আব্দুল্লাহ আল মামুন ও আলম খান, নিরন্তর অমর-অজর গানের তালাশ
দুজনের নামের আদ্যক্ষর এক—’আ’। আলম খানের মৃত্যুদিন ৮ জুলাই। আব্দুল্লাহ আল মামুনের জন্মদিন ১৩ জুলাই। আশ্চর্যসুন্দর সুরকার-পরিচালক জুটি ছিলেন তারা।

‘সারেং বউ’ দিয়ে তাদের যুগলবন্দি শুরু। আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রথম ছবি ‘সারেং বউ’। তিনি যখন জহির রায়হানের ‘বরফগলা নদী’-কে টিভি নাটকে রূপ দেন, তখন সমালোচকরা প্রশংসা করেন এই বলে যে আব্দুল্লাহ আল মামুন ১৪ ইঞ্চি পর্দার জন্য সিনেমা বানিয়েছেন। উৎসাহিত হয়ে তিনি শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সারেং বউ’-কে রূপালি পর্দায় নিয়ে আসেন। এই শহিদ কথাসাহিতিক্যের আরেক উপন্যাস ‘সংশপ্তক’-কে স্বাধীনতার আগে টিভির জন্য নির্মাণ করেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। ১১ পর্ব প্রচারের পর নাটকটি বন্ধ হয়ে যায়। সাহিত্য থেকে নাটক তৈরিতে সিদ্ধহস্ত আব্দুল্লাহ আল মামুন অবশেষে ‘সারেং বউ’তে এসে পূর্ণতা লাভ করেন।
শিল্পগুণসম্পন্ন ছবি ভাল ব্যবসা করে না—এই মিথ ভেঙে দেয় ‘সারেং বউ’। এই ছবিকে যতখানি আদর করেছেন দর্শকরা, ততখানি কদর করেছেন সমালোচকরা। এই ছবি যতটা সাড়া ফেলেছে এফডিসিতে, ততটাই নাড়া দিয়েছে ফিল্ম সোসাইটিতে। এমন সর্বাঙ্গসুন্দর ছবি বাংলা ভাষায় খুব বেশি হয়নি। ফারক-কবরী জুটিকে স্থায়িত্ব দিয়েছে ‘সারেং বউ’। আর ‘সারেং বউ’কে অমরত্ব দিয়েছে এই ছবির গান।

আলম খানের সুরে, মুকুল চৌধুরীর কথায়, আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে ‘ওরে নীল দরিয়া’ একটা গান হয়েছে বটে। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, যুগ যায়, তবু এই গানের আবেদন এতটুকু কমে না। বরং যত সময় যাচ্ছে এই গান যেন আরও বেশি প্রাণ পাচ্ছে। একটা গানের সঙ্গে জড়িত সবাই চলে গেছেন। তিন ‘আ’—আব্দুল্লাহ আল মামুন, আলম গান, আব্দুল জব্বার চলে গেছেন। মুকুল চৌধুরী নেই। ফারুক-কবরী আজ স্মৃতি। তবু ‘নীল দরিয়া’র যেন বারবার পুনর্জন্ম ঘটে চলেছে। অথচ এই গানের জন্য কেউ পুরস্কার পাননি!
১৯৭৮ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকার আমজাদ হোসেন, শ্রেষ্ঠ সুরকার আলাউদ্দিন আলী, শ্রেষ্ঠ গায়ক সৈয়দ আব্দুল হাদী, শ্রেষ্ঠ গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন—গানের জন্য জাতীয় পুরস্কারে বরাদ্দ চারটি পুরস্কারই নিয়ে যায় ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। এটাও আরেক শিল্পোত্তীর্ণ, দর্শকধন্যছবি। বাঘ আর সিংহের মধ্যে সেরা নির্ণয় করে কার সাধ্য! তবু জুরিরা একটিকে বেছে নেন, স্বীকৃতি হারায় ‘সারেং বউ’।
পুরস্কারবঞ্চনা কি শিল্পীদের দমিয়ে রাখতে পারে? যদি পারত তবে ‘সখি তুমি কার’ ছবিতে ‘তুমি আছ সবই আছে তুমি নাই কিছু নাই’ গানটির জন্ম হত না। সেই একই গীতিকার মুকুল চৌধুরী, সেই একই সুরকার আলম খান, সেই একই কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার। তারা যথারীতি সমবেত হন আব্দুল্লাহ আল মামুনেরর নির্দেশনায়। যথারীতি তারা আমজাদ হোসেনেরই আরেক ছবি ‘কসাই’-এর কাছে খুন হন!
১৯৮০ সালের জাতীয় পুরস্কার প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ সুরকার, শ্রেষ্ঠ গায়ক, শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে পুরস্কার পান যথাক্রমে আলাউদ্দীন আলী, সৈয়দ আব্দুল হাদী এবং সাবিনা ইয়াসমিন। আগেরবার ‘সারেং বউ’ ছবিতে কবরী পুরস্কৃত হন, এবার ‘সখি তুমি কার’ ছবিতে পুরস্কৃত হন শাবানা। যদিও এই ছবির আরেকটা চমৎকার গান, রুনা লায়লার গাওয়া ‘কত দূরে আর কত দূরে ভালবাসার ঠিকানা’ শাবানার লিপে যায়নি—গিয়েছে অঞ্জনার লিপে। এটাও পুরস্কার পাওয়ার মতো গান।
আসলে সেই সময়টা ছিল উৎকর্ষের। এ বলে আমায় দেখো, ও বলে আমায় দেখো। কাকে ছেড়ে কাকে পুরস্কার দেবেন জুরিরা?
‘মানে না মানা’ ছবিতেও জাতীয় পুরস্কার পেতে পারতেন প্রবাল চৌধুরী। ‘জীবন তো একদিন চলতে চলতে থেমে যাবে’ গানের সঙ্গে পর্দায় পারফর্ম করেন আলমগীর। এই রকম শ্রুতিমধুর গান সিনেমাসংগীতের সম্পদ। তবে এই গানের জন্য আলম খান পুরস্কার না পেলেও ১৯৮২ সালেই তিনি পুরস্কার পান ‘বড় ভাল লোক ছিল’ ছবির জন্য। একই ছবির জন্য অ্যান্ড্রু কিশোর সেরা গায়ক। আবার আলম খানেরই আরেক ছবি ‘রজনীগন্ধ্যা’র জন্য সেরা গীতিকার হন মাসুদ করিম। বছরটা আলম খানের জন্য ফুল-ফসলে পূর্ণ হলেও আব্দুল্লাহ আল মামুনের জন্য আক্ষেপের। ‘মানে না মানা’র গানের জন্য একটি ট্রফিও তার ঘরে আসেনি।
তাই বলে আব্দুল্লাহ আল মামুন আর আলম খানের যুগলবন্দী থমকে যায়নি। তারা নিরন্তর অমর-অজর গানের তালাশ করেছেন। ‘দুই জীবন’ ছবিতে আবার তারা হাতে হাত রেখে কাজ করেন। এবার তারা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সেরা অ্যালবামটি সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।

