং সঠিক ফ্রেমিং ছবিটিকে একপ্রকার সিনেমাটোগ্রাফির তাত্ত্বিক ক্লাসে নিয়ে যায়, যেখানে মনে হয় যেন সব ফ্রেমই থিওরি ধরে ধরে করা।

মেজবাউর রহমান সুমনের আগের ‘হাওয়া’ ছবিতেও সাগরের মাঝে দুলতে থাকা একটি বাস্তবতার জন্ম দিয়েছিল। ‘রইদ’ সিনেমাতে চিত্রগ্রহণ হয়েছে আরো বেশি মাখন। যা দেখলে চোখ ফেরানো যায় না, প্রেমিকার মতো সুন্দর সবগুলো ফ্রেম।

এছাড়া ছবিটিতে কমপ্লিকেটেড অনেক শট ও লং শটের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। একটি শটে দেখা যায়, সাদু সদ্য বিয়ে করে তার স্ত্রী নাজিফা তুষিকে নিয়ে গরুর গাড়িতে করে ফিরছে। সেসময় নাজিফা তুষিকে পাগল আখ্যা দিয়ে বাচ্চারা ভেংচি কাটতে থাকে, প্রতি উত্তরে তুষি তাদের একপ্রকার গালাগাল দিতে থাকে। পুরো সময়টা ক্যামেরা তুষিকে অনুসরণ করে এগোতে থাকে, হ্যান্ডি শট হওয়ায় দর্শকের মনে হয় তুষির গরুর গাড়ির ঠিক পেছনেই আমরা আছি। এমনকি তুষির গরুর গাড়ি এগোতে এগোতে দেখা যায়, পাশ দিয়ে দুর্গা দেবীকে বিসর্জন দিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখনই ক্যামেরা তুষি থেকে ফিরে দুর্গা দেবীকে ঘিরে চলা বহরের দিকে চলে যায়।

এই ধরনের ম্যাচ কাট বাংলা সিনেমায় খুব বেশি দেখা যায় না। স্ট্যানলি কুবরিকের ১৯৬৮ সালের সিনেমা ‘২০০১: ও স্পেস ওডেসি’ ছবিতে এই ধরনের ইন্টারেস্টিং ম্যাচ কাটের দেখা পাওয়া যায়।

ছবিটিতে এত বেশি মেটাফোর রয়েছে, যা আলোচনা করতে গেলে অনেক বড় হয়ে যাবে লেখা। বরাবরের মতোই আমার কাছে মনে হয়, মেজবাউর রহমান সুমন বাংলা সিনেমা যে নিজেকে ভাঙছে তার উদাহরণ আবার দিলেন। তাছাড়া সিনেমার সবগুলো দিককে মেদহীনভাবে দেখানোর মুনশিয়ানাও ছবিটিতে পরিচালক দেখিয়েছেন। সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তিদের বাইরেও যে কোনো চিন্তাশীল দর্শকদের জন্যই উপভোগ্য হতে পারে ১২৭ মিনিটের সিনেমা ‘রইদ’।


About The Author

জুবায়ের ইবনে কামাল

এক পৃথিবী লিখব বলে একটি খাতাও শেষ করিনি

Leave a reply