Select Page

শুভ্রা, পরীমণি ও ‘স্বপ্নজাল’

শুভ্রা, পরীমণি ও ‘স্বপ্নজাল’

চিঠি হাতে পিয়ন কাকাকে দেবদূতের মতো লাগে..

শুভ্রা চিঠির অপেক্ষা করে তার প্রেমিকের। যখনই পিয়ন কাকা চিঠি হাতে আসে তাকে সাক্ষাৎ দেবদূত মনে করে শুভ্রা চিঠি তার এতই আরাধ্য! এই শুভ্রা ‘স্বপ্নজাল’-এ পরীমণি।

‘স্বপ্নজাল’ ও পরীমণি একই সুতোয় গাঁথা বিনি সুতার মালা। প্রথমটা পরেরটির এবং পরেরটা প্রথমটির পরিপূরক।

একজন পরীমণি-কে হুট করে ‘স্বপ্নজাল’-এ পাওয়া যায়নি। তাকে নিজের সাথে নিজের একটা প্রস্তুতি অবশ্যই নিতে হয়েছে। ছবিতে তার চরিত্রের নাম শুভ্রা। শুভ্রা হবার আগে নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম যেভাবে শুভ্রার শুভ্রা হয়ে ওঠার আশা করেছেন পরীমণিকে তার জন্য অবশ্যই নিজের সাথে নিজে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়েছে। হয়তো আয়নার সামনে নিজেকে পরখ করতে হয়েছে শুভ্রা কি করে তার থেকে আলাদা এবং কিভাবে তার মধ্যে শুভ্রার বসবাস থাকবে।

পরীকে আমূল বদলে যেতে হয়েছে ‘স্বপ্নজাল’-এ। বিভিন্ন সময় একটা কথা বলা হয় ‘ঢেলে সাজানো’ নিয়ে ওটাই ঘটেছে পরীমণির ক্ষেত্রে। নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম তাকে ঢেলে সাজিয়েছেন। বাণিজ্যিক ছবির অন্যসব কাজ থেকে বেরিয়ে তাকে অন্যরকম হতে হয়েছে।

পরীর লুক এবং ভয়েস এ দুটোর পরিবর্তন প্রধানত ঘটানো হয়েছে ছবিতে। ছবির প্রথম থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত এ কাজটি সতর্কভাবে করেছেন নির্মাতা। সে এ পর্যন্ত যত ছবি করেছে কোনো ছবির সাথে তার লুক ও ভয়েস মেলেনি। একটা ভারসাম্য বজায় রেখে পরীকে কাজটি করতে হয়েছে। স্লো ডায়লগ ডেলিভারি ছিল। ভয়েসে ছিল মিষ্টতা। তার ভয়েসের এক্সেপশনাল পার্টে এ কথাগুলো শুনতে এত ভালো লেগেছে যে কবিতা আবৃত্তির আমেজ এসেছে –


‘আমার মনটাকে তোমার কাছে রেখে গেলাম
মনটাকে মোর বসতে দিও
মুড়ি-মুড়কি খেতে দিও
জলের গ্লাস দেয়ার ছলে
একটু শুধু ছুঁয়ে দিও।’
ভয়েস তখন শুনতেই ভালো লাগে।
তার লুকে ছিল ন্যাচারাল ফ্রেশনেস।

বাবার প্রতি পরী বা শুভ্রার ভালোবাসা অসীম। বাবার জন্য মেয়েদের যে চিরন্তন টান থাকে বাঙালি সংস্কৃতিতে তার পুরোটাই আছে ছবিতে। বাবার কাছে লেখা চিঠিতে বাবার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। বাবার গল্পটা পাল্টে গিয়েছিল কিন্তু তারপরেও পরী ছিল বাবাভক্ত।

নিজের প্রেমিকের প্রতি তার ভালোবাসার শেষ নেই। অপু বা ইয়াশ রোহানের সাথে পরীমণি বা শুভ্রার জুটি দেখে মনে হয়েছে তারা সোনায় সোহাগা। তাদের সম্পর্কে রোমান্স, স্যাড পার্ট, সিরিয়াস ম্যাটার সব ছিল। প্রেমিকের প্রতি শুভ্রার বিশ্বাস ছবিতে শিক্ষণীয় পর্যায়ে পড়ে।

‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’…
নারীর জেগে ওঠার উদাহরণও আছে শুভ্রার মাঝে। বাবার হারিয়ে যাবার জন্য যে দায়ী তাকে শুভ্রা ছাড়েনি।

শুভ্রা সাহিত্যের উপাদানও হয়েছে ‘স্বপ্নজাল’-এ। মঞ্চে তাকে ‘রক্তকরবী’-র নন্দিনীর রিহার্সেল করতে দেখা গেছে। শুভ্রার মধ্যে আরেকজনের নবজন্ম হয়েছে ছবিতে।

কলকাতায় পরের বাড়িতে আশ্রিত থেকে যখন তাদের শাসনে আদরের ছোটভাইকে ধমক দিতে দেখে শুভ্রা পরম আদরে ভাইকে জড়িয়ে নেয়। তার মন ভালো করতে বলে-‘চল, বৃষ্টিতে ভিজবি?’ শুভ্রা স্নেহময়ী বোনও। বাংলাদেশকে যদি শুভ্রা-র অস্তিত্বের টানাপড়েনের জায়গা বলি তবে কলকাতাকে বলা যায় অস্তিত্ব রক্ষার নতুন গল্প।

বৃষ্টি আহবান করলে তা তা থৈ থৈ নৃত্যে শুভ্রা বেজে ওঠে। কাশফুলের শুভ্রতায় হারিয়ে যাওয়া, নৌকায় ঘোরা, পানিতে দুষ্টুমি কিংবা বাইকের পেছনে বসে থাকা এভাবে প্রকৃতির বুকে হারিয়ে যাওয়ার বৈশিষ্ট্যে পরী অসাধারণ ছবিতে।

শুভ্রা গাছের মধ্যে অক্ষর সাজিয়ে যোগচিহ্ন দিয়ে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়। আমরা ছোটবেলা থেকে এটা দেখে এসেছি। অপু কি আসবে নাকি দর্শককেও একরাশ শূন্যতায় ডুবিয়ে শুভ্রার মুখে শেষ হাসিটা আর আসবে না! জানালায় শুভ্রার শেষ অপলক দৃষ্টি আমাদের দৃষ্টিকে স্তব্ধ করে দেয় শেষ পর্যন্ত।

শুভ্রাকে পর্দায় একদম বাস্তবিক, স্বাভাবিক ও জীবন্ত করে তুলেছিল পরীমণি। আজও যারা বলে পরীমণির ভালো ছবি বা ভালো অভিনয়ের ছবি নেই তাদের ধারণা পাল্টে দিতে ‘স্বপ্নজাল’ বড় উদাহরণ।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply