Select Page

‘হাওয়া’তে যদি পর্যাপ্ত আলো বা রইদ পেয়ে থাকেন, ‘রইদে’ পাবেন যথেষ্ট আলোহীনতা এবং পর্যাপ্ত হাওয়া

‘হাওয়া’তে যদি পর্যাপ্ত আলো বা রইদ পেয়ে থাকেন, ‘রইদে’ পাবেন যথেষ্ট আলোহীনতা এবং পর্যাপ্ত হাওয়া

মেজবাউর রহমান সুমনের হয়তো কাউকে কিছু প্রমাণের ছিল না। তবে ‘হাওয়া’র তুলকালাম সাফল্যের পর, আরেকটা নাগরিক ঝোড়ো-আলোচনার ছবি তিনি বানাবেন কিনা এই চিন্তা তাঁর পরিচিতদের মধ্যে এবং ছবির রসগ্রহীতাদের মধ্যে থাকতে পারে। আমি ধরে নিচ্ছি। তাহলে তাঁর ‘রইদ‘ সেই চিন্তার অবসান ঘটিয়েছে। নাগরিক জন-প্রতিক্রিয়া একেবারে তুঙ্গে নিতে পেরেছে। মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যেই নাগরিক চলচ্চিত্রীয় চৈতন্যে সুমনের ‘রইদ’ বেশুমার আলাপিত হয়ে গেছে। আরো হবে।

‘হাওয়া’তে যদি গতিময়, ড্রামাশীল নির্মাতাকে পান, তাহলে ‘রইদে’ পাচ্ছেন শ্লথগতির, মানডেইন মুহূর্তের চিত্রধারক নির্মাতাকে। ‘হাওয়া’তে যদি পর্যাপ্ত আলো বা রইদ পেয়ে থাকেন, ‘রইদে’ পাবেন যথেষ্ট আলোহীনতা, এবং আসলে পর্যাপ্ত হাওয়া।

এর বাইরে ম্যাজিক-ট্যাজিক ইত্যাদি যাঁরা খুঁজছেন তাঁদের সাথে আমার কোনো বিবাদ নাই। সম্বাদেরও দরকার নাই। উইকিপিডিয়া যেভাবে সুমনের দুই ছবিকেই ‘রহস্য’ বর্গেও রেখে আগায়, তাতেও উইকিপিডিয়ার সাথে ঝগড়া করতে বসব না আমি। সম্ভবত ‘মায়াবী’ বোঝাতে চেয়েছে। মায়াবীকে রহস্য বলাতে বাংলাভাষারও কোনো বড় ক্ষতি করা হয় না। 

সারাংশ হলো, সুমন নিজের স্টাইলে আবদ্ধ থেকে পরের কাজটা করেননি। এই ব্রিলিয়ান্সকে স্বাগত জানাই। যদি ধরে নিই তাঁর পরের কাজ হবে ‘পানি’, আমি যে অপেক্ষা করব তা জানি।

নয়নাভিরাম দৃশ্যের প্রতি ‘রইদের’ সুমনের পক্ষপাত আছে। সেটা কোনো দোষ ধরতে বলছি না। বলছি এজন্য যে এই ছবিতে তিনি তা বিপুলহারে ব্যবহার করেছেন। একটু চেষ্টা করলেই চিত্রগ্রহণস্থল বা লোকেশন কোথায় তা জানা যেতে পারত। তার চেষ্টা করিনি। কিন্তু যেসব লোকেশনই তিনি বেছেন নিন না কেন, দূরপাল্লার চিত্রায়ণে অপরূপ দৃশ্য যেন ক্যামেরায় ধরতে পারেন সেটা নির্মাতা হিসেবে বিবেচনায় রেখেছিলেন আন্দাজ করা যায়। জলপ্রবাহ এবং টিলাময়তা বিবেচনায় রাখা হয়েছে। মেঘ এবং বৃষ্টিকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এই ছবিতে বেশুমার বৃষ্টি হয়। আর প্রাযুক্তিক/দক্ষতার বিবেচনায় দুর্দান্তভাবে সেসব বৃষ্টিদৃশ্য ছবিতে ধারণ করা হয়েছে।