‘দুই জীবন’ ছবিতে ‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে’র মতো শহর-বন্দর কাঁপানো গান যেমন আছে, তেমনই আছে ‘তুমি ছাড়া আমি একা’, ‘আবার দুজনে দেখা হলো’, ‘তুমি আজ কথা দিয়েছ’-এর মতো কালজয়ী সব গান। এই গানগুলোর বয়স প্রায় চার দশক। তবু গানগুলোর আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। যেন শতাব্দীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই গানগুলোর জন্ম হয়েছে।
আফজাল হোসেন অল্পকিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন। সৌভাগ্যের বরপুত্র বলেই হয়তো তার কপালে জুটেছে ‘দুই জীবন’-এর মতো ছবি। দিতির দীর্ঘ অভিনয়জীবনে আরও অনেক গানের ছবি হয়তো আছে, তবে ‘দুই জীবন’ একটিই। কবরী ও বুলবুল আহমেদও অগণিত গানের নায়ক-নায়িকা, তারপরও ‘দুই জীবন’ তাদের জন্য সবিশেষ।
এবার অবশ্য আব্দুল্লাহ আল মামুনকে জুরিরা তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে ভুল করেননি। ‘দুই জীবন’ ছবির জন্য সেরা গায়িকা হিসেবে সাবিনা ইয়াসমিন এবং সেরা গীতিকার হিসেবে মনিরুজ্জমান মনির পুরস্কার পান। পুরস্কার ফসকে যায় আলম খানের। ১৯৮৮ সালে ‘দুই জীবন’ কিংবা ‘ভেজা চোখ’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কারের দাবিদার ছিলেন আলম খান। প্রিয় সঙ্গী পুরস্কার না পেলেও আব্দুল্লাহ আল মামুনের ঝুলি ভরে যায় পুরস্কারে। সেরা ছায়াছবির পুরস্কার পায় ‘দুই জীবন’। তিনি নিজে পুরস্কৃত হন সেরা পরিচালক ও সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে।
‘দুই জীবনে’ই দুই কীর্তিমানের সফর শেষ হয়ে যায় না। তারা নিজেদের গাঁটছড়া আরও এগিয়ে নেন। ১৯৯৩ সালে ‘জনম দুঃখী’ ছবির জন্য তারা পুনরায় একত্রিত হন। এই ছবিতে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘পৃথিবী তুমি থমকে দাঁড়াও’ রেডিও-হিট। ১৯৯৫ সালে ‘দমকা’ ছবিতেও আব্দুল্লাহ আল মামুনের জন্য গান বাঁধেন আলম খান। আদ্যোপান্ত বিনোদন ছবির গান যেমন হয়, ‘দমকা’র গানও তার চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু হয়নি।
আব্দুল্লাহ আল মামুন ও আলম খান একসঙ্গে অগণিত ছবি করেননি। তাদের ছবির সংখ্যা স্বল্প, কিন্তু তাদের অর্জন একটা গল্প। দুজন সৃজনশীল মানুষের তার এক সুরে বাঁধা পড়লে কত অসামান্য সৃষ্টি হতে পারে, তারই দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন এই ‘দুই জীবন’।