যাঁরা কেবল নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখেছেন, বা এটা খুঁজতেই আবার দেখবেন, তাঁদের এটা মনে রাখাও ভাল যে সুমন জনপদের দৃশ্য খুব ভাল সামলেছেন। সেটা হাট/মেলার দৃশ্য হোক বা ঝগড়া-পিটাপিটির দৃশ্য। অধিকন্তু, তিনি অনেকগুলো রূপক-সজ্জা বা কম্পোজিশনের দৃশ্যও হাজির করেছেন। হয়তো তালের স্তূপে অ্যাঞ্জেলোর ‘দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম’ বেশি দর্শকচক্ষুবিজয় করেছে। হয়তো সাইবার-পোস্টার একটা কারণ। অবশ্য তালের আকৃতি ও স্তূপের একটা গোলকধাঁধাও কারণ হতে পারে। কিংবা ভেড়া-মহিষ-ছাগলময় ঘরটা হয়তো নজরে বেশি পড়তে পারে – যেন বা ‘দ্য অ্যাডোরেশন অফ দ্য শেফার্ডস’ চিত্রকর্মের জ্যান্ত প্রতিকৃতি বানানো হয়েছে। ইত্যাদি। তবে, সাধারণভাবেই অনেকগুলো সন্নিবেশন বা কম্পোজিশন আছে ছবিতে। রূপকের হোক বা না হোক। সেগুলো কেবল দূরপাল্লার নয়নাভিরাম দৃশ্যের সাথে গুলিয়ে ফেললে হবে না। বরং, এই ছবিতে প্রায় পরিপাটি মাপে দুই ধরনের দৃশ্য পরপর পেতে থাকবেন দর্শক। পরিপাটি ক্র্যাফটেড।

আর আছে এক মায়াবী, মায়াময়, মায়াজাগানিয়া গল্প। এতটাই যে মনের মধ্যে গল্পটা দেখতে-দেখতে, আবার দেখারও অনেক পরে একই রকম খাঁ-খাঁ লাগে, একই রকম হাহাকার। পাগলির সাথে সাদুর এক চক্রাকার প্রেম ও ঝামেলার এই মায়াময় গল্পে মন হাহাকার করে। গরিব এতিম দম্পতির এই দাম্পত্য প্রেমের গল্পটা এসব দৃশ্যাবলীর সাথে মিলিয়ে-মিশিয়ে পরিবেশন করতে থাকা আর পারাটাই এই ছবির মুন্সিয়ানা। ছবির নির্মাতার। পর্দান্তরালে থাকা কুশীলবদের মুন্সিয়ানা। আর ওই মায়াজাগানিয়া গল্পে অভিনেতাদের মুন্সিয়ানা। প্রধান দুই চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান আর নাজিফা তুষি অনবদ্য।

এই ছবিতে নূরের এক বন্ধু ছাড়া অভিনয়ে কারও কাজ বিশেষ তেমন একটা ছিলও না। একটা অনবদ্য ঝগড়ার সকল অভিনেতার নাম আমি এমনিতেই নিতে পারতাম না। তাই বাদ।

তবে সাদু আর পাগলির এই প্রেমকে মায়াবী বানানোর জন্য পরিচালক ওদেরকে জনবিচ্ছিন্ন বানান। ওদের আধাভাঙা বাসাটাও লোকালয় থেকে যোজন দূরে রাখা হয়েছে। বুঝতে পারি পরিচালকের তাতে সুবিধা হয়, এই ধাঁচের গল্পবলার স্টাইলে। কিন্তু অন্তত সাদু যার চাকরি করেন তারও এতে অসুবিধা হবার কথা; মিঁয়াভাইয়ের। পরিশেষে সাদু তো কিষাণ/রাখালের চাকরি করেন মাত্র। প্রথমবার যখন পাগলিকে পরিত্যাগ করতে যান সাদু, তখনও লোকজন যতটা উৎপাত করলে এরকম পরিত্যাগ দানা-বাঁধে, দর্শক হিসেবে গ্রামের লোকজনের ততটা উৎপাত পাইনি। বস্তুত, গ্রামটাই তো আশপাশে পাওয়া যায় না। সাদুর গ্রাম আর সাদুর চাকরি দুটোই যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত হয়নি ছায়াছবিতে। ফলে সাদু কেবল পাগলির এক দ্বিধাগ্রস্ত, উদভ্রান্ত, ব্যথাতুর বর হয়েই থাকতে পেরেছেন।

[পরিচালককে কৃতজ্ঞতা। আমি গত কিছুদিন যেরকম দৌড়ের মধ্যে আছি, তাতে মেজবাউর রহমান সুমন ১৩ জুন বিশেষ প্রদর্শনীর সুযোগটা এভাবে তৈরি না করলে ছবিটা দেখাতে আমি পিছিয়ে থাকতাম।]


About The Author

মানস চৌধুরী

লেখক, শিক্ষক ও নৃবিজ্ঞানী

Leave a reply